শুক্রবার, ৪ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২০শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

চিকিৎসক সংকটে সরাইলের স্বাস্থ্যসেবা,৫০ শয্যার হাসপাতালে নেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, দুই বছর ধরে অচল জেনারেটর—ওষুধ, টিকিট ও ব্যবস্থাপনা নিয়েও নানা অভিযোগ

মো. আক্তার হোসেন
সেপ্টেম্বর ৩, ২০২৬ ৬:১৬ অপরাহ্ণ
Link Copied!

ফাইল ফটো

চিকিৎসক সংকট, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অনুপস্থিতি, প্রয়োজনীয় জনবলের ঘাটতি—এর সঙ্গে যোগ হয়েছে জেনারেটর অচল থাকা, ওষুধ বিতরণ ও টিকিট বিক্রিসহ ব্যবস্থাপনায় নানা অভিযোগ। সব মিলিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাসেবা যেন নানা সংকটে আটকে পড়েছে।

প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষের চিকিৎসার অন্যতম প্রধান ভরসা ৫০ শয্যার সরকারি হাসপাতালটি। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় চিকিৎসক ও জনবল কম থাকায় প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগীকে সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় জটিল রোগে আক্রান্তদের ছুটতে হচ্ছে জেলা সদরসহ বিভিন্ন হাসপাতালে।

৩০ পদের বিপরীতে চিকিৎসক মাত্র ১৬

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ৫০ শয্যার এ হাসপাতালে প্রথম শ্রেণির ৩০টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ১৬ জন। তবে এর মধ্যে পাঁচজন চিকিৎসক ডেপুটেশনে রয়েছেন। আরও দুইজন চিকিৎসককে পদায়ন করা হলেও তাঁরা এখনো কর্মস্থলে যোগ দেননি। ফলে কাগজে-কলমে ১৬ জন চিকিৎসক থাকলেও বাস্তবে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন আরও কমসংখ্যক চিকিৎসক।

আরও বড় সংকট তৈরি হয়েছে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায়। হাসপাতালে জুনিয়র কনসালট্যান্ট সার্জারি, মেডিসিন, শিশু, চক্ষু ও ইএনটি বিভাগের পদ থাকলেও বর্তমানে এসব পদে কোনো কনসালট্যান্ট চিকিৎসক নেই।

ফলে জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের নির্ভর করতে হচ্ছে জেলা সদর হাসপাতাল কিংবা বেসরকারি হাসপাতালের ওপর।

প্রতিদিন ৫০০-৬০০ রোগীর চাপ

হাসপাতাল সূত্র জানায়, প্রতিদিন বহির্বিভাগে গড়ে ৫০০ থেকে ৬০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। বিপুলসংখ্যক রোগীর তুলনায় চিকিৎসক ও সহায়ক জনবল কম হওয়ায় সেবা দিতে গিয়ে চাপ সামলাতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে।

তৃতীয় শ্রেণির ৮০ জন এবং চতুর্থ শ্রেণির ১৯ জন কর্মরত থাকলেও সামগ্রিক জনবল সংকট পুরোপুরি কাটেনি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

সরাইল সদর এলাকার নাথপাড়ার বাসিন্দা মো. সোহেল মিয়া (৫০) ও দেওড়া গ্রামের রোকেয়া বেগম বলেন, চিকিৎসক কম থাকায় আমরা ঠিকমতো সেবা পাচ্ছি না। নিউরো বিশেষজ্ঞ দেখাতে এসে জানতে পারলাম এখানে এমন কোনো চিকিৎসক নেই। তাই বাধ্য হয়ে জেলা শহরে যেতে হচ্ছে।

মেডিসিন বিশেষজ্ঞ দেখাতে আসা আরেক রোগী বলেন, আমার মেয়ে অসুস্থ। হাসপাতালে এসে জানতে পারলাম এখানে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ নেই। সরকারি হাসপাতালে এসেও যদি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা না পাওয়া যায়, তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে?

চিকিৎসার পাশাপাশি ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন

চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা নিয়েও রোগী ও স্বজনদের নানা অভিযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে সরকারি কর্মকর্তার জন্য নির্ধারিত চেয়ারে একজন বহিরাগত ব্যক্তিকে বসিয়ে ওষুধ বিতরণ, নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে টিকিট বিক্রি এবং হাসপাতালে ওষুধ মজুত থাকার পরও রোগীদের বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে বলার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

হাসপাতালের ওষুধ বিতরণকেন্দ্রে সরকারি কর্মকর্তার জন্য নির্ধারিত চেয়ারে একজন বহিরাগত ব্যক্তিকে বসে কাজ করতে দেখা যায়। এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি জানেন বলে জানান।

তাঁর দাবি, ওই ব্যক্তি শিক্ষিত এবং কাজটি করায় আপাতত কোনো সমস্যা নেই।

তবে সরকারি কর্মকর্তার পরিবর্তে একজন বহিরাগত ব্যক্তিকে দিয়ে সরকারি কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে কোনো লিখিত অনুমোদন রয়েছে কি না—সে প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি।

৩ টাকার টিকিটে নেওয়া হচ্ছে ৫ টাকা?

