মঙ্গলবার, ২১শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৬ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

রেলের ট্র্যাকশন মোটর কেনা–মেরামতে সাড়ে ৬ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ: দুদকের অনুসন্ধানে ফকির মো. মহিউদ্দিন, তদন্তের আওতায় একাধিক প্রকল্প

স্টাফ রিপোর্টার
জুলাই ২০, ২০২৬ ৭:৩৭ অপরাহ্ণ
Link Copied!

বাংলাদেশ রেলওয়ের লোকোমোটিভ সচল রাখতে ব্যবহৃত ট্র্যাকশন মোটর কেনা ও মেরামতকে কেন্দ্র করে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযোগ রয়েছে, দরপত্রের শর্তে অস্বাভাবিক পরিবর্তন এনে প্রতিযোগিতা সীমিত করা, নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়া এবং প্রকল্পে ভ্যারিয়েশনের মাধ্যমে ব্যয় বাড়িয়ে সরকারি অর্থের অপচয় ও আত্মসাতের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। এসব অভিযোগের সূত্র ধরে রেলওয়ের একাধিক প্রকল্প, দরপত্র ও আর্থিক নথি এখন দুদকের তদন্তের আওতায় এসেছে।

রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের (সিআরবি) চিফ কন্ট্রোলার অব স্টোরস দপ্তরের অধীনে ২৩০০, ২৪০০, ৬০০০ ও ৬১০০ সিরিজের লোকোমোটিভের ৩৪টি ট্র্যাকশন মোটর মেরামতের জন্য চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি প্রায় ৫ কোটি ৯৫ লাখ টাকার দরপত্র আহ্বান করা হয়।

অভিযোগ অনুযায়ী, প্রাথমিক দরপত্রে অংশগ্রহণের জন্য রেলওয়ের কমপক্ষে ৩০ লাখ টাকার সমমূল্যের কাজের অভিজ্ঞতা চাওয়া হলেও পরে সেই শর্ত হঠাৎ করেই ৩ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়।

সরকারি ক্রয়বিধি অনুযায়ী একই ধরনের কাজের অভিজ্ঞতা চাওয়ার বিধান থাকলেও এ ক্ষেত্রে কাজের মোট মূল্যের ৫০ শতাংশ সমপরিমাণ অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক করা হয়। রেলওয়ের একাধিক কর্মকর্তার অভিযোগ, এমন কঠোর শর্তের কারণে ছোট ও মাঝারি দেশীয় প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়ে এবং নির্দিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়ার পথ সহজ হয়ে যায়।

রেলওয়ের নথি অনুযায়ী, কারিগরি মূল্যায়নে শ্রীজা মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ ৬ কোটি ৪৫ লাখ ৫২ হাজার ৬০৪ টাকায় কাজটি পায়, যা দাপ্তরিক প্রাক্কলিত ব্যয়ের তুলনায় ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ বেশি।

তদন্তে আরও বড় প্রকল্প

শুধু ট্র্যাকশন মোটর নয়, রেলের ২০০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ এবং ১৫০টি যাত্রীবাহী কোচ সংগ্রহ প্রকল্পেও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রকল্প পরিচালক ও মহাব্যবস্থাপক (প্রকল্প) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বর্তমানে রেলের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) ফকির মো. মহিউদ্দিন ভ্যারিয়েশনের মাধ্যমে প্রকল্প ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি করেন। পাশাপাশি অনুমোদনবিহীন এয়ার ব্রেক ব্যবহার এবং বদলি বাণিজ্যের অভিযোগও দুদকে জমা পড়েছে।

এসব অভিযোগের ভিত্তিতে প্রকল্পের বিল-ভাউচার, নোটশিট, একনেকের অনুমোদনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নথি পর্যালোচনা করছে তদন্তকারী সংস্থা।

সিন্ডিকেট, অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে সম্পদের অভিযোগ

