মোটরসাইকেলের পথ রোধ করে গাছের ডাল দিয়ে হামলা, থুতনিতে ৮ সেলাই। বাড়িতে চিকিৎসাধীন শিক্ষক। ছবি সংগৃহীত
শ্রেণিকক্ষে শাসন করায় এক শিক্ষককে রাস্তায় মোটরসাইকেল থামিয়ে গাছের ডাল দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর আহত করার অভিযোগ উঠেছে সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে। এতে ওই শিক্ষকের থুতনিতে আটটি সেলাই দিতে হয়েছে। পাশাপাশি ঘাড়েও গুরুতর আঘাত পেয়েছেন তিনি। গত সোমবার (১২ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে বগুড়া আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) সংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
আহত শিক্ষকের নাম রায়হান ইসলাম। তিনি বগুড়া বিয়াম মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শরীরচর্চা শিক্ষক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। ঘটনার পর থেকে তিনি নিজ বাড়িতে চিকিৎসাধীন ও বিশ্রামে আছেন।
মোটরসাইকেল থামাতেই গাছের ডাল দিয়ে হামলা
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, সোমবার বিকেলে স্কুল ছুটির পর মোটরসাইকেলযোগে নিজ বাসায় ফিরছিলেন শিক্ষক রায়হান ইসলাম। বিয়াম মডেল স্কুল পার হয়ে এপিবিএন ফটকের সামনে পৌঁছালে আগে থেকেই গাছের ডাল হাতে অবস্থান নেওয়া ওই সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী তাঁর পথ রোধ করে।
শিক্ষক মোটরসাইকেল থামানোর সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীটি গাছের ডাল দিয়ে তাঁর মুখ ও ঘাড়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করতে শুরু করে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে তিনি গুরুতর আহত ও রক্তাক্ত হন। একপর্যায়ে অভিযুক্ত শিক্ষার্থী ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।
পরে স্থানীয় লোকজন ও সহকর্মীদের সহায়তায় আহত শিক্ষককে উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। আঘাতের কারণে তাঁর থুতনিতে আটটি সেলাই দিতে হয়েছে। ঘাড়েও গুরুতর আঘাত পেয়েছেন তিনি। বর্তমানে নিজ বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছেন রায়হান ইসলাম।
অভিযুক্ত শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার, মামলা দায়েরের প্রস্তুতি
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বগুড়া বিয়াম মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, শিক্ষকের ওপর আক্রমণের ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক ও নজিরবিহীন। প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীকে তাৎক্ষণিকভাবে বিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য থানায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
তবে এ ঘটনায় পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য, অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষার্থী ও তার অভিভাবকদের বক্তব্য এবং তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ
সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ঘাটতি এবং কিশোরদের মধ্যে সহিংস আচরণের অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন শিক্ষাবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীরা। তাঁদের মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশে পরিবার, শিক্ষক ও সমাজের সম্মিলিত ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু-কিশোরদের রাগ নিয়ন্ত্রণ, সহনশীলতা ও জ্যেষ্ঠদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের শিক্ষা পরিবার থেকেই শুরু হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষকের শাসন হতে হবে যুক্তিসংগত, মর্যাদাপূর্ণ ও শিক্ষার্থীর অধিকারসম্মত।
শ্রেণিকক্ষে কোনো শাসন বা আচরণ নিয়ে শিক্ষার্থীর আপত্তি থাকলে তা প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মে জানানো উচিত। কোনো অবস্থাতেই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।
তাঁরা আরও মনে করেন, এ ধরনের ঘটনায় অভিযোগের যথাযথ তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অভিযুক্ত কিশোরের বয়স, পরিস্থিতি ও সংশোধনের সম্ভাবনাও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
ঘটনাটি ঘিরে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা এবং কিশোরদের আচরণগত বিকাশ নিয়ে নতুন করে আলোচনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। তবে অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা ও ঘটনার পেছনের কারণ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
