ফাইল ছবি
সব চেষ্টা, চিকিৎসকদের প্রাণপণ প্রচেষ্টা আর স্বজনদের আকুতি—কোনো কিছুই শেষ পর্যন্ত থামাতে পারল না মৃত্যুকে। মাত্র তিন মাসের পৃথিবীর জীবন শেষে না-ফেরার দেশে চলে গেল কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের শরীর জোড়া লাগা যমজ দুই বোন জয়নব ও উম্মে কুলসুম। জন্ম থেকে মৃত্যু—প্রতিটি মুহূর্তে যারা ছিল একে অপরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য, শেষ বিদায়েও তারা রইল পাশাপাশি।
বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার দিকে দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুর ইউনিয়নের বিলগাথুয়া গ্রামের স্থানীয় কবরস্থানে জানাজা শেষে দুই বোনকে একই কবরে দাফন করা হয়। এ সময় স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো পরিবেশ। প্রিয় দুই শিশুকে হারিয়ে নির্বাক হয়ে পড়েন বাবা-মা ও স্বজনরা।
এর আগে বুধবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে দুই শিশুর মরদেহ নিয়ে বাড়িতে পৌঁছান স্বজনরা। বৃহস্পতিবার সকালে জানাজা শেষে পাশাপাশি থাকা দুই বোনকে একই কবরে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।
শিশু দুটির বাবা নাহিদ হাসান জানান, গত সোমবার জয়নব ও উম্মে কুলসুমকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর থেকেই তাদের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকে। একপর্যায়ে তাদের শরীর নীল হয়ে যেতে শুরু করে। হাসপাতালে ভর্তির পর চিকিৎসকেরা বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। অবস্থার আরও অবনতি হলে বুধবার তাদের আইসিইউতে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও শেষ রক্ষা হয়নি। বুধবার সন্ধ্যায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় দুই বোন।
নাহিদ হাসান বলেন, হাসপাতালের মেডিকেল বোর্ড পূর্বের চিকিৎসার কাগজপত্র পর্যালোচনা করে জানিয়েছিল, দুই শিশুর হৃদপিণ্ডে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ধমনী ছিল না। ফলে জয়নব কিছুটা স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে পারলেও উম্মে কুলসুম তা পারছিল না। তাদের শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক থাকায় সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত অস্ত্রোপচারের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না।
তিনি আরও বলেন, দুই শিশুর চিকিৎসার বিষয়টি গণমাধ্যমে তুলে ধরার জন্য সাংবাদিকদের প্রতি এবং সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়ায় সরকারের প্রতি তিনি কৃতজ্ঞ।
জানা গেছে, দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুর ইউনিয়নের বিলগাথুয়া মধ্যপাড়া গ্রামের নাহিদ হাসান (২৬) ও সানজিদা ইয়াছমিন মুক্তা (২২) দম্পতির ঘরে গত ৪ মে ঢাকার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) জন্ম নেয় জয়নব ও উম্মে কুলসুম। জন্মের পর থেকেই তাদের বুক থেকে পেট পর্যন্ত শরীরের বিভিন্ন অংশ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
বিরল এই শারীরিক জটিলতা নিয়ে জন্মের পর থেকেই চিকিৎসার জন্য এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটতে হয়েছে পরিবারটিকে। তাদের চিকিৎসার বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে বিষয়টি সরকারের নজরে আসে। পরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দুই শিশুর চিকিৎসার দায়িত্ব নেয়। সরকারের ব্যবস্থাপনায় গত সোমবার তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় বুধবার সন্ধ্যায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে তারা।
মাত্র তিন মাসের জীবনে জয়নব ও উম্মে কুলসুমের ভাগ্যে জোটেনি স্বাভাবিক শৈশব। হাসপাতালের বিছানা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর চিকিৎসার ব্যস্ততার মধ্যেই কেটে গেছে তাদের ক্ষণিকের জীবন। বাবা-মায়ের চোখে ভবিষ্যতের যে স্বপ্ন ছিল, তা পূর্ণ হওয়ার আগেই নিভে গেল দুই শিশুর জীবনপ্রদীপ।
জন্মের পর যেমন তারা ছিল পাশাপাশি, মৃত্যুর পরও সেই বন্ধন ছিন্ন হলো না। পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে গেলেও একই কবরে পাশাপাশি শুয়ে রইল জয়নব ও উম্মে কুলসুম—চিরদিনের জন্য।
অভাবের সংসারে সন্তান হারানোর এই শোক যেন আরও ভারী হয়ে নেমে এসেছে পরিবারটির ওপর। একদিকে সন্তানদের বাঁচানোর ব্যর্থ আকুতি, অন্যদিকে তাদের হারানোর নির্মম বাস্তবতা—সব মিলিয়ে শোকস্তব্ধ বাবা-মা। স্থানীয়রাও গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
তিন মাসের ছোট্ট জীবনের এই দুই বোন হয়তো পৃথিবীকে খুব অল্পই চিনতে পেরেছিল। কিন্তু তাদের জন্ম, বেঁচে থাকার লড়াই এবং শেষ বিদায় মানুষের হৃদয়ে রেখে গেল এক গভীর মর্মস্পর্শী স্মৃতি। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসার সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলেও, পাশাপাশি থাকা দুই বোন পাশাপাশি থেকেই পেল শেষ ঠিকানা—একই কবরে, চিরনিদ্রায়।
