শুক্রবার, ২৮শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৩ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বাড্ডা থানা শিক্ষা অফিসার হাকিমের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়, শিক্ষক নিয়োগে ঘুষ, এমপিও ফাইল আটকে অর্থ আদায় ও নারী শিক্ষকদের কুপ্রস্তাবের অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার
আগস্ট ২৮, ২০২৬ ১:৫৪ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

রাজধানীর বাড্ডা থানা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আব্দুল হাকিমের বিরুদ্ধে শিক্ষক নিয়োগ, এমপিওভুক্তি, সরকারি বই ব্যবস্থাপনা এবং নারী শিক্ষকদের সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণসহ নানা গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন একই এলাকায় দায়িত্ব পালনকে কেন্দ্র করে তিনি একটি শক্তিশালী প্রভাববলয় গড়ে তুলেছেন। তবে এসব অভিযোগকে ‘মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক’ বলে দাবি করেছেন আব্দুল হাকিম।

অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষক নিয়োগে ঘুষ, আত্মীয়-স্বজনকে চাকরি পাইয়ে দেওয়া, এমপিও-সংক্রান্ত ফাইল পাঠাতে ২ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া, কাজের কথা বলে নারী শিক্ষকদের রাতে অফিসে ডেকে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রস্তাব দেওয়া এবং সরকারি বই বিক্রির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত তিনি। এসব অনিয়মের প্রতিবাদ করলে শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রশাসনিক হয়রানি ও চাকরি থেকে বহিষ্কারের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

রাজধানীর বাড্ডা, ভাটারা ও হাতিরঝিলের একাংশ নিয়ে বাড্ডা থানা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, মো. আব্দুল হাকিম ২০১৬ সাল থেকে দীর্ঘ সময় ধরে একই এলাকায় দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার সুযোগে তিনি স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষক-কর্মচারীদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে একটি শক্তিশালী বলয় তৈরি করেছেন বলে অভিযোগ।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের সেকেন্ডারি এডুকেশন সেক্টর ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রামের আওতায় ঢাকা মহানগরের ১৮টি থানা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসে কর্মকর্তা কর্মরত রয়েছেন। প্রকল্পভিত্তিক দায়িত্বের কারণে ঢাকার বাইরে বদলির সুযোগ সীমিত থাকায় দীর্ঘদিন একই এলাকায় অবস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ। আর এই সুযোগকেই কাজে লাগিয়ে আব্দুল হাকিম অনিয়মের একটি বলয় তৈরি করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

নিয়োগ ও এমপিও ফাইলে লাখ লাখ টাকার অভিযোগ

অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষক নিয়োগ ও এমপিও-সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে ফাইল ছাড়েন আব্দুল হাকিম। বিশেষ করে প্রধান শিক্ষক নিয়োগে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিওভুক্তিসহ বিভিন্ন ফাইল পাঠানোর ক্ষেত্রেও জনপ্রতি ২ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থ দাবি বা নেওয়ার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন শিক্ষক।

অভিযোগকারীদের দাবি, টাকা দিতে অনাগ্রহী শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতায় ফেলা হয়। কখনো ফাইল আটকে রাখা, আবার কখনো নানা ধরনের হুমকি দিয়ে অর্থ দিতে বাধ্য করার অভিযোগও রয়েছে।

তিন আত্মীয়কে চাকরি দিতে চাপ?

বাড্ডার একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আব্দুল হাকিমের তিন আত্মীয়—বোন, বোনের স্বামী ও ভাইকে নিয়োগ দেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ প্রয়োগের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিও-সংক্রান্ত ফাইল পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে ওই তিনজনকে নিয়োগ দিতে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয়। তবে এই অভিযোগের স্বতন্ত্র সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

প্রতিবাদ করলেই ‘চাকরি থেকে বহিষ্কার’?

