আওয়ামী লীগের রাজনীতি থেকে জুলাই হত্যা মামলায় নাম; পিবিআইয়ের অব্যাহতির সুপারিশের পাশাপাশি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিদর্শনে মিলেছিল একাধিক অনিয়ম—অভিযোগ নিয়ে মন্তব্য করতে নারাজ হাসপাতালের ব্র্যান্ড অ্যান্ড কমিউনিকেশন কর্মকর্তা। ফাইল ছবি
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ রাজধানীর মিরপুর-১০-এর পরিচিত বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান আলোক হেলথ কেয়ার লিমিটেড। চিকিৎসাসেবা দেওয়ার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. লোকমান হোসেনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, মামলা এবং হাসপাতালের বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ নিয়েও বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে।
লোকমান হোসেন একসময় ঘাটাইল উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ছিলেন। ২০২৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগ-সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
অন্যদিকে জুলাই আন্দোলনের সময় মিরপুরে সংঘটিত একটি হত্যা মামলায়ও তাঁর নাম আসামি হিসেবে উঠে আসে। তবে পরবর্তী সময়ে মামলাটি তদন্ত করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় তাঁকে মামলাটি থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়।
অর্থাৎ রাজনৈতিক পরিচয় ও মামলার বিষয়টি একদিকে থাকলেও আলোক হেলথ কেয়ারের চিকিৎসাসেবা নিয়ে সরকারি পর্যায়ের পরিদর্শনে উঠে আসা অনিয়মের অভিযোগই এখন নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিদর্শনে ‘একগুচ্ছ’ অনিয়ম
২০২৪ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা মিরপুরের আলোক হেলথ কেয়ার পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনের পর প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম সাময়িক বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চিঠির বরাতে বলা হয়, হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসকের পরিবর্তে নার্স দিয়ে আহত রোগীর সেলাই করানো, চিকিৎসকের নামে বিল দেখানো এবং রোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়াসহ বিভিন্ন অনিয়ম পাওয়া যায়।
শুধু জরুরি বিভাগেই নয়, হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের কাছ থেকেও বিভিন্ন সেবার নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠে আসে।
একজন অস্ত্রোপচারের রোগীর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রি-অ্যানেসথেটিক মূল্যায়ন না করা এবং ইনফর্মড কনসেন্টে রোগীর স্বাক্ষর না থাকার বিষয়ও পরিদর্শনে ধরা পড়েছিল বলে প্রকাশিত সংবাদে উল্লেখ করা হয়।
সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্যগুলোর একটি ছিল—হাসপাতালের ল্যাবরেটরির ডিপ ফ্রিজে আইসক্রিম পাওয়ার বিষয়টি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চিঠির বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্যও উঠে আসে।
একটি হাসপাতালের ল্যাবরেটরিতে যেখানে রোগ নির্ণয়ের নমুনা ও সংরক্ষণব্যবস্থার কঠোর মানদণ্ড অনুসরণের কথা, সেখানে এমন ঘটনা কীভাবে ঘটল—তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
অতিরিক্ত অর্থ আদায়েও জরিমানার নজির
আলোক হেলথ কেয়ারের বিরুদ্ধে রোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও নতুন নয়।
২০১৯ সালের ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবের সময় সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি অর্থ নেওয়ার অভিযোগে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর মিরপুরের আলোক হেলথ কেয়ার লিমিটেডকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেছিল।
অর্থাৎ চিকিৎসাসেবার নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে সরকারি সংস্থার পদক্ষেপ নেওয়ার নজির রয়েছে।
রাজনীতির বলয়েও আলোচিত লোকমান
আলোক হেলথ কেয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. লোকমান হোসেনের রাজনৈতিক পরিচয়ও বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে।
তিনি ঘাটাইল উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ছিলেন এবং ২০২৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার, বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক কিংবা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অর্থায়নের যেসব দাবি ও অভিযোগ ছড়িয়েছে, সেগুলোর সবকটির পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য নথি পাওয়া যায়নি।
তাই এসব দাবিকে প্রমাণিত তথ্য হিসেবে নয়, অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
জুলাই হত্যা মামলায় নাম, তদন্তে অব্যাহতির সুপারিশ
জুলাই আন্দোলনের সময় মিরপুর-১০ এলাকায় রাকিব হোসেনের মৃত্যুর ঘটনায় করা একটি মামলায় লোকমান হোসেনের নাম আসামিদের তালিকায় ছিল।
পরবর্তী সময়ে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পায় পিবিআই। তদন্ত শেষে লোকমান হোসেনসহ একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় তাঁদের মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করে তদন্ত সংস্থাটি।
ফলে ওই হত্যা মামলায় লোকমান হোসেনকে দোষী বা হত্যাকাণ্ডে সরাসরি সম্পৃক্ত ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই প্রযোজ্য।
অভিযোগের বিষয়ে ‘নীরব’ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ
আলোক হেলথ কেয়ার এবং এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. লোকমান হোসেনকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিদর্শনে পাওয়া অনিয়ম এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগের বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে আলোক হাসপাতালের ব্র্যান্ড অ্যান্ড কমিউনিকেশন কর্মকর্তা মো. আব্দুল হালিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ফলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিদর্শনে উঠে আসা অনিয়ম, অতিরিক্ত বিল আদায়ের অভিযোগ এবং এসব ঘটনায় পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটি কী ধরনের সংশোধনী ব্যবস্থা নিয়েছে—সে বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
প্রশ্নের মুখে চিকিৎসাসেবার মান
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিদর্শনে একাধিক অনিয়ম চিহ্নিত হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—বর্তমানে আলোক হেলথ কেয়ারে চিকিৎসাসেবার মান ও রোগীর নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত?
সাময়িক বন্ধ রাখার নির্দেশের পর কোন কোন শর্ত পূরণ করে প্রতিষ্ঠানটি পুনরায় কার্যক্রম শুরু করেছিল?
জরুরি বিভাগে চিকিৎসকের পরিবর্তে নার্স দিয়ে চিকিৎসা দেওয়ার অভিযোগের পর সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল?
রোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ ঠেকাতে বর্তমানে কী ধরনের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা রয়েছে?
আর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিদর্শনে চিহ্নিত সমস্যাগুলো আদৌ পুরোপুরি সমাধান করা হয়েছে কি না—সেই প্রশ্নের উত্তরও জনসমক্ষে আসা প্রয়োজন।
কারণ একটি বেসরকারি হাসপাতালের ওপর মানুষের আস্থা শুধু আধুনিক ভবন, চিকিৎসক কিংবা প্রচারণায় তৈরি হয় না। রোগীর নিরাপত্তা, চিকিৎসার মান, নিয়ম মেনে সেবা প্রদান এবং বিলিংয়ের স্বচ্ছতাই সেই আস্থার মূল ভিত্তি।
তাই লোকমান হোসেনের রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা জুলাই হত্যা মামলায় তাঁর নাম ওঠা-না ওঠার বিতর্কের বাইরেও আলোক হেলথ কেয়ারের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো—
রোগীরা কি সেখানে নিরাপদ, স্বচ্ছ ও নিয়মমাফিক চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন?
এই প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেই প্রত্যাশিত। পাশাপাশি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থারও দায়িত্ব—আগে চিহ্নিত অনিয়মগুলোর বর্তমান অবস্থা এবং সংশোধনমূলক পদক্ষেপ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য জনসমক্ষে পরিষ্কার করা।
