সরকারি প্রকল্পে ব্যয় কমানোর নীতি, অর্থ সাশ্রয় ও স্বচ্ছতার নানা উদ্যোগের মধ্যেই জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের (জাগৃক) একটি আবাসন প্রকল্পের ইলেক্ট্রো-মেকানিক্যাল সরঞ্জাম কেনাকাটা নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ‘দোলনচাঁপা-কনকচাঁপা’ আবাসন প্রকল্পে ১৯টি লিফট কেনার জন্য মূল প্রস্তাবে বরাদ্দ ছিল ১৭ কোটি ২০ লাখ ৮৭ হাজার টাকা। প্রথম সংশোধনীতে সেই ব্যয় বাড়িয়ে করা হয়েছে ৪৮ কোটি ৯৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা। অর্থাৎ শুধু লিফট কেনার ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত বরাদ্দ দেখানো হয়েছে ৩১ কোটি ৭৩ লাখ ৫৩ হাজার টাকা।
প্রকল্পটির ইলেক্ট্রো-মেকানিক্যাল (ইএম) বিভাগের এসব কেনাকাটার সঙ্গে জাগৃকের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মিরাজ হোসেনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলেছেন একাধিক কর্মকর্তা। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে একই বিভাগ ও একই পদে থাকার সুযোগে বিভিন্ন প্রকল্পের ইএম সরঞ্জাম কেনাকাটায় তার প্রভাব রয়েছে।
১৯ বছরে একই চেয়ার!
জাগৃকের একাধিক কর্মকর্তার অভিযোগ, ২০০৬ সালের ২২ অক্টোবর ইলেক্ট্রো-মেকানিক্যাল বিভাগে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় ১৯ বছর ধরে একই বিভাগে রয়েছেন মিরাজ হোসেন। সরকার পরিবর্তন হয়েছে, প্রশাসনে রদবদল হয়েছে, কিন্তু তার পদে বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি—এমন দাবি সংশ্লিষ্টদের।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য, গত দেড় যুগে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কমপক্ষে ৩০টি প্রকল্পের ইলেক্ট্রো-মেকানিক্যাল বিভাগের বিভিন্ন ধরনের কেনাকাটার সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। এসব প্রকল্পে ডিপিপিতে নির্ধারিত ব্যয়ের তুলনায় পরবর্তী সময়ে বেশি ব্যয় দেখানো হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তাদের দাবি, অতিরিক্ত অর্থের একটি অংশ ঠিকাদারদের সঙ্গে ভাগাভাগি করা হয়। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
৪৬৯ কোটি থেকে প্রকল্প ব্যয় ৫৪১ কোটি
মোহাম্মদপুরের ‘দোলনচাঁপা-কনকচাঁপা’ প্রকল্পে নির্মাণ করা হচ্ছে ৪৩০টি আবাসিক ফ্ল্যাট। প্রকল্পটির মূল প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৪৬৯ কোটি ১৯ লাখ ১১ হাজার টাকা।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত প্রথম সংশোধনীতে প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়ে করা হয়েছে ৫৪১ কোটি ২১ লাখ ৮২ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রকল্প ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৭২ কোটি ৩ লাখ টাকা, যা মূল ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ১৫ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেশি।
কিন্তু এই বাড়তি ব্যয়ের বড় অংশই চলে গেছে ইলেক্ট্রো-মেকানিক্যাল সরঞ্জাম কেনাকাটায়—এমন অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
লিফটেই বাড়তি ৩১ কোটি ৭৩ লাখ!
মূল প্রস্তাবে ৪৩০টি ফ্ল্যাটের জন্য ১৯টি লিফট কেনায় ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৭ কোটি ২০ লাখ ৮৭ হাজার টাকা।
প্রথম সংশোধনীতে একই ১৯টি লিফটের ব্যয় বাড়িয়ে করা হয়েছে ৪৮ কোটি ৯৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা।
অর্থাৎ—
মূল বরাদ্দ: ১৭ কোটি ২০ লাখ ৮৭ হাজার টাকা
সংশোধিত বরাদ্দ: ৪৮ কোটি ৯৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা
অতিরিক্ত ব্যয়: ৩১ কোটি ৭৩ লাখ ৫৩ হাজার টাকা
প্রকল্পের মোট ব্যয় বৃদ্ধির পরিমাণ যেখানে প্রায় ৭২ কোটি টাকা, সেখানে শুধু ১৯টি লিফটের জন্যই অতিরিক্ত বরাদ্দ ৩১ কোটি টাকার বেশি হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে।
সংখ্যা কমেছে, খরচ বেড়েছে!