অনুসন্ধানে রেলওয়ের ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের সঙ্গে আফসার আলী বিশ্বাস ও আফজাল হোসেনের নামও উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, পাথর সরবরাহ, ট্র্যাকশন মোটর ও আর্মেচার মেরামতের নামে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করে তার একটি অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া ও সিঙ্গাপুরে পরিবারের সদস্যদের নামে সম্পদের তথ্য খতিয়ে দেখতে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)-এর সহায়তা চাওয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে।

দুদকের তদন্তে ২০১৫–২০১৯ সালের নথি তলব

দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বে তদন্ত দল ইতোমধ্যে ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সম্পাদিত চুক্তি, দরপত্র মূল্যায়ন, বিল-ভাউচার ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র তলব করেছে।

রেলওয়ের মহাপরিচালকের কাছে পাঠানো চিঠিতে সরকারি অর্থের অপচয় এবং অসাধু চক্রের যোগসাজশের অভিযোগ তদন্তের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

ফকির মো. মহিউদ্দিনের বক্তব্য

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) ফকির মো. মহিউদ্দিন বলেন, কোন বিষয়ে, কী কারণে দুদক তদন্ত করছে, সেটি আমি জানি না। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর এ ধরনের কোনো অনিয়ম আমার জানা নেই।

তিনি আরও বলেন, কয়েক বছর আগে পার্বতীপুর কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ কারখানায় (কেলোকা) ভারত থেকে আমদানি করা লোকোমোটিভের ট্র্যাকশন মোটর মেরামতের সময় শ্রীজা মেটাল প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে সফলভাবে কাজ সম্পন্ন করেছিল। সে কারণেই প্রতিষ্ঠানটি পরবর্তী সময়ে সীমিত দরপত্রে একাধিক কাজ পায়।

বর্তমানেও উন্মুক্ত দরপত্রে একই প্রতিষ্ঠান বেশি কাজ পাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ট্র্যাকশন মোটর মেরামত অত্যন্ত বিশেষায়িত প্রযুক্তিনির্ভর কাজ। তাই দরপত্রে পূর্ব অভিজ্ঞতার শর্ত রাখা হয়। অনেক প্রতিষ্ঠান সেই শর্ত পূরণ করতে না পারায় কার্যকর দরদাতা হিসেবে বিবেচিত হয় না। ফলে যাদের এ ধরনের কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে, তারাই কাজ পেয়ে থাকে।

আফসার আলী বিশ্বাসের বিরুদ্ধেও অভিযোগ

রেলওয়ের বিভিন্ন ক্রয়কাজে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে ঠিকাদার আফসার আলী বিশ্বাসের বিরুদ্ধে।

অভিযোগ অনুযায়ী, চারটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গত প্রায় ১৭ বছরে তিনি দুই শতাধিক ফ্রেমওয়ার্ক কন্ট্রাক্ট পেয়েছেন। বড় বড় কাজকে ছোট ছোট চাহিদাপত্রে ভাগ করে অনুমোদনের সীমার মধ্যে এনে শত শত কোটি টাকার কার্যাদেশ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

এ ছাড়া রেলের জন্য নিম্নমানের পাথর সরবরাহ, ট্র্যাকশন মোটর ও আর্মেচার মেরামতের কাজ নিয়ন্ত্রণ এবং আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পরবর্তী দুই বছরে ২১টি ট্র্যাকশন মোটর মেরামতের কার্যাদেশ পাওয়ার বিষয়েও অভিযোগ উঠেছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে শ্রীজা মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজের কর্ণধার আফসার আলী বিশ্বাসের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তাঁর ব্যবহৃত হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো জবাব দেননি।

পরে রাজধানীর বিজয়নগরে প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ে গিয়েও তার সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব হয়নি। সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত এক কর্মী জানান, আফসার বিশ্বাস অফিসের কাজে ব্যস্ত থাকায় নিয়মিত অফিসে আসছেন না। প্রতিষ্ঠানের অন্য কর্মকর্তারাও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
নগর-মহানগর সর্বশেষ