প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মোদি-তারেক প্রথম বৈঠক ঘিরে জোর প্রস্তুতি, আলোচনায় পানি, বাণিজ্য, সীমান্ত ও নিরাপত্তা। ছবি: এনডিটিভি
আগামী সপ্তাহের মাঝামাঝি বা দ্বিতীয়ার্ধে দুই দিনের সফরে ভারত যেতে পারেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সম্ভাব্য এই সফরকে ঘিরে ঢাকা ও নয়াদিল্লিতে প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে ভারতের গণমাধ্যম এনডিটিভি। তবে সফরের তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিকল্পনা অনুযায়ী সফরটি হলে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটি হবে তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর। দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত হয়ে উঠতে পারে। সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে বাণিজ্য, কানেকটিভিটি, জ্বালানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তাসহ গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
দুই দিনের সফরটিকে একটি স্বতন্ত্র দ্বিপাক্ষিক কর্মসূচি হিসেবে আয়োজনের পরিকল্পনা চলছে। সফরের সময়সূচি ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা এখনো চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। এনডিটিভির আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকার পক্ষ থেকে বহুপক্ষীয় কোনো ফোরামের পরিবর্তে সরাসরি দ্বিপাক্ষিক সফরকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
দিল্লি-ঢাকার নতুন সম্পর্কের প্রথম বড় পরীক্ষা?
এনডিটিভির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তারেক রহমান ও নরেন্দ্র মোদির সম্ভাব্য বৈঠকটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে দুই দেশই। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, নতুন সরকারের আমলে সেটি কাটিয়ে সম্পর্ককে নতুন ভিত্তিতে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
বিএনপি সরকার ভারতের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগেও গতি এসেছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এপ্রিলে নয়াদিল্লি সফর করে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করেন। এরপর ১০ আগস্ট ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। দুই দেশের সম্পর্কের পরিবেশ উন্নত করার উপায় নিয়েও সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনা হয়েছে।
শেখ হাসিনা প্রত্যর্পণ—বৈঠকে বড় ইস্যু
সম্ভাব্য বৈঠকে সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি হতে পারে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশ ছাড়ার পর থেকে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশের একটি ট্রাইব্যুনাল মানবতাবিরোধী অপরাধে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর ঢাকা আনুষ্ঠানিকভাবে নয়াদিল্লির কাছে তার প্রত্যর্পণ চেয়েছে। ভারত জানিয়েছে, বিষয়টি যথাযথ আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
চলতি মাসের শুরুতে নয়াদিল্লিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল মতবিনিময়ের পর বিষয়টি আবারও আলোচনার কেন্দ্রে আসে। ঢাকা এর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ভারতের মাটি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার না করার কথা বলেছে। অন্যদিকে, নয়াদিল্লি ওই অনুষ্ঠান আয়োজনের সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততা থাকার কথা অস্বীকার করেছে। এনডিটিভির সূত্রের দাবি, তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের সাম্প্রতিক বৈঠকেও প্রত্যর্পণের বিষয়টি উঠে এসেছে।
পানি, বাণিজ্য ও সীমান্তেও থাকবে নজর
দুই দেশের দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইস্যুগুলোর মধ্যে পানি বণ্টন অন্যতম। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। ফলে চুক্তির নবায়ন ও ভবিষ্যৎ পানি বণ্টন নিয়ে আলোচনা আগামী দিনগুলোতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এর পাশাপাশি বাণিজ্য, ট্রানজিট, জ্বালানি সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও কানেকটিভিটি নিয়েও আলোচনা হতে পারে। ভারত ইতোমধ্যে বাংলাদেশে রেল ও সড়ক অবকাঠামোসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ ও সহযোগিতা করেছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে থমকে থাকা কিছু প্রকল্প ও যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়টিও সম্ভাব্য আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে।
এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত-বাংলাদেশের যাত্রীবাহী রেল যোগাযোগও পুনরায় চালুর বিষয়টি সম্পর্কের উন্নতির সঙ্গে আলোচনায় আসতে পারে। দুই দেশের মধ্যে মৈত্রী, বন্ধন ও মিতালী এক্সপ্রেস চলাচল করলেও বর্তমানে আন্তর্জাতিক যাত্রীবাহী ট্রেনগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে।
জ্বালানি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতাও বৈঠকে গুরুত্ব পেতে পারে। এনডিটিভি জানিয়েছে, দুই দেশের মধ্যে সীমান্তবর্তী বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংযোগকে অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়েও ভারতের আগ্রহ রয়েছে। নতুন বাংলাদেশ সরকার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের কথা বললেও নয়াদিল্লি সীমান্ত নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়গুলো আলোচনায় তুলতে পারে বলে এনডিটিভির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্রিকস সম্মেলনেও আমন্ত্রণ
এর আগে ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তারেক রহমানকে নয়াদিল্লি সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল ভারত। পাশাপাশি সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকসের আউটরিচ অধিবেশনেও বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তবে এনডিটিভির সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা বহুপক্ষীয় ব্রিকস আয়োজনের সঙ্গে সফরকে যুক্ত করার চেয়ে আলাদা দ্বিপাক্ষিক সফরকে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যজনক মনে করছে।
‘কঠিন ইস্যু যেন সম্পর্ককে গ্রাস না করে’
সম্ভাব্য এই সফরেই ঢাকা-নয়াদিল্লির সব অমীমাংসিত সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে—এমন প্রত্যাশা করা হচ্ছে না। শেখ হাসিনা ইস্যু, পানি বণ্টন, বাণিজ্য ও সীমান্তসহ নানা বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। তবে তারেক রহমান ও নরেন্দ্র মোদির সরাসরি বৈঠক এসব জটিল ইস্যু নিয়ে রাজনৈতিক পর্যায়ে নতুন আলোচনার পথ তৈরি করতে পারে।
তারেক রহমানের জন্য এটি হবে বাংলাদেশের অবস্থান সরাসরি ভারতীয় নেতৃত্বের কাছে তুলে ধরার সুযোগ। আর নরেন্দ্র মোদির জন্য নতুন বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে নয়াদিল্লির প্রত্যাশা ও উদ্বেগ স্পষ্ট করার সুযোগ।
সফরের তারিখ এখনো চূড়ান্ত না হলেও পরিকল্পনা অনুযায়ী সবকিছু এগোলে আগামী সপ্তাহের এই দিল্লি সফরই হতে পারে নতুন বাংলাদেশ-ভারত রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রথম বড় পরীক্ষা। আপাতত দুই দেশের লক্ষ্য—আলোচনার টেবিলে ফেরা এবং কঠিন ও স্পর্শকাতর ইস্যুগুলো যেন সামগ্রিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে ছাপিয়ে না যায়, তা নিশ্চিত করা।
সূত্র: এনডিটিভি — এনডিটিভির মূল প্রতিবেদন
