মঙ্গলবার, ১৮ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ওয়াসার গন্ধবপুর প্রকল্পে বিস্ফোরক অনিয়মের অভিযোগ, ৯৭% কাজ শেষ, তবুও ব্যয় বাড়ছে দেড় হাজার কোটি টাকা

বিশেষ প্রতিনিধি
আগস্ট ১৭, ২০২৬ ১১:৩৯ অপরাহ্ণ
Link Copied!

গন্ধর্বপুর ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট। ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীবাসীর ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব সুপেয় পানি সরবরাহের লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছিল ‘ঢাকা এনভায়রনমেন্টাল সাস্টেইনেবল ওয়াটার সাপ্লাই’ (ডিইএসডব্লিউএসপি) প্রকল্প। কিন্তু প্রায় এক দশকের দীর্ঘসূত্রতা, আর্থিক জটিলতা, প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা ও আইনি বিরোধে মেগা প্রকল্পটির বাস্তবায়ন এখন নানা প্রশ্নের মুখে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—প্রকল্পের মূল প্যাকেজ-০১-এর ভৌত অগ্রগতি যখন প্রায় ৯৭ শতাংশ, তখনই মূল চুক্তিমূল্যের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বা ১ হাজার ৫০১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই প্রকল্প পরিচালকের সিদ্ধান্তে ফরাসি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ১২৬ কোটি টাকা পরিশোধের অভিযোগও উঠেছে।

অন্যদিকে, প্রায় এক বছর কাজ বন্ধ থাকায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রতিদিন ২৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা হারে ক্ষতিপূরণের দাবি তুলেছে। এর সঙ্গে চুক্তির শর্ত ভেঙে অননুমোদিত চীনা কোম্পানির কাছ থেকে পাইপ কেনা ও ব্যবহারের অভিযোগ প্রকল্পটির মান, স্বচ্ছতা ও ভবিষ্যৎ স্থায়িত্ব নিয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।

অনুমোদন ছাড়াই ১২৬ কোটি টাকা অর্থ ছাড়ের অভিযোগ

গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগার প্রকল্পের নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, ঢাকা ওয়াসার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কিংবা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমোদন বা অনুমোদন ছাড়াই চলতি বছরের জুনে তিন কিস্তিতে প্রায় ১২৬ কোটি টাকা সমপরিমাণ অর্থ ফরাসি যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘সুয়েজ ও ওটিভি ভিওলিয়া’ (গন্ধর্বপুর ওয়াটার ট্রিটমেন্ট এসএনসি)-কে পরিশোধ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

নথি অনুযায়ী, গত ৩ জুন প্রথম কিস্তিতে ৩৬ কোটি ৯ লাখ ৮৯ হাজার ৯০৬ টাকা পরিশোধ করা হয়। ১০ জুন দ্বিতীয় কিস্তিতে ৩৫ লাখ ৫৯ হাজার ৪৮৮ ইউরো, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৯ কোটি ৯৮ লাখ ৫৮ হাজার ৮৮৯ টাকা, এবং ১৫ জুন তৃতীয় কিস্তিতে ২৮ লাখ ৭৩ হাজার ৪৮৮ মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪০ কোটি ৩৫ লাখ ২৩ হাজার ৯১৯ টাকা, পরিশোধ করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, এর আগেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সম্মতি বা চুক্তি সংশোধন ছাড়াই একই যৌথ প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।

তবে অনুমোদন ছাড়া শত কোটি টাকা ছাড়ের বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক মো. ওয়াহিদুল ইসলাম মুরাদ বলেন, এটি প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকারে থাকা প্রকল্প। এই প্রকল্প নিয়ে কোনো তথ্য বা অভিযোগের জবাব দেওয়া যাবে না।

এক বছর কাজ বন্ধ, প্রতিদিন ২৪ লাখ ৯০ হাজার টাকার ক্ষতিপূরণের ঝুঁকি

বকেয়া বিলের দাবিতে ২০২৫ সালের ১৫ জুন প্রকল্পের সব ধরনের নির্মাণকাজ বন্ধ ঘোষণা করে মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘সুয়েজ ও ওটিভি ভিওলিয়া’। আন্তর্জাতিক চুক্তি ফিডিক ইয়োলো বুক ১৯৯৯-এর ১৬.১ ধারা প্রয়োগ করে প্রায় এক বছর তারা কাজ বন্ধ রাখে।

পরবর্তীতে গত জুনে ঢাকা ওয়াসা বকেয়া বিল পরিশোধের পর ১৭ জুন এক চিঠিতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জানায়, ২১ জুন থেকে তারা প্রকল্প এলাকায় পুনরায় কাজ শুরু করেছে। প্রকল্প দ্রুত শেষ করতে তারা সাড়ে পাঁচ মাসের একটি ‘লুক-অ্যাহেড’ কর্মপরিকল্পনাও জমা দেয়।

