রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকার মহামূল্যবান দুই একর জমি—সরকারি হিসাবে যার বর্তমান মূল্য শত শত কোটি টাকা—মাত্র ৭০ লাখ ৯৫ হাজার টাকায় বকেয়া কিস্তি পরিশোধের মাধ্যমে পুনরায় সক্রিয় করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ১৯৫৫ সালে পূর্ব পাকিস্তান সরকারের আমলে ‘মেসার্স রহমান মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজের’ নামে বরাদ্দ দেওয়া তেজগাঁও শিল্প এলাকার ৪০৩ ও ৪০৪ নম্বর প্লট নিয়ে উঠেছে একাধিক গুরুতর প্রশ্ন।
অভিযোগ, ৬৬ বছর ধরে বকেয়া থাকা পাঁচ কিস্তির অর্থ ২০২১ সালে পাকিস্তান আমলের শর্ত ও রেটে পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়। এরপর জমির মালিকানা ও হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয় প্রভাবশালী দুই প্রতিষ্ঠান—বেক্সিমকো হোল্ডিংস লিমিটেড এবং রয়েল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা। অথচ তেজগাঁও শিল্প এলাকায় বর্তমানে প্রতি কাঠা জমির সরকারি সর্বনিম্ন মৌজা দরই কোটি টাকার ওপরে। আর বাস্তব বাজারদর আরও কয়েক গুণ বেশি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
নথি ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, রাস্তার পাশে অবস্থিত ৪০৩ ও ৪০৪ নম্বর প্লটের প্রতি কাঠা ৫ কোটি টাকা ধরে হিসাব করলে দুই একর বা ১২০ কাঠা জমির আনুমানিক মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৬০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ শত শত কোটি টাকা মূল্যের জমির বিপরীতে ২০২১ সালে মাত্র ৭০ লাখ ৯৫ হাজার টাকা পরিশোধের ঘটনা এখন বড় প্রশ্নের মুখে।
১৯৫৫ সালের বরাদ্দ, ৬৬ বছর পর বকেয়া পরিশোধ
জমি বরাদ্দের নথি ঘেঁটে দেখা গেছে, ভারী শিল্পের বিকাশের লক্ষ্যে ১৯৫৫ সালে তেজগাঁও শিল্প এলাকায় ৪০৩ ও ৪০৪ নম্বর প্লটের দুই একর জমি ‘মেসার্স রহমান মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজের’ নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়। জমির লিজমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫৬ হাজার ৯০০ টাকা (রুপি)। শর্ত অনুযায়ী অর্থ ২০ কিস্তিতে পরিশোধ করার কথা ছিল।
তৎকালীন লিজগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে চালানের মাধ্যমে ৪ হাজার ৫০০ টাকা জমা দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ১৫ কিস্তির অর্থ পরিশোধের পর প্রতিষ্ঠানটি আর কিস্তি পরিশোধ করেনি। ফলে পাঁচ কিস্তি বকেয়া থেকে যায়।
এরপর দীর্ঘ ৬৬ বছর পর, ২০২১ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ওই পাঁচ কিস্তির বকেয়া বাবদ ৭০ লাখ ৯৫ হাজার টাকা পরিশোধ করেন আব্দুল্লাহ সোলেনখী ওরফে আব্দুল্লাহর ওয়ারিশ জাকাউল্লাহ আব্দুল্লাহ। এভাবেই দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা লিজটি আবার কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হয়।
বকেয়া পরিশোধের পরই বদলে যায় জমির গন্তব্য
নথি অনুযায়ী, ২০২১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর জাকাউল্লাহ আব্দুল্লাহ জমি হস্তান্তরের জন্য গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি তেজগাঁও শিল্প এলাকার ৪০৩ নম্বর প্লটটি বেক্সিমকো হোল্ডিংস লিমিটেডের নামে হস্তান্তরের অনুমতি দেয় মন্ত্রণালয়। এক একর জমি চলে যায় প্রতিষ্ঠানটির নামে।
অন্যদিকে, ২০২২ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ৪০৪ নম্বর প্লট হস্তান্তরের জন্য আবেদন করেন আব্দুল্লাহর আরেক ওয়ারিশ সাইফুল্লাহ আব্দুল্লাহ সোলেনখী। সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে একই বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর রয়েল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকার অনুকূলে প্লটটি হস্তান্তরের অনুমতি দেওয়া হয়।
এর মাধ্যমে ১৯৫৫ সালে ‘মেসার্স রহমান মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজের’ নামে বরাদ্দ করা দুই একর জমি শেষ পর্যন্ত দুটি প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। রয়েল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা যে ৪০৪ নম্বর প্লটে নিজস্ব ক্যাম্পাস পরিচালনা করছে, ২০২৩ সালের একটি প্রকাশিত সংবাদেও তার উল্লেখ রয়েছে।
বর্তমান বাজারদর বনাম পাকিস্তান আমলের রেট
সংশ্লিষ্টদের মতে, এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—২০২১ সালে ৬৬ বছর আগের শর্ত ও রেট কার্যকর রেখে কীভাবে এত মূল্যবান সরকারি শিল্পজমির বকেয়া কিস্তি নিষ্পত্তি করা হলো?
