সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে সক্রিয় দালাল চক্র; রোগী ভাগিয়ে নেওয়া, অর্থ আদায় ও প্রতারণার অভিযোগে তোলপাড় — অভিযানে আটক বহু দালাল, তবুও ধরাছোঁয়ার বাইরে মূলহোতারা।
বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে দালাল চক্রের বেপরোয়া দৌরাত্ম্যে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ সেবা গ্রহীতারা। ২০২৬ সালের মে মাসের জরিপ ও বিভিন্ন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভয়ঙ্কর চিত্র। রোগীদের জিম্মি করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া, জোরপূর্বক নির্দিষ্ট ক্লিনিকে পাঠানো, টেস্ট বাণিজ্য এবং কমিশনভিত্তিক চিকিৎসা সিন্ডিকেট এখন যেন এক অঘোষিত আতঙ্কের নাম।
বিশেষ করে রাজধানীর মিরপুর এলাকার গ্রীন স্পেশালাইজড হাসপাতালকে কেন্দ্র করে একটি সংঘবদ্ধ দালাল চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, চক্রটির মূলহোতা হাসান তার সহযোগীদের নিয়ে হাসপাতালের অসহায় রোগী ও স্বজনদের টার্গেট করে প্রতারণা, ভয়ভীতি ও অর্থ বাণিজ্যের মাধ্যমে কোটি টাকার অবৈধ সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে।
সূত্র বলছে, সরকারি কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঝেমধ্যে অভিযান চালালেও মূলহোতারা কৌশলে আত্মগোপনে চলে যায়। কিছুদিন নীরব থাকার পর আবারও নতুন কৌশলে সক্রিয় হয়ে ওঠে এই সিন্ডিকেট।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বিভিন্ন হাসপাতালে পরিদর্শনে গিয়ে স্পষ্টভাবে ঘোষণা দেন, যেকোনো মূল্যে হাসপাতালের দালাল ও ট্রলি বাণিজ্য নির্মূল করা হবে।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরীর
কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, স্বাস্থ্যসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে কোনো ধরনের অনিয়ম, দালালি কিংবা রোগী হয়রানি সহ্য করা হবে না। সাধারণ মানুষ যেন নির্বিঘ্নে চিকিৎসাসেবা পায়, তা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সর্বদা সতর্ক রয়েছে। খুব দ্রুত দালাল চক্রের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অভিযান পরিচালনা করা হবে।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, বহিষ্কৃত হাসান একসময় বিভিন্ন হাসপাতালে মার্কেটিং-সংশ্লিষ্ট কাজ করতেন। পরবর্তীতে নানা অনিয়ম ও অভিযোগের কারণে চাকরি হারানোর পর তিনি গড়ে তোলেন শক্তিশালী দালাল সিন্ডিকেট। বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের অসংখ্য রোগীকে টার্গেট করে প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছে তার নেটওয়ার্ক।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী জানান, হাসান সিন্ডিকেটের খপ্পরে পড়ে আমার রোগীর অবস্থা মৃত্যুশয্যায় পৌঁছে গিয়েছিল। এদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
শুধু মিরপুর নয়, রাজধানীর বড় বড় হাসপাতালেও দালাল চক্রের বিস্তার ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সম্প্রতি ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে দালালবিরোধী যৌথ অভিযানে এনএসআই ও শাহবাগ থানা-পুলিশ ৪৯ জনকে আটক করেছে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত অভিযান অব্যাহত থাকলে হাসপাতালকেন্দ্রিক দালাল সিন্ডিকেট দ্রুত নির্মূল করা সম্ভব হবে। এতে সাধারণ রোগীরা যেমন উপকৃত হবেন, তেমনি হাসপাতাল প্রশাসনও স্বস্তি ফিরে পাবে।
বর্তমানে রোগী ও স্বজনদের একটাই দাবি— হাসপাতালকে দালালমুক্ত করতে অবিলম্বে কঠোর ও স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
