সদর ও রাজনগর উপজেলায় প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে সুপেয় পানি সরবরাহ ও স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার স্থাপন প্রকল্পে ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের এক কর্মী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে প্রকল্পটি বাগিয়ে নিয়ে কাজ শেষ না করেই কোটি টাকার বিল উত্তোলন করেছেন। নির্ধারিত মেয়াদ পেরিয়ে গেলেও অধিকাংশ কাজ এখনো অসম্পূর্ণ, আর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে লাপাত্তা বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ‘প্রাইম ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড লিবার্টি ট্রেডার্স (জেভি)’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রকল্পটির কাজ নেন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের এক ড্রাফটসম্যান। অভিযোগ রয়েছে, মৌলভীবাজার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদুজ্জামানের যোগসাজশে তিনি এই কাজ পান।
২০২৩ সালে প্রায় ১০ কোটি টাকার প্রকল্পটি হাতে নেয় প্রতিষ্ঠানটি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়ায় একাধিকবার মেয়াদ বাড়ানো হলেও শেষ পর্যন্ত কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই কোটি টাকার বিল তুলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান উধাও হয়ে যায় বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
বিশ্বব্যাংক ও এআইআইবি-এর অর্থায়নে, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর ও পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের যৌথ বাস্তবায়নে ‘মানবসম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ ও স্বাস্থ্যবিধি’ প্রকল্পের কাজ ২০২৫ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল।
প্রকল্পের আওতায় মৌলভীবাজার সদর ও রাজনগর উপজেলার সব ইউনিয়নে ৭৬টি পানি সরবরাহ ব্যবস্থা স্থাপন এবং কমিউনিটিভিত্তিক পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রতি এলাকায় ৩০ থেকে ৪০টি হতদরিদ্র পরিবারকে নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল।
কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। অভিযোগ অনুযায়ী, মৌলভীবাজার সদরের ৩৮টি প্রকল্পের মধ্যে মাত্র ২টিতে আংশিক কাজ হয়েছে, আর রাজনগরের ৩৮টির একটিতেও কোনো কাজ হয়নি। প্রায় এক বছর ধরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কোনো খোঁজ নেই।
রাজনগরের বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রকল্পের বাস্তব কোনো অগ্রগতি চোখে পড়েনি। অনেকেই এই প্রকল্প সম্পর্কে কোনো তথ্যই জানেন না।
মৌলভীবাজার সদরের চাঁদনীঘাট ইউনিয়নের কির্তার মহলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কিছু আংশিক কাজ করে চলে যায়। পরে স্থানীয় বাসিন্দারাই নিজেদের উদ্যোগে প্রায় ২৫ হাজার টাকা ব্যয় করে মোটর, পাইপ ও মিটার সংযোগ দিয়ে পানি সরবরাহ চালু করেন।
স্থানীয় বাসিন্দা সুমন মালাকার বলেন, এখানে প্রায় ৩০টি পরিবার এই লাইনের পানি ব্যবহার করে। কিন্তু মোটর, সিঁড়ি—কিছুই দেওয়া হয়নি। ঠিকাদার যে পাইপ বসিয়েছিল, কয়েক দিনের মধ্যেই তা ফেটে যায়। কাজের মান খুবই নিম্নমানের ছিল।
এদিকে জেলা ও উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরও জানে না ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কত টাকা বিল উত্তোলন করেছে। বিষয়টি নিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদুজ্জামানের কার্যালয়ে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
জানা গেছে, শাহিন আলম একসময় ফেনী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের ড্রাফটসম্যান ছিলেন। ২০১৮ সালের নভেম্বরে ২১ হাজার ৪৭০ টাকা বেতন স্কেলে চাকরিতে যোগ দেন তিনি। গত বছর একটি জাতীয় দৈনিকে মাত্র ছয় বছরে শতকোটি টাকার সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
প্রাইম ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড লিবার্টি ট্রেডার্সের অন্যতম পরিচালক রমিজ মিয়া বলেন, এই কাজের প্রকৃত মালিক শাহিন। সে জনস্বাস্থ্যে চাকরি করে আবার ঠিকাদারিও করছে। আমি থাকা অবস্থায় প্রায় ৯০ লাখ টাকার বিল তুলেছিলাম। এরপর কী হয়েছে, জানি না।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, মৌলভীবাজারের এই প্রকল্পের বিষয়ে আমাদের কাছে বিস্তারিত তথ্য নেই। কত টাকা বিল তোলা হয়েছে, সেটিও জানা নেই। নতুন ঠিকাদার নিয়োগ দিয়ে কাজ শেষ করা হবে।
প্রকল্প পরিচালক তবিবুর রহমান তালুকদার বলেন, তিনি নিজের লাইসেন্সে কাজ করেননি, অন্যের লাইসেন্স ব্যবহার করেছেন।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে শাহিন আলমের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।