শুধু লিফট নয়, অন্যান্য ইলেক্ট্রো-মেকানিক্যাল খাতেও একই ধরনের ব্যয় বৃদ্ধির তথ্য পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন।
বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন : মূল প্রস্তাবে ১০টি সাবস্টেশনের জন্য বরাদ্দ ছিল ৬ কোটি ১০ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। সংশোধনীতে সাবস্টেশনের সংখ্যা ১০টি থেকে কমিয়ে ৮টি করা হলেও ব্যয় বাড়িয়ে করা হয়েছে ৮ কোটি ৩৯ লাখ ১১ হাজার টাকা। অর্থাৎ সংখ্যা কমলেও ব্যয় বেড়েছে ২ কোটি ২৮ লাখ ১৭ হাজার টাকা।
জেনারেটর : জেনারেটরের সংখ্যা ১০টি থেকে কমিয়ে ৮টি করা হয়েছে। অথচ মূল বরাদ্দ ২ কোটি ৯১ লাখ ৪৩ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে সংশোধনীতে করা হয়েছে ৪ কোটি ৭৯ লাখ ৪৩ হাজার টাকা। অতিরিক্ত ব্যয় ১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।
পাম্প-মোটর : প্রতি সেটের মূল দাম ধরা হয়েছিল ৮ লাখ ৩০ হাজার টাকা। সংশোধনীতে তা বেড়ে হয়েছে ১১ লাখ ৪৭ হাজার টাকা। ফলে এ খাতে অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৬৬ লাখ ২১ হাজার টাকা।
অগ্নিনিরোধক ব্যবস্থা : মূল প্রস্তাবে ব্যয় ছিল ৬ কোটি ৫০ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। সংশোধনীতে জব সংখ্যা ১০টি থেকে কমিয়ে ২টি করা হলেও ব্যয় বাড়িয়ে করা হয়েছে ৯ কোটি ৮২ লাখ ১৭ হাজার টাকা। অর্থাৎ কাজের সংখ্যা কমলেও ব্যয় বেড়েছে ৩ কোটি ৩১ লাখ ৩২ হাজার টাকা।
ফোর্স ভেন্টিলেশন : মূল প্রস্তাবে বরাদ্দ ছিল ৪৮ লাখ টাকা। সংশোধনীতে তা বাড়িয়ে করা হয়েছে ১ কোটি ৯৩ লাখ ৯ হাজার টাকা। অতিরিক্ত ব্যয় ১ কোটি ৪৫ লাখ ৯ হাজার টাকা।
৩০ প্রকল্পে একই কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ
জাগৃকের কর্মকর্তাদের অভিযোগ অনুযায়ী, মিরাজ হোসেনের সম্পৃক্ততার কথা যেসব প্রকল্পের ইলেক্ট্রো-মেকানিক্যাল কেনাকাটায় বলা হচ্ছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে স্বপ্ননগর আবাসিক প্রকল্প-১ ও ২, মিরপুর ৩৬০ ফ্ল্যাট প্রকল্প, লালমাটিয়া ৮৮ ফ্ল্যাট প্রকল্প, লালমাটিয়া ৫৪ ফ্ল্যাট প্রকল্প, লালমাটিয়া অফিসার্স কোয়ার্টার, লালমাটিয়া বাণিজ্যিক মার্কেট, যশোর বাণিজ্যিক প্রকল্প, মিরপুর গ্রেনেড হামলা প্রকল্প, চট্টগ্রামের পাঁচটি ফ্ল্যাট প্রকল্প, কক্সবাজার ফ্ল্যাট প্রকল্প, বগুড়া ফ্ল্যাট প্রকল্প, দিনাজপুর ফ্ল্যাট প্রকল্প, সেগুনবাগিচা গৃহায়ন ভবন ও যশোর ফ্ল্যাট প্রকল্প।
কর্মকর্তাদের দাবি, এসব প্রকল্পের ডিপিপি ও সংশোধিত ব্যয় যাচাই করলে অনুমোদিত ব্যয় এবং প্রকৃত ব্যয়ের পার্থক্য স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে এসব কেনাকাটায় পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছ কিনা,সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
যশোর প্রকল্পেও লিফট নিয়ে প্রশ্ন
সর্বশেষ যশোর বাণিজ্যিক প্রকল্পের লিফট কেনাকাটা নিয়েও মিরাজ হোসেন আলোচনায় এসেছেন বলে কর্মকর্তারা দাবি করেছেন।
তাদের অভিযোগ, সেখানে ১০ কোটি টাকার লিফট ১৪ কোটি ৬৫ লাখ টাকায় কেনা হয়েছে। এত অভিযোগের পরও মিরাজ হোসেনের অবস্থান পরিবর্তন হয়নি বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
বিদেশ সফর নিয়েও গুরুতর অভিযোগ
জাগৃকের কয়েকজন কর্মকর্তার অভিযোগ, লিফট কেনাকাটাকে কেন্দ্র করে কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, সদস্য এবং মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের সুযোগ করে দিয়ে নিজের প্রভাব ধরে রাখেন মিরাজ হোসেন।
তাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের পাশাপাশি ইচ্ছেমতো ডলার দিয়ে প্রমোদভ্রমণের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। এসব সফরের পর মিরাজ হোসেনের ভূমিকা নিয়ে আর কেউ প্রশ্ন তোলেন না—এমন অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে সংশ্লিষ্ট নথি বা স্বাধীন যাচাইযোগ্য প্রমাণ প্রতিবেদনে উপস্থাপিত হয়নি।