বহির্বিভাগের টিকিট নিয়েও রোগীদের অভিযোগ রয়েছে। কয়েকজন রোগী জানান, ৩ টাকা নির্ধারিত মূল্যের টিকিটের জন্য তাঁদের কাছ থেকে ৫ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে।

এ অভিযোগের বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চাওয়া হলেও সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন।

প্রেসক্রিপশনের ওষুধও বাইরে থেকে

ওষুধ সরবরাহ নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন রোগীরা। তাঁদের অভিযোগ, চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনে একাধিক ওষুধ লেখা থাকলেও হাসপাতালের কাউন্টার থেকে সব ওষুধ দেওয়া হয় না। অনেক সময় এক-দুই ধরনের কমদামি ওষুধ দিয়ে বাকি ওষুধ বাইরে থেকে কিনে আনতে বলা হয়।

এক রোগী বলেন, আমরা দরিদ্র মানুষ। বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার সামর্থ্য নেই বলেই সরকারি হাসপাতালে আসি। এখানে এসে যদি প্রেসক্রিপশনের ওষুধও বাইরে থেকে কিনতে হয়, তাহলে সরকারি হাসপাতালের সুবিধা কী?

আক্ষেপ করে ওই রোগী আরও বলেন, ৬০ টাকা গাড়িভাড়া দিয়ে এসে ১০ টাকা মূল্যের এন্টারসিড ট্যাবলেট পেয়েছি।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রয়োজনীয় কিছু ওষুধ মজুত রয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ নিজাম উদ্দিন বলেন, হাসপাতালে গ্যাসের ওষুধ পর্যাপ্ত আছে। তবে প্রেসক্রিপশনে থাকা অন্যান্য ওষুধ রোগীদের কেন দেওয়া হচ্ছে না—এ বিষয়ে ওঠা অভিযোগ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, হাসপাতালের ওষুধের মজুত, বিতরণ ও রোগীদের সরবরাহের হিসাব স্বচ্ছভাবে যাচাই করা দরকার। একই সঙ্গে টিকিটের মূল্য এবং সরকারি কাজে বহিরাগত ব্যক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা উচিত।

সীমিত জনবলেই সেবা দেওয়ার দাবি কর্তৃপক্ষের

ডা. মোহাম্মদ নিজাম উদ্দিন বলেন, প্রতিদিন হাসপাতালে ৫০০ থেকে ৬০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। সীমিত জনবল দিয়েই আমরা আন্তরিকভাবে সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। তবে চিকিৎসক ও জনবল সংকটের কারণে অনেক সময় চাপ সামলাতে কষ্ট হয়।

তিনি জানান, শূন্য পদে চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়েছে। দুইজন চিকিৎসককে পদায়ন করা হলেও তাঁরা এখনো কাজে যোগ দেননি। দ্রুত জনবল নিয়োগ হলে রোগীদের আরও ভালো সেবা দেওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

আধুনিক অপারেশন থিয়েটার, তবু নিয়মিত অস্ত্রোপচার নেই

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে ১৯৭৫ সালে সরাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ২০১২ সালে হাসপাতালটি ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়।

হাসপাতালে আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের ব্যবস্থা থাকলেও আধুনিক অপারেশন থিয়েটারের বেশিরভাগই বন্ধ থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে। বছরে লোকদেখানো কয়েকটি সিজারিয়ান অপারেশন করা হয় বলেও স্থানীয়দের অভিযোগ। ফলে চিকিৎসক ও জনবল সংকট এবং ব্যবস্থাপনার নানা অভিযোগের কারণে বিদ্যমান অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধার পূর্ণ সুফল পাচ্ছেন না উপজেলাবাসী।

দুই বছর ধরে অচল জেনারেটর

হাসপাতালের আরেকটি বড় সমস্যা বিদ্যুৎ ব্যবস্থা। বিদ্যুৎ চলে গেলে হাসপাতালের রোগী ও স্বজনদের অন্ধকারে থাকতে হয়। হাসপাতাল প্রাঙ্গণে জেনারেটর থাকলেও সেটি প্রায় দুই বছর ধরে অচল বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হলে জরুরি সেবা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রোগী ও স্বজনদের চলাচলেও দুর্ভোগ বেড়ে যায়।

প্রশ্ন স্থানীয়দের—এভাবেই কি নিশ্চিত হবে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা?

প্রতিদিন শত শত মানুষ চিকিৎসার জন্য আসা এই হাসপাতালে যদি প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও জনবলই না থাকে, তাহলে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার কাঙ্ক্ষিত মান নিশ্চিত হবে কীভাবে—এ প্রশ্ন এখন সরাইলবাসীর।

স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত চিকিৎসক ও জনবলের শূন্য পদ পূরণ, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পদায়ন, ওষুধের মজুত ও বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত, টিকিটের মূল্য নিয়ে ওঠা অভিযোগ তদন্ত, অকেজো জেনারেটর সচল এবং হাসপাতালের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় নিয়মিত তদারকি জোরদার করা জরুরি।

তাঁদের প্রত্যাশা, সরকারি এই হাসপাতালটি যেন শুধু ভবন, শয্যা ও অবকাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং নিম্নআয়ের ও প্রান্তিক মানুষের জন্য সহজলভ্য, স্বচ্ছ, কার্যকর ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবার নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।