দেশ ও সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে রাজস্ব আহরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ জাতীয় রাজস্ব আহরণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছেন—এমন অভিযোগ তুলে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সৈয়দ আল-কায়সার।
অভিযোগে বলা হয়েছে, চলমান অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব আহরণে প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি তৈরি হয়েছে। রাজস্ব আহরণে কাঙ্ক্ষিত গতি না থাকা এবং ঘাটতি মোকাবিলায় দৃশ্যমান ও জোরালো পদক্ষেপ না নেওয়ার জন্য এনবিআরের বর্তমান প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারী।
জুনিয়র কর্মকর্তাকে চেয়ারম্যান পদায়নে ক্ষোভ
অভিযোগে আরও বলা হয়, এনবিআরের ইতিহাসে একজন জুনিয়র কর্মকর্তাকে চেয়ারম্যান পদে পদায়নের ঘটনায় শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈষম্যমূলক মনোভাব তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে কাস্টমস ও আয়কর বিভাগে প্রায় ১১ জন এনবিআর সদস্য এ গ্রেডে কর্মরত রয়েছেন। তাদের মতো একাধিক সিনিয়র কর্মকর্তার অধীনে একজন জুনিয়র কর্মকর্তাকে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের বিষয়টি প্রশাসনিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ এবং দুরভিসন্ধিমূলক—এমন দাবি করা হয়েছে অভিযোগে।
অভিযোগকারীর ভাষ্য, এনবিআরের ইতিহাসে এ ধরনের নজির খুবই বিরল। ফলে এ পদায়ন নিয়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ ও প্রশাসনিক ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে।
রাজস্ব আহরণে ধীরগতি, দুর্বল প্রশাসনের অভিযোগ
অভিযোগে বলা হয়েছে, এনবিআরের প্রশাসনের মূল দায়িত্ব হলো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর আহরণের কার্যক্রমকে গতিশীল করে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের চালিকাশক্তি শক্তিশালী করা। কিন্তু বর্তমান চেয়ারম্যানের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর আহরণে কার্যকর দক্ষতা কিংবা দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ প্রতিফলিত হচ্ছে না বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
বরং অভিযোগকারীর দাবি, অতীতেও আহসান হাবিবের বিভিন্ন কার্যক্রম দুর্নীতি ও অনিয়মে ভরপুর ছিল। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত নথি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অভিযোগপত্রে কীভাবে উপস্থাপিত হয়েছে, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রাজস্ব বাড়লেও পিছিয়ে বাংলাদেশ?
অভিযোগে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের রাজস্ব আহরণ কার্যক্রম ক্রমাগত উন্নতির দিকে এগিয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিপরীতে বাংলাদেশে এনবিআর প্রশাসনের ব্যর্থতার কারণে রাজস্ব আহরণ প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগকারীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে রাজস্ব আহরণে প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি রয়েছে। অথচ এই ঘাটতি পূরণে এনবিআরের পক্ষ থেকে জোরালো ও কার্যকর পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে যেসব ব্যর্থতার অভিযোগ
অভিযোগপত্রে এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিবের বিরুদ্ধে কয়েকটি প্রশাসনিক ও কর্মদক্ষতাজনিত ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
ক. অধস্তন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সৌজন্যমূলক আচরণে ব্যর্থতা।
খ. কাস্টমস ও আয়কর বিভাগে রাজস্ব আহরণে ধীরগতি থাকা এবং দুর্বল প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা অব্যাহত রাখা।
গ. এনবিআরের সদস্য ও কমিশনারদের রাজস্ব আহরণে দেওয়া দিকনির্দেশনাকে যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়া।
ঘ. রাজস্ব আহরণে তথ্যপ্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহারে দুর্বলতা এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার ঘাটতি।
অভিযোগকারীর দাবি, এসব কারণে রাজস্ব আহরণ কার্যক্রমে কাঙ্ক্ষিত গতি তৈরি হচ্ছে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে।
অভিজ্ঞ ও সিনিয়র কর্মকর্তাকে চেয়ারম্যান করার দাবি
দেশের রাজস্ব আহরণ কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করতে অনতিবিলম্বে এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিবকে অপসারণ এবং তার পরিবর্তে একজন অভিজ্ঞ, দক্ষ ও সিনিয়র কর্মকর্তাকে এনবিআর চেয়ারম্যান পদে নিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের আবেদন জানিয়েছেন ব্যারিস্টার সৈয়দ আল-কায়সার।
প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে দেওয়া অভিযোগে তিনি রাজস্ব আহরণের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এনবিআরের প্রশাসনিক কাঠামো ও নেতৃত্ব পুনর্মূল্যায়নের আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে অভিযোগে উত্থাপিত ৮৮ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে সংযোজন করা হবে।
এখন প্রশ্ন উঠেছে—রাজস্ব ঘাটতির বিশাল চাপ সামলে সরকার যখন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে, তখন এনবিআরের নেতৃত্ব ও রাজস্ব আহরণে কাঙ্ক্ষিত গতি ফেরাতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে?