এতে শোধনাগারের বিভিন্ন ট্যাংকে ফিল্টার বালি স্থাপন, ত্রুটি সংশোধন, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে কালভার্ট ও রূপসী রোড ক্রসিংয়ের কাজ এবং সিস্টেমের চাপ পরীক্ষা সম্পন্ন করার কথা বলা হয়েছে।

তবে দীর্ঘ ১২ মাস কাজ বন্ধ থাকায় পরিচালন ব্যয় ও আনুষঙ্গিক খরচ বেড়ে যাওয়ার দাবি করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তারা শিগগিরই ‘ফাইনাল ক্লেইম’-এর মাধ্যমে বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারে।

এ ছাড়া ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে কাজের প্রশাসনিক অনুমতি সময়মতো না পাওয়ায় কর্মী ও ভারী যন্ত্রপাতি বসিয়ে রাখার ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রতিদিন ২৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা ডেমারেজ দাবির সুযোগ তৈরি হয়েছে।

৯৭ শতাংশ কাজ শেষ, তবুও ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব প্রায় ৫০ শতাংশ

সরকারি নথি অনুযায়ী, রূপগঞ্জের গন্ধবপুরে ৫০০ এমএলডি ক্ষমতার পানি শোধনাগার ও ইনটেক অবকাঠামোর ভৌত অগ্রগতি ইতোমধ্যে ৯৭ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে।

অথচ প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষ হওয়ার মুখে মূল চুক্তিমূল্য ৩ হাজার ৬ কোটি ৪ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ হাজার ৫০৮ কোটি ১ লাখ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

অর্থাৎ একক প্যাকেজ-০১-এ বাড়তি ১ হাজার ৫০১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা, যা মূল চুক্তির প্রায় ৪৯.৯৭ শতাংশ।

এখানেই উঠেছে বড় প্রশ্ন—কাজ যখন প্রায় শেষ, তখন এত বিপুল ব্যয় বৃদ্ধি কেন?

পিপিআর-২০২৫ বনাম পুরোনো বিধি—আইনি বিতর্ক

অভিযোগ উঠেছে, নতুন সরকারি ক্রয় বিধিমালা পিপিআর-২০২৫ কার্যকর হওয়ার পরও ওয়াসা কর্তৃপক্ষ পুরোনো পিপিআর-২০০৮-এর বিধি ৭৪(৪)-এর আশ্রয় নিয়ে প্রায় ৫০ শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব তৈরি করেছে।

নতুন পিপিআর-২০২৫ অনুযায়ী বিদ্যমান কোনো চুক্তিতে অনধিক ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা উল্লেখ করেছেন। অথচ ওয়াসার প্রস্তাবে ব্যয় বাড়ানোর পরিমাণ প্রায় ৫০ শতাংশ।

ওয়াসার পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীর অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্প হওয়ায় ফিডিক চুক্তির বিধান বহাল থাকবে এবং পুরোনো চুক্তির পরিপত্র অনুযায়ী পুরোনো পিপিআর প্রযোজ্য।

অন্যদিকে, আইনি পর্যালোচকদের মতে, পিপিআর-২০২৫ কার্যকর হওয়ার পর পুরোনো বিধির সর্বোচ্চ সীমা অতিক্রম করে প্রায় ৫০ শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব আইন ও বিধির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

চার বছরের প্রকল্পে সাড়ে চার বছরের সময়ক্ষেপণ

২০১৮ সালের ১৬ মে ফরাসি যৌথ উদ্যোগের সঙ্গে চুক্তি সই হয়। তখন কাজ শেষ করার সময়সীমা ছিল ৪৮ মাস বা চার বছর। সেই হিসাবে ২০২২ সালের মধ্যেই প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা।

কিন্তু দফায় দফায় সময় বাড়িয়ে এখন তা ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

নথিপত্র অনুযায়ী, চুক্তির শর্তে কাজ শুরুর দিনেই ইনটেক ও প্ল্যান্টের শতভাগ সাইট এবং পাইপলাইনের ৫০ শতাংশ জমি ঠিকাদারকে বুঝিয়ে দেওয়ার কথা ছিল।

কিন্তু পাইপলাইনের প্রথম ১০ কিলোমিটার জমি বুঝে পেতে ঠিকাদারকে অপেক্ষা করতে হয়েছে ৬৪৩ দিন। আর শতভাগ সাইট বুঝিয়ে দিতে ওয়াসার সময় লেগেছে ১ হাজার ২৬৯ দিন, অর্থাৎ প্রায় সাড়ে তিন বছর।

