চুক্তি নবায়নসহ চার দফা দাবিতে রাজধানীর ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ভবন ঘেরাও করে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন টিসিবির ডিলাররা। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা নবায়নবঞ্চিত ডিলাররাও এ কর্মসূচিতে যোগ দেন। দ্রুত ডিলারশিপ নবায়ন না হলে আরও কঠোর আন্দোলনে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।
রোববার (৯ আগস্ট) বেলা সাড়ে ১১টা থেকে রাজধানীর টিসিবি ভবনের সামনে অবস্থান নেন ডিলাররা। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন এলাকা থেকে দলে দলে ডিলার এসে কর্মসূচিতে যোগ দেন। তাদের হাতে ছিল বিভিন্ন দাবি সংবলিত ব্যানার ও ফেস্টুন। নানা স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে টিসিবি ভবনের সামনের এলাকা।
একপর্যায়ে ‘মানি না, মানব না’সহ বিভিন্ন স্লোগানে নিজেদের দাবি তুলে ধরেন আন্দোলনকারীরা। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত টিসিবি ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন তারা।
যে দাবিতে আন্দোলন
ডিলারদের প্রথম দাবি, ২০২৬ সালের জুনে যেসব টিসিবি ডিলারের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে, তাদের চুক্তি পুনর্নবায়ন বন্ধ রাখার নির্দেশ অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে। একই সঙ্গে ২০২৫ সালের জুনে যেসব ডিলারের চুক্তি নবায়ন করা হয়নি, তাদেরও নবায়নের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
ডিলারদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে তারা টিসিবির পণ্য নিম্নআয়ের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছেন। কিন্তু নতুন নীতিমালা ও বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কারণে অভিজ্ঞ অনেক ডিলার চুক্তি নবায়নের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এতে একদিকে তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে টিসিবির পণ্য বিতরণের বিদ্যমান ব্যবস্থাও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া কয়েকজন ডিলার বলেন, তারা কোনো অনৈতিক সুবিধা দাবি করছেন না। নিয়ম মেনে দীর্ঘদিন ধরে যারা টিসিবির পণ্য বিতরণ করে আসছেন, তাদের চুক্তি নবায়নের সুযোগ দেওয়াই তাদের মূল দাবি। কোনো ডিলারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার বিরোধিতা করছেন না তারা। তবে অভিযোগের ভিত্তিতে একতরফাভাবে চুক্তি বাতিল বা নবায়ন বন্ধ না করে সংশ্লিষ্ট ডিলারকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
‘পুরোনো যোগ্য ডিলারদের লাইসেন্স নবায়ন করতে হবে’
টিসিবি ডিলারদের পক্ষে প্রতিনিধি মো. বিল্লাল হোসেন বলেন, পুরোনো যেসব ডিলার রয়েছেন, তাদের পুনরায় নবায়ন করে ব্যবসা ও জীবন-জীবিকা নির্বাহের সুযোগ দিতে হবে।
তিনি বলেন, গত বছর কিছু ডিলারের নবায়ন করা হলেও ২০২৬ সালে যাদের নবায়নের কথা ছিল, তাদের নবায়ন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ২০২৫ ও ২০২৬ সালে যেসব ডিলারের নবায়নের কথা ছিল, তাদের লাইসেন্স নবায়ন করতে হবে।
বিল্লাল হোসেন আরও বলেন, কোনো ডিলারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তদন্ত করে তাকে বাদ দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু যারা স্বচ্ছতার সঙ্গে ব্যবসা করছেন এবং যাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই, তাদের ডিলারশিপ বহাল রাখতে হবে।
টিসিবির পরিচালক ও চেয়ারম্যানের অপসারণের দাবিও
অবস্থান কর্মসূচি থেকে টিসিবির পরিচালক হাসনাতের দায়িত্ব পালন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন আন্দোলনকারীরা। প্রতিনিধি মো. বিল্লাল হোসেন বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরও টিসিবিতে পরিচালক হাসনাত কীভাবে দায়িত্বে আছেন, তা নিয়ে তাদের প্রশ্ন রয়েছে। তার অপসারণের পাশাপাশি টিসিবির চেয়ারম্যানেরও অপসারণ দাবি করেন তারা।
তিনি বলেন, ‘আমরা সরকারের বিরুদ্ধে নই। বরং সরকারের একটি অংশ হিসেবে সহযোগিতা করতে চাই। সরকারের সুনাম অক্ষুণ্ন রেখে স্বচ্ছতার সঙ্গে টিসিবির ব্যবসা পরিচালনা করতে চাই। আমাদের একটাই দাবি—পুরোনো যোগ্য ডিলারদের লাইসেন্স নবায়ন করে পরিবার-পরিজন নিয়ে সম্মানের সঙ্গে ব্যবসা করার সুযোগ দিতে হবে।
চার দফা দাবিতে অনড় ডিলাররা
ডিলারদের চার দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—
প্রথমত, ২০২৬ সালের জুনে মেয়াদোত্তীর্ণ টিসিবি ডিলারদের পুনর্নবায়ন বন্ধ রাখার নির্দেশ প্রত্যাহার করতে হবে। একই সঙ্গে ২০২৫ সালের জুনে যেসব ডিলারের চুক্তি নবায়ন হয়নি, তাদেরও চুক্তি নবায়ন করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, কোনো ডিলারের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে নীতিমালা অনুযায়ী সরাসরি ব্যবস্থা না নিয়ে তাকে কারণ দর্শানোর সুযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
তৃতীয়ত, টিসিবি কর্তৃক প্রণীত ‘ডিলার নিয়োগ ও ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ২০২৫’ এবং পরবর্তী সময়ে জারি করা সংশোধনী নীতিমালা বাতিল করতে হবে। ডিলারদের দাবি, নতুন নীতিমালার কারণে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ অনেক ডিলার অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।
চতুর্থত, দেশের নিম্নআয়ের মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা এবং সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ধারাবাহিকতা রক্ষায় টিসিবির অভিজ্ঞ ও সফল ডিলারদের চুক্তি পূর্ণাঙ্গভাবে নবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতে হবে।
ডিলাররা বলছেন, তাদের দাবি দ্রুত বাস্তবায়ন করা না হলে আন্দোলনের পরিধি আরও বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তারা।
