ঘুষের বিনিময়ে পোস্টিং, সংরক্ষিত বন থেকে কাঠ পাচার, ভুয়া জোত পারমিট, অনলাইন ব্ল্যাকমেইল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ—স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি পরিবেশকর্মীদের। ফাইল ছবি
পার্বত্য চট্টগ্রামের বন বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত-সমালোচিত নাম ডেপুটি রেঞ্জার আবু সুফিয়ান। তার বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্য, ভুয়া জোত পারমিট ইস্যু, সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে কাঠ পাচার, ব্ল্যাকমেইল এবং ভুয়া ফেসবুক পেজ পরিচালনার মাধ্যমে অর্থ আদায়ের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রায় ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে রাঙামাটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রেঞ্জে বহাল থেকে তিনি একটি শক্তিশালী প্রভাববলয় গড়ে তুলেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, বন বিভাগের অভ্যন্তরে বিভাজন সৃষ্টি, গ্রুপিং এবং সহকর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে নিজের প্রভাব বজায় রাখার কৌশল দীর্ঘদিন ধরে অনুসরণ করে আসছেন তিনি। তার বিরুদ্ধে কেউ অবস্থান নিলেই বিভিন্ন মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে হয়রানির চেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে।
ঘুষ দিয়ে একের পর এক ‘কাঙ্ক্ষিত’ পোস্টিং?
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, নিজেকে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান পরিচয়ে চাকরিতে প্রবেশের পর রাজনৈতিক প্রভাব ও তদবিরের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ পদে বদলি ও পদোন্নতি নেন আবু সুফিয়ান। কর্মজীবনের বড় একটি সময় তিনি রাঙামাটির বিভিন্ন রেঞ্জে দায়িত্ব পালন করেছেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৬ সালে রাঙামাটি সার্কেল থেকে বদলি হয়ে চন্দ্রঘোনা চেক স্টেশনে যোগদানের জন্য তৎকালীন বনমন্ত্রীর ছেলের মাধ্যমে ২০ লাখ টাকা ঘুষ দেওয়া হয়। পরে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বন বিভাগের বদলি নীতিমালা উপেক্ষা করে ঘাঘড়া স্টেশনে বদলি নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
শুভলং ও কাপ্তাই রেঞ্জে বন ধ্বংসের অভিযোগ
পরবর্তীতে শুভলং রেঞ্জে দায়িত্ব পালনকালে সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে ভুয়া জোত পারমিটের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সেগুন কাঠ পাচারের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, প্রকৃত মালিকদের জমির পরিবর্তে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের গাছ কেটে তথাকথিত বৈধ জোত পারমিটের আড়ালে পাচার করা হতো কোটি টাকার কাঠ।
এরপর ১৫ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে কাপ্তাই রেঞ্জে বদলি হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, কাপ্তাই সদর, রামপাহাড় ও শুকনাছড়ি বিটের সংরক্ষিত বন থেকে নির্বিচারে সেগুন গাছ কেটে পাচারে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। অভিযোগকারীরা বলেন, সরেজমিন তদন্ত করলেই গাছ কাটার অসংখ্য চিহ্ন পাওয়া যাবে।
‘পুনঃকাটিং জোত’কে কেন্দ্র করে নতুন বাণিজ্যের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের মে মাসে রাঙামাটিতে এক কর্মকর্তার মাধ্যমে ১০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে অশ্রেণীভুক্ত বনাঞ্চল ও বনায়ন বিভাগে বদলি নেন তিনি। পরে আরও ২০ লাখ টাকা দিয়ে খাগড়াছড়ির বীজ ও বীজতলা রেঞ্জের দায়িত্ব পান।
বর্তমানে ‘পুনঃকাটিং জোত’কে কেন্দ্র করে নতুন করে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ডিসি অফিস থেকে বৈধ কাগজ নিয়ে আসা ব্যক্তিদের জমিতে গাছ না থাকলেও কাগজে ১০ থেকে ১৫ হাজার ‘ভুয়া গাছ’ দেখিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে পারমিট ইস্যু করা হচ্ছে। এতে কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন হচ্ছে বলে অভিযোগ।
এছাড়া প্রতি ঘনফুট কাঠের বিপরীতে ডিভিশন ও রেঞ্জ অফিসে নির্দিষ্ট হারে কমিশন নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
ভুয়া ফেসবুক পেজ, ব্ল্যাকমেইল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ
আবু সুফিয়ানের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ, তিনি বিভিন্ন ভুয়া ফেসবুক পেজ খুলে বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সাধারণ মানুষকে নিয়ে বানোয়াট ভিডিও ও সংবাদ প্রকাশ করেন। পরে অর্থের বিনিময়ে সেই পোস্ট বা ভিডিও সরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেন, টাকা না দিলে তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হয় এবং সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করা হয়। এমনকি বিভিন্ন অশালীন ভাষা ব্যবহার করে ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগও রয়েছে।
‘মাসে পাঁচ লাখ টাকা না এলে মাথা ঠিক থাকে না’—অভিযোগকারীদের দাবি
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, আবু সুফিয়ান নিজেকে মাঝে মাঝে ‘পাগল’ বলে পরিচয় দিয়ে নিজের কর্মকাণ্ড আড়াল করার চেষ্টা করেন। তাদের দাবি, তিনি প্রায়ই বলে থাকেন—মাসে পাঁচ লাখ টাকা হাতে না আসলে আমার মাথা ঠিক থাকে না, জোত পারমিটের টাকা ছাড়া আমি অক্সিজেন নিতে পারি না। বন বিভাগের অনেকের কাছে এটি তার পরিচিত সংলাপ বলেও অভিযোগকারীরা উল্লেখ করেন।
উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নীরবতা
এ বিষয়ে রাঙামাটি ও ঢাকার বন বিভাগের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে রাজি হননি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, অভিযোগের বিষয়ে কথা বললে তাদের বিরুদ্ধে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে অপপ্রচার চালানো হতে পারে—এমন আশঙ্কা রয়েছে।
একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, এ ধরনের অভিযোগ নতুন নয়। রাজনৈতিক প্রভাব ও অর্থের জোরে কিছু অসাধু কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে পার্বত্য অঞ্চলে পারমিট বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন। সুনির্দিষ্ট প্রমাণসহ অভিযোগ পেলে বিভাগীয় তদন্ত সম্ভব।
স্বাধীন তদন্ত কমিটির দাবি
পরিবেশবাদী সংগঠনের একাধিক কর্মী অভিযোগ করেন, বন ধ্বংসকারীরা বছরের পর বছর পার পেয়ে গেলেও সৎ ও নীতিবান কর্মকর্তাদের প্রত্যন্ত এলাকায় পদায়ন করা হয়। তারা অবিলম্বে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে আবু সুফিয়ানের দায়িত্ব পালন করা চন্দ্রঘোনা, ঘাঘড়া, শুভলং, কাপ্তাই ও বীজতলা রেঞ্জে সরেজমিন তদন্তের দাবি জানান।
অভিযোগ রয়েছে, বর্তমানে বীজতলা রেঞ্জ থেকে কুতুকছড়ি রেঞ্জে বদলির জন্যও ১০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
মন্তব্য পাওয়া যায়নি
এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ডেপুটি রেঞ্জার আবু সুফিয়ানকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তার ব্যবহৃত দুটি মোবাইল নম্বরই বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