ঠিকাদারের অর্থে বিদেশ সফরের অভিযোগ
জাগৃকের কর্মকর্তারা জানান, গৃহায়নের দুটি প্রকল্প থেকে মোট নয়জন কর্মকর্তা বিদেশ সফর করেছেন।
তাদের অভিযোগ, লিফট কেনার নামে মিরপুরের ‘স্বপ্ননগর-২’ ১৪ তলা আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের অর্থে প্রকৌশলী মিরাজ হোসেনসহ গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বিদেশ সফর করেছেন।
এ ছাড়া ৮৮টি আবাসিক ফ্ল্যাট এবং কর্মচারীদের জন্য ৫৪টি আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ক্রিয়েটিভ ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের অর্থে কয়েকজন কর্মকর্তা সুইজারল্যান্ড সফর করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
কর্মকর্তাদের দাবি, এসব বিদেশ সফরের পর সংশ্লিষ্ট অনেকের বদলি হলেও মিরাজ হোসেনের বদলি হয়নি।
‘এ ক্যাটাগরির লিফটের দাম বেশি’—মিরাজ
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী (ই/এম ডিভিশন) মো. মিরাজ হোসেন বলেন, ডিপিপিতে প্রথমে ‘বি’ ক্যাটাগরির লিফট ধরা হয়েছিল। পরে মন্ত্রণালয়ের স্ট্যান্ডিং কমিটি ‘এ’ ক্যাটাগরির লিফট ব্যবহারের সিদ্ধান্ত দেয়।
তার দাবি, এরপর পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্ট (পিডব্লিউডি)-এর শিডিউল অনুযায়ী ‘এ’ ক্যাটাগরির লিফটের ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে।
লিফটের দাম কেন এত বেড়েছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যে ক্যাটাগরির লিফট ধরা হয়েছে, সেগুলোর দাম বেশি এবং আগের দামের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। পিডব্লিউডির শিডিউলে পরিবর্তন এনে যে নতুন দর নির্ধারণ করা হয়েছে, সেই দরই প্রকল্পে ধরা হয়েছে বলে তিনি জানান।
দুর্নীতির সুযোগ থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে মিরাজ হোসেন বলেন, মন্ত্রণালয়ে সমন্বয় সভা হয়, প্রকল্প পরিচালক রয়েছেন, তার অধীনস্থ কর্মকর্তারা আছেন এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও বিষয়টির সঙ্গে যুক্ত। ফলে কোনো সিদ্ধান্ত এককভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
দীর্ঘদিন একই পদে থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাকে দেবে কোথায়, যাওয়ার তো জায়গা নাই।’
চেয়ারম্যানের বক্তব্য মেলেনি
অতিরিক্ত দামে লিফট কেনা এবং প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়ে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোসা. ফেরদৌসী বেগমের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
পরে ক্ষুদে বার্তায় যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রতিউত্তরে বলেন, ‘তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী আবেদন করুন। সকল তথ্য পাবেন।
এখন বড় প্রশ্ন—ব্যয় বাড়ল কেন?
প্রকল্পটির প্রথম সংশোধনীতে মোট ব্যয় যেখানে প্রায় ৭২ কোটি টাকা বেড়েছে, সেখানে শুধু লিফট খাতেই অতিরিক্ত বরাদ্দ ৩১ কোটি ৭৩ লাখ টাকার বেশি।
এর সঙ্গে সাবস্টেশন, জেনারেটর, পাম্প-মোটর, অগ্নিনিরোধক ব্যবস্থা ও ফোর্স ভেন্টিলেশনসহ একাধিক খাতে ব্যয় বৃদ্ধির তথ্যও সামনে এসেছে। সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে এমন কিছু খাতে, যেখানে সরঞ্জামের সংখ্যা বা কাজের পরিমাণ কমানো হলেও বরাদ্দ উল্টো বেড়েছে।
ফলে ‘দোলনচাঁপা-কনকচাঁপা’ প্রকল্পের ইলেক্ট্রো-মেকানিক্যাল সরঞ্জাম কেনাকাটার প্রাক্কলন, সংশোধিত ব্যয়, দর নির্ধারণ, পিপিআর অনুসরণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা—সবকিছুই এখন স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ যাচাইয়ের দাবি রাখে।
প্রশ্ন উঠছে—১৭ কোটি টাকার লিফট কীভাবে ৪৯ কোটির কাছাকাছি পৌঁছাল? আর একই কর্মকর্তা প্রায় ১৯ বছর ধরে একই চেয়ারে থাকার নেপথ্যে আসলে কী?
