লাগাতার অনিয়ম, ক্রমাগত দুর্নীতি ও লাগামহীন লুটপাটের অভিযোগে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের (ডিডিএম) প্রশাসনিক কার্যক্রম। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) রেজওয়ানুর রহমানের বিরুদ্ধে নিয়োগ, বদলি, টেন্ডার ও কেনাকাটাকে ঘিরে সিন্ডিকেট বাণিজ্য, উপসহকারী প্রকৌশলী পদে নিয়োগের নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া এবং ক্ষমতার অপব্যবহারসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
একটি লিখিত অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, উচ্চ আদালতের আদেশের ব্যাখ্যা দেখিয়ে প্রতিজনের কাছ থেকে ৩০ লাখ টাকা করে নিয়ে ২২৮ জন উপসহকারী প্রকৌশলীকে সরাসরি প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) পদে নিয়োগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে ডিজি রেজওয়ানুর রহমানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ করেছেন মো. জাহাঙ্গীর আলম নামে এক ব্যক্তি।
অভিযোগে আরও বলা হয়, আদালতের আদেশ ছিল উপসহকারী প্রকৌশলীর সমমানের পদে নিয়োগের বিষয়ে। কিন্তু সেই আদেশের সুযোগ নিয়ে সরাসরি পিআইও পদে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে রাজস্ব খাতে সরাসরি উপসহকারী প্রকৌশলী পদে ৭৩ জনকে নিয়োগ দিয়ে প্রত্যেকের কাছ থেকে ৩০ লাখ টাকা করে ঘুষ নেওয়ারও অভিযোগ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
আওয়ামী ঘরানার কর্মকর্তাদের পুনর্বাসনের’ অভিযোগ
অভিযোগকারীদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন রেজওয়ানুর রহমান। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করে তিনি ২০২৪ সালের ২০ জুন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান।
অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, অধিদপ্তরে যোগদানের পর তিনি আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ ও অনিয়মে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পুনর্বাসন করছেন। নিজস্ব বলয়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলে বদলি, পদায়ন, টেন্ডার, কেনাকাটা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ শফিউল আলমের নামও উল্লেখ করা হয়েছে। তাকে ২০২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি সিলেটের জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা হিসেবে পদায়ন করা হলেও দীর্ঘ সময় ধরে অধিদপ্তরে রেখে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, তাকে ব্যবহার করে পোস্টিং, পদোন্নতি, টেন্ডার, কেনাকাটা ও প্রশাসনিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অনৈতিক লেনদেন পরিচালনা করা হচ্ছে।
অগ্নিকাণ্ডের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে ‘ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে’ প্রতিবেদন?
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাকে কেন্দ্র করেও ডিজির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ওই ঘটনায় প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ৪ থেকে ৫ কোটি টাকা হলেও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়িয়ে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা দেখিয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন দেওয়া হয়।
এ ছাড়া অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিরীহ ব্যক্তি ও বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ওই সময় অধিদপ্তরে আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা সেখানে আগুন ধরিয়ে দেয়।
তবে অগ্নিকাণ্ডের ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ, মামলা এবং এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথি ও স্বাধীন তদন্তের ফলাফল ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
টেন্ডার ও ত্রাণ কার্যক্রম নিয়েও অভিযোগ
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের বড় বড় প্রকল্পের টেন্ডার, ত্রাণসামগ্রী ক্রয় এবং বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে প্রভাব বিস্তার ও স্বজনদের ব্যবসায়িক সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে ডিজির বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে দেশ-বিদেশে সরকারি দায়িত্বের বাইরে প্রমোদভ্রমণ ও নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগও করেছেন অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের কিছু কর্মকর্তা।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ ও পদায়ন থেকে বঞ্চিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এ নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে। তারা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে মহাপরিচালক রেজওয়ানুর রহমানের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে অধিদপ্তরের অপর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ২২৮ জন উপসহকারী প্রকৌশলীকে সরাসরি প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) পদে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগটি নাকচ করেছেন। তার দাবি, দ্বিতীয় শ্রেণির কোনো কর্মকর্তা নিয়োগের এখতিয়ার অধিদপ্তরের নেই। এ ধরনের নিয়োগ সরাসরি বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) অথবা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে হয়ে থাকে এবং অধিদপ্তর কেবল তা বাস্তবায়ন করে। ফলে এ ক্ষেত্রে মহাপরিচালকের সরাসরি কোনো ভূমিকা থাকার সুযোগ নেই।
সব মিলিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ এখন নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি তুলেছে। নিয়োগ-বাণিজ্য, বদলি-পদায়ন, টেন্ডার, অগ্নিকাণ্ডের ক্ষয়ক্ষতির হিসাব এবং কর্মকর্তাদের পুনর্বাসন—প্রতিটি অভিযোগের নেপথ্যের সত্যতা উদঘাটনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর তদন্ত করে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়। অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।