জমি হস্তান্তরে বিলম্বের কারণে ঠিকাদারকে ক্ষতিপূরণ বাবদ ৫৪ কোটি ৪ লাখ টাকা দিতে হচ্ছে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

নকশা পরিবর্তন থেকে শত শত কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয়

২২ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রধান পাইপলাইনের প্রাথমিক নকশায় মাত্র ৭ কিলোমিটার এলাকায় ভূমিকম্পজনিত মাটির তরলীকরণ বা লিকুইফেকশনের ঝুঁকি চিহ্নিত করা হয়েছিল। পরে বিস্তারিত জরিপে পুরো ২২ কিলোমিটার এলাকাই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ধরা পড়ে।

ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির (আইইউটি) বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে পাইপলাইনের নকশা পরিবর্তন করতে গিয়ে অতিরিক্ত খরচ হয় ৬০ কোটি ৬১ লাখ টাকা।

এদিকে ২০১৬ সালের বেস ডেট ধরে প্রাক্কলন করায় পরবর্তী এক দশকে রড, সিমেন্ট, পাইপসহ নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির কারণে দর সমন্বয় বাবদ অতিরিক্ত ৬৬৭ কোটি ১৪ লাখ টাকা দিতে হচ্ছে।

সরকার ভ্যাট ও আয়করের হার ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭.৫ শতাংশ করায় এবং আমদানি শুল্ক বৃদ্ধির কারণে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে আরও ৩৪০ কোটি ৩২ লাখ টাকা।

সংঘর্ষ, কোভিড ও বিলম্ব—ক্ষতিপূরণের বোঝাও ওয়াসার ঘাড়ে

২০১৯ সালের নভেম্বরে গন্ধর্বপুরে শোধনাগারের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণকে কেন্দ্র করে স্থানীয় একটি সামাজিক কবরস্থান নিয়ে গ্রামবাসীর সঙ্গে সংঘর্ষ ও হামলা-ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এতে ২০ দিন কাজ বন্ধ থাকে। এ ঘটনায় ঠিকাদারকে ক্ষতিপূরণ বাবদ ৭ কোটি ৯৫ লাখ টাকা দেওয়ার কথা রয়েছে।

কোভিডজনিত কারণে অতিরিক্ত ৩৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকা এবং ওয়াসার বিল পরিশোধে বিলম্বের কারণে ‘ডিলে পেমেন্ট’ বাবদ ৫৮ কোটি ৮৪ লাখ টাকা জরিমানা গুনতে হচ্ছে।

এ ছাড়া সড়ক ও জনপথ বিভাগের আপত্তির কারণে ঢাকা বাইপাস ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে আরসিসি বক্স কালভার্ট নির্মাণে ৪৬.৮৯ কোটি টাকা এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্দেশে পাইপলাইন গভীরে নেওয়া ও দুটি গভীর পুকুর অতিক্রমে আরও ৭১.৮৩ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রয়োজন হয়েছে।

যদিও ঠিকাদারের কিছু ‘ভ্যালু ইঞ্জিনিয়ারিং’ গ্রহণের ফলে ৮৩.৮২ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে, তারপরও বিভিন্ন সমন্বয় ও অতিরিক্ত কাজ মিলিয়ে ব্যয়ের চাপ দাঁড়িয়েছে ১৬২.২২ কোটি টাকা।

অননুমোদিত চীনা পাইপ ব্যবহারের অভিযোগ

প্রকল্পের পাইপলাইন অংশে আর্থিক অনিয়মের পাশাপাশি নির্মাণসামগ্রীর মান নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, মূল ঠিকাদার ‘সুয়েজ’ ২৩ কিলোমিটার এলাকায় পাইপ সরবরাহের দায়িত্ব পেলেও চুক্তির বাইরে গিয়ে তুলনামূলক কম দামে অননুমোদিত চীনা কোম্পানি ‘শ্যানডং গুয়োমিং’-এর কাছ থেকে পাইপ কেনে।

এই পাইপের কেনাকাটা ও গুণগত মান নিয়ে চীনের আদালতে সুয়েজের বিরুদ্ধে একটি দেওয়ানি মামলা বিচারাধীন রয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ এই পানি সরবরাহ প্রকল্পে অননুমোদিত পাইপ ব্যবহারের অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা ওয়াসার দৃশ্যমান কোনো আইনি বা প্রশাসনিক তদন্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।

