২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে বিগত সরকারের আমলে প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের ভূমিকা ও কর্মকাণ্ড নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সেই আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আহসান হাবীবের নাম।
টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমতার অপব্যবহার, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থপাচারের অভিযোগ এবং সাম্প্রতিক একটি হত্যা মামলায় নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়াসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ ঘিরে তাকে নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা। সংশ্লিষ্ট সূত্র, বিভাগীয় কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এসব অভিযোগ উঠে এলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান প্রশাসনিক পদক্ষেপ না নেওয়ায় প্রশ্ন উঠছে সংশ্লিষ্ট মহলে।
টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ
গণপূর্ত বিভাগের একাধিক সূত্রের দাবি, নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আহসান হাবীব বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের দরপত্র প্রক্রিয়ায় ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতেন। অভিযোগ রয়েছে, তার পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হয়েছিল।

বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীর ভাষ্যমতে, কমিশনভিত্তিক দরপত্র নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অবৈধ অর্থ লেনদেন হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এ প্রক্রিয়ায় কয়েকশ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম ও অবৈধ সুবিধা গ্রহণের ঘটনা ঘটেছে।
শতকোটি টাকার সম্পদের অভিযোগ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তার দাবি, চাকরিজীবনের বৈধ আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণভাবে আহসান হাবীবের নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ গড়ে উঠেছে। তার বিরুদ্ধে দেশের বাইরে অর্থ পাচারের অভিযোগও উঠেছে।
সূত্র জানায়, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে আর্থিক অনিয়মের কিছু তথ্য সামনে এলেও রহস্যজনক কারণে সেসব অভিযোগ আর এগোয়নি।
রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার বলয়ের অভিযোগ
গণপূর্ত বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তার দাবি, বিগত সরকারের সময় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক বলয়ের ঘনিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে দীর্ঘদিন প্রভাব বিস্তার করেছেন আহসান হাবীব। অভিযোগ রয়েছে, বিভাগে তার নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী বলয় গড়ে ওঠে, যা বিভিন্ন অভিযোগ ও সংবাদ প্রকাশের পর তা নিষ্পত্তি বা প্রভাবিত করার চেষ্টা করত।
আন্দোলনবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষকে সহযোগিতা করার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের কয়েকজন সদস্যের দাবি, আন্দোলন দমনে অর্থ ও রসদ সরবরাহের সঙ্গেও তিনি জড়িত ছিলেন।
হত্যা মামলায় নাম
আদালত-সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর পল্টন এলাকাকেন্দ্রিক একটি হত্যা মামলায় আহসান হাবীবের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। মামলায় তাকে অন্যতম আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আদালতের নির্দেশে একই ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্য কোনো মামলা রয়েছে কি না, সে বিষয়ে পল্টন মডেল থানাকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। পরবর্তীতে থানার প্রতিবেদনে একই ঘটনায় আরেকটি হত্যা মামলার তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলা থেকে নাম প্রত্যাহারের চেষ্টার অভিযোগ
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, হত্যা মামলায় নাম আসার পর থেকেই বাদীপক্ষের সঙ্গে সমঝোতার বিভিন্ন চেষ্টা শুরু হয়। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন মাধ্যমে মামলা থেকে নাম প্রত্যাহারের জন্য যোগাযোগ ও তদবির চালানো হয়েছে।
ভয় ও নীরবতার সংস্কৃতি
গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রভাবশালী অবস্থান ও রাজনৈতিক যোগাযোগের কারণে দীর্ঘদিন কেউ তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পাননি। তাদের ভাষ্যমতে, প্রশাসনিক প্রভাব, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দুর্নীতির অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিভাগে এক ধরনের ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল।
একাধিক বার চেষ্টা করেও বক্তব্য মেলেনি আহসান হাবীবের। উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে মো. আহসান হাবীবের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। ফলে এ বিষয়ে তার কোনো প্রতিক্রিয়া প্রকাশ হয়নি।
উল্লেখ্য যে, গণপূর্ত বিভাগের একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তাকে ঘিরে টেন্ডার বাণিজ্য, অবৈধ সম্পদ, অর্থপাচার, রাজনৈতিক প্রভাব এবং হত্যা মামলায় নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, আর্থিক অনুসন্ধান এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছ অগ্রগতি এখন সংশ্লিষ্ট মহল ও সাধারণ মানুষের অন্যতম প্রত্যাশা।
