শনিবার, ১৫ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩১শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

নিরাপত্তা ত্রুটির মামলার এক মাস পরই ফেরদৌস স্টিলে ৯ শ্রমিকের মৃত্যু, সতর্কবার্তা, নোটিশ, শেষ পর্যন্ত মামলা তবুও থামেনি ঝুঁকিপূর্ণ কাজ

চট্টগ্রাম জেলা প্রতিনিধি
আগস্ট ১৫, ২০২৬ ১২:৩০ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড ও রিসাইক্লিং কারখানা। ছবি : সংগৃহীত

নিরাপত্তা ত্রুটির কারণে এক মাস আগেই চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ‘ফেরদৌস করপোরেশনের’ বিরুদ্ধে মামলা করেছিল কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই)। একের পর এক নোটিশ ও সতর্কবার্তার পরও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ার অভিযোগের মধ্যেই এবার প্রতিষ্ঠানটির শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে প্রাণ গেল ৯ শ্রমিকের। মর্মান্তিক এই ঘটনায় গুরুতর অসুস্থ ও আহত হয়েছেন আরও অন্তত ১০ থেকে ১২ শ্রমিক।

শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকাল ৮টার দিকে সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে অবস্থিত ‘ফেরদৌস স্টিল’-এর শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

ডিআইএফইর প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইয়ার্ডে নোঙর করা একটি পুরোনো এলএনজি জাহাজের ভেতরে লোহা কাটার কাজ করছিলেন শ্রমিকেরা। এ সময় হঠাৎ জাহাজের ভেতরে জমে থাকা বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে। একই সঙ্গে দেখা দেয় অক্সিজেনের তীব্র সংকট। শ্বাস নিতে না পেরে একের পর এক শ্রমিক জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।

এতে ঘটনাস্থলেই মারা যান ৫ জন শ্রমিক। পরে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আরও ৪ জন। এ ঘটনায় গুরুতর অসুস্থ ও আহত অন্তত ১০ থেকে ১২ শ্রমিককে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলে তৈরি হয় চরম উত্তেজনা। খবর পেয়ে ডিআইএফইর একটি দল ইয়ার্ড পরিদর্শনে গেলে বিক্ষুব্ধ শ্রমিক ও স্থানীয় জনতা তাদের ওপর চড়াও হয়। এতে অধিদপ্তরের দুই শ্রম পরিদর্শক গুরুতর আহত হন। একপর্যায়ে উত্তেজিত জনতা ইয়ার্ডে ভাঙচুর চালায়।

স্থানীয়দের দাবি, দুর্ঘটনার সময় জাহাজের ভেতরে আরও প্রায় ১৫ জন শ্রমিক ছিলেন, যাদের এখনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। নিখোঁজ শ্রমিকদের উদ্ধারে অভিযান চালানো হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং উদ্ধারকাজ নির্বিঘ্ন করতে দুর্ঘটনাস্থলে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।

নোটিশের পর নোটিশ, তবুও হয়নি ব্যবস্থা

ডিআইএফই চট্টগ্রাম শাখার উপমহাপরিদর্শক মোহাম্মদ মাহবুবুল হাসান জানান, নিয়মিত পরিদর্শনের সময় কারখানাটিতে নিরাপত্তাসংক্রান্ত নানা অনিয়ম ধরা পড়ে। এরপর চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠানটিকে প্রথম নোটিশ দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে মে ও জুন মাসে আরও দুই দফা সতর্ক করা হয়। কিন্তু একাধিকবার সতর্ক করার পরও নিরাপত্তা ঘাটতি দূর করতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে গত ১৫ জুলাই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে ডিআইএফই।

মামলা দায়েরের মাত্র এক মাসের মাথায় ভয়াবহ এই দুর্ঘটনায় ৯ শ্রমিকের প্রাণহানির ঘটনায় এখন প্রশ্ন উঠেছে—আগের সতর্কবার্তা ও মামলার পরও কেন ঝুঁকিপূর্ণ কাজ বন্ধ হয়নি, কেন নিশ্চিত করা হয়নি শ্রমিকদের নিরাপত্তা?

বিষাক্ত গ্যাস পরীক্ষা না করেই নামানো হয়েছে শ্রমিকদের’

স্থানীয় শ্রমিক নেতা ফজলুর কবির মিন্টু অভিযোগ করেন, জাহাজের ভেতরে বিষাক্ত গ্যাস কিংবা বিপজ্জনক বর্জ্য রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা না করেই শ্রমিকদের গভীরে নামানো হয়েছে। মালিকপক্ষের চরম অবহেলার কারণেই এতগুলো তাজা প্রাণ ঝরে গেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, ছুটির দিনে কেন শ্রমিকদের দিয়ে এমন ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করানো হচ্ছিল, সেটিও তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে শ্রমিকদের ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেওয়ার ঘটনায় দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবিও জানান তিনি।

অনুমোদন ছিল কি না, তদন্তেই মিলবে উত্তর

শিপইয়ার্ডটিতে জাহাজ কাটার প্রয়োজনীয় অনুমতি ছিল কি না—এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপপরিচালক মো. মোজাহিদুল রহমান জানান, জাহাজ কাটার জন্য পরিবেশ ছাড়পত্রের পাশাপাশি বিস্ফোরক পরিদপ্তরসহ বেশ কয়েকটি সংস্থার অনুমোদনের প্রয়োজন হয়।

তিনি বলেন, নিরাপত্তার স্বার্থে দুর্ঘটনাস্থল ঘিরে কর্ডন করে রাখা হয়েছে। ফলে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শকেরা তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলের ভেতরে প্রবেশ করতে পারেননি। তদন্ত শেষ হলে প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদন, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণসহ পুরো বিষয়টি পরিষ্কার হবে।

এক মাস আগে নিরাপত্তা ত্রুটির অভিযোগে মামলা, তারও আগে একাধিক নোটিশ ও সতর্কবার্তা—সবকিছুর পরও শেষ পর্যন্ত ফেরদৌস স্টিলের শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে ৯ শ্রমিকের প্রাণহানির ঘটনায় এখন সামনে এসেছে বড় প্রশ্ন: সতর্ক করা হয়েছিল, মামলা হয়েছিল—তবুও শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হলো না কেন? এই প্রশ্নের উত্তরই এখন খুঁজছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও নিহত-নিখোঁজ শ্রমিকদের স্বজনেরা।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।