সওজের সঙ্গে সমন্বয়হীনতায় ফের খোঁড়াখুঁড়ির শঙ্কা

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সংস্কারকাজের সময় সড়ক ও জনপথ বিভাগ একাধিকবার ওয়াসাকে পাইপ বসানোর জন্য তাগাদা দেয়। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, ওয়াসার গাফিলতিতে ৯৫০ মিটার পাইপ ও দুটি কালভার্ট নির্মাণ না করেই মহাসড়কের কাজ শেষ করে সওজ।

ফলে ভবিষ্যতে নতুন করে নির্মিত মহাসড়ক খুঁড়ে পাইপলাইন ও কালভার্ট স্থাপন করতে হতে পারে। এতে জনগণের অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি প্রকল্পের সময় ও ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞের প্রশ্ন—ব্যয় বৃদ্ধি ও অনুমোদনহীন বিল তদন্ত জরুরি

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, “পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) অনুযায়ী প্রকল্পের ব্যয় সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ বাড়ানো সম্ভব হলেও এখানে প্রায় ৪৯ শতাংশ ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা স্পষ্টতই সরকারি নিয়মনীতির চরম লঙ্ঘন।

তিনি আরও বলেন, প্রকল্পের ব্যয় বারবার বৃদ্ধি রোধ করতেই পিপিআর বিধান করা হয়েছে। অনুমোদন ছাড়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ১২৬ কোটি টাকার বিল পরিশোধের অভিযোগকেও তিনি ওয়াসার গাফিলতি ও জবাবদিহির ঘাটতি হিসেবে দেখছেন।

প্রকল্পের সাইট বুঝিয়ে দিতে বিলম্ব এবং প্রতিদিন প্রায় ২৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণের দাবির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, এ ধরনের অব্যবস্থাপনায় সরকারের বিপুল রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে। ওয়াসার অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও অনিয়ম খতিয়ে দেখতে এবং বিধিবহির্ভূত অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি বন্ধ করতে মন্ত্রণালয়ের একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা উচিত।

মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য—ব্যয় বৃদ্ধির ফাইল স্থগিত

এসব অভিযোগের বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (পানি সরবরাহ অনুবিভাগ) ড. মুহা. মনিরুজ্জামান বলেন, “ওয়াসার এই প্রকল্পের কোনো ধরনের বিল প্রদানের অনুমোদন নিতে ফাইল মন্ত্রণালয়ে আসেনি।

স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব (পানি সরবরাহ অধিশাখা) হোসনা আফরোজ বলেন, প্রকিউরমেন্টের ক্ষেত্রে প্রকল্প পরিচালক বিষয়গুলো দেখে মন্ত্রণালয়ে পাঠালে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করেন। কোনো ভ্যারিয়েশন বা আর্থিক বিষয় থাকলে তা পর্যালোচনা করে সিসিজিবিতে পাঠানো হয়।

তিনি জানান, এই প্রকল্পে ব্যয় বাড়ানোর বিষয়টি যাচাই করে দেখা হয়েছে। ভ্যারিয়েশনের ক্ষেত্রে প্রতিটি অংশের কাজ, মেজারমেন্ট ও ডেসক্রিপশন দেওয়ার নিয়ম থাকলেও প্রস্তাবে সেগুলো ছিল না। প্রয়োজনীয় তথ্য চেয়ে পাঠানো হলেও কোনো জবাব না পাওয়ায় বর্তমানে বিষয়টি স্থগিত রয়েছে।

অনুমোদন ছাড়া প্রকল্প পরিচালকের বিল দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, কোনো কর্মকর্তা অনুমোদন ছাড়া বিল দিয়েছেন কি না, তা আমার জানা নেই। ডেলিগেশন অব ফাইন্যান্সিয়াল পাওয়ার অনুযায়ী প্রকল্প পরিচালকের নির্দিষ্ট আর্থিক সীমা থাকে। সেই সীমার বাইরে কোনো বিল হলে তা ওয়াসা বোর্ড এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর নিয়ম রয়েছে।

সব মিলিয়ে গন্ধবপুর পানি শোধনাগার প্রকল্পে একদিকে ৯৭ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার দাবি, অন্যদিকে প্রায় ৫০ শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব; এর সঙ্গে অনুমোদনহীন অর্থ পরিশোধ, দীর্ঘসূত্রতা, ক্ষতিপূরণের ঝুঁকি এবং অননুমোদিত পাইপ ব্যবহারের অভিযোগ—সবকিছু মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে প্রকল্পটির ব্যয়, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও বাস্তব সুফল নিয়ে।

এ অবস্থায় প্রকল্পের আর্থিক ও কারিগরি সিদ্ধান্তগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করে প্রকৃত ব্যয়, দায় এবং অনিয়মের উৎস চিহ্নিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
বিশেষ খবর সর্বশেষ