শিক্ষকদের অভিযোগ, আব্দুল হাকিমের বিরুদ্ধে কোনো অনিয়ম নিয়ে কথা বললে কিংবা প্রতিবাদ করলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে প্রশাসনিকভাবে চাপে ফেলা হয়। এমনকি চাকরি নিয়ে ভয় দেখানোর অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, চাকরি ও পেশাগত ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে অনেক শিক্ষক প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পান না।

রাতের অফিস ঘিরে বাড়ছে প্রশ্ন

আব্দুল হাকিমের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ, তিনি নিয়মিত অফিস সময়ে অফিসে না গিয়ে রাতে অফিস করেন এবং বাড্ডা, ভাটারা ও হাতিরঝিল এলাকার শিক্ষক, বিশেষ করে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের রাতে সাক্ষাতের সময় দেন।

অভিযোগকারীদের দাবি, রাতের এসব সাক্ষাতের সময় তাঁর সঙ্গে অফিসের পিয়ন রিপন ছাড়া অন্য কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী উপস্থিত থাকেন না। এমনকি কাজের কথা বলে নারী শিক্ষকদেরও রাতে নির্জন কক্ষে ডেকে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

নারী শিক্ষকদের কুপ্রস্তাবের অভিযোগ

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো—বিশেষ করে নারী শিক্ষকদের ব্যক্তিগত ও অনাকাঙ্ক্ষিত প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ। অভিযোগকারীদের দাবি, কোনো শিক্ষিকা এসব প্রস্তাবে সাড়া না দিলে পরবর্তীতে তাঁকে প্রশাসনিকভাবে হয়রানি কিংবা ষড়যন্ত্রের শিকার হতে হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষিকা অভিযোগ করেছেন, ওই কর্মকর্তার আচরণ নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। এমন পরিস্থিতিতে কয়েকজন শিক্ষিকার পারিবারিক জীবনও চাপে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

সরকারি বই নিয়েও অভিযোগ

আব্দুল হাকিমের বিরুদ্ধে বাড্ডা, ভাটারা ও হাতিরঝিলের একাংশের কিন্ডারগার্টেন, হাইস্কুল ও এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে বিতরণের পর অবশিষ্ট সরকারি বই ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, পরে এসব বই বিক্রি করে অর্থ আত্মসাৎ করা হয় এবং কথিতভাবে মনগড়া ভাউচার তৈরি করে হিসাব দেখানোর চেষ্টা করা হয়। সরকারি বইয়ের অবশিষ্ট মজুত ও বিতরণ-পরবর্তী হিসাব যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও জবাবদিহি করা হয় কি না—এ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।

বদলি ও শাস্তির দাবি শিক্ষিকাদের

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষিকা আব্দুল হাকিমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত করে তাঁকে বদলি এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, দীর্ঘদিন একই এলাকায় দায়িত্ব পালন করলে প্রভাববলয় তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। তাই প্রশাসনিক স্বচ্ছতার স্বার্থে বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করা প্রয়োজন।

যা বললেন আব্দুল হাকিম

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বাড্ডা থানা শিক্ষা অফিসার মো. আব্দুল হাকিম সমতল মাতৃভূমি’কে বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো ‘মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক’।

অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে তাঁর কার্যালয়ে গিয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র দেখার পাশাপাশি অভিযোগে উল্লেখ করা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সরেজমিনে গিয়ে তথ্য-উপাত্ত যাচাই করার আহ্বান জানান তিনি। অভিযোগগুলো মিথ্যা প্রমাণিত হলে এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেবেন বলেও জানান তিনি।

প্রকল্প কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

সেকেন্ডারি এডুকেশন সেক্টর ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রামের (সেসিপ) সহকারী পরিচালক (প্রশাসন-২) এমরানুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, বর্তমানে তিনি অফিসের বাইরে রয়েছেন। বিষয়টি সম্পর্কে জানতে পরদিন অফিস চলাকালীন সময়ে যোগাযোগ করার অনুরোধ করেন তিনি।

প্রকল্পের যুগ্ম প্রোগ্রাম পরিচালক (অ. দা.) মো. আমিনূল ইসলাম বলেন, কেউ এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দিলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রশাসন এ ধরনের কোনো অনিয়ম বরদাশত করবে না বলেও তিনি আশ্বাস দেন।

এ বিষয়ে প্রকল্পের পরিচালক এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেলের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া সম্ভব হয়নি।

এখন প্রশ্ন হলো—বাড্ডা থানা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসকে ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগ কতটা সত্য? অভিযোগগুলোর পেছনে কি রয়েছে দীর্ঘদিনের অনিয়মের কোনো প্রমাণ, নাকি এগুলো সত্যিই ষড়যন্ত্র? নথিপত্র, নিয়োগ প্রক্রিয়া, এমপিও ফাইল, সরকারি বইয়ের হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বক্তব্য যাচাই করলেই বেরিয়ে আসতে পারে প্রকৃত সত্য।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।