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, ১৯৫৫ সালের পাকিস্তান আমলের মুদ্রার মূল্য, জমির চাহিদা এবং ২০২১ সালের অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে। ফলে বর্তমান বাস্তবতায় ওই পুরোনো রেটে জমির বকেয়া নিষ্পত্তির সুযোগ দেওয়া হয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি রাখে।
অন্যদিকে, ২০০৫ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর সংশোধিত রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮ অনুযায়ী জমি রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে সরকারের নির্ধারিত বর্তমান মৌজা রেট বা সর্বনিম্ন বাজারমূল্য বিবেচনার বিষয়টি সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, ৪০৩ ও ৪০৪ নম্বর প্লটের ক্ষেত্রে এই বিধানের যথাযথ প্রয়োগ হয়নি।
একই মন্ত্রণালয়ের আরেক ঘটনায় ছিল বর্তমান মূল্য
নথিতে থাকা আরেকটি উদাহরণ এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন আরও জোরালো করেছে।
১৯৯২ সালে ফিনল্যান্ড বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের অনুকূলে তেজগাঁও শিল্প এলাকায় ১০ কাঠার একটি নবসৃষ্ট প্লট লিজ দেওয়া হয়েছিল। বরাদ্দমূল্য ছিল ৮ লাখ টাকা। প্রতিষ্ঠানটি প্রথমে ২ লাখ টাকা পরিশোধ করে।
দীর্ঘ ২৮ বছর পর ২০২০ সালে বর্তমান রেট ও চক্রবৃদ্ধি হিসাব অনুযায়ী বাকি অর্থ বাবদ ৪ কোটি ৪১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়।
কিন্তু এর মাত্র এক বছর পর ২০২১ সালে রহমান মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজের ৪০৩ ও ৪০৪ নম্বর প্লটের দুই একরের পাঁচ কিস্তির বকেয়া বাবদ পরিশোধ করা হয় ৭০ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। ফলে একই ধরনের পুরোনো লিজের ক্ষেত্রে মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতিতে কেন এত বড় পার্থক্য—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
৯৯ বছরের লিজ, দুই বছরের মধ্যে কারখানা স্থাপনের শর্ত
১৯৫৬ সালের ১৩ এপ্রিল ৫৪০৪ নম্বর দলিলমূলে ৯৯ বছরের জন্য ‘মেসার্স রহমান মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজের’ নামে ইন্ডাস্ট্রিয়াল লিজ চুক্তি করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী ছিলেন পাকিস্তানের করাচির একজন ঠিকাদার।
চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছিল—জমি বুঝে নেওয়ার পর দুই বছরের মধ্যে সেখানে শিল্পকারখানা নির্মাণ ও উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করতে হবে। ব্যর্থ হলে ইজারা বাতিলযোগ্য হওয়ার কথা।
কিন্তু বর্তমানে ৪০৩ ও ৪০৪ নম্বর প্লটে সেই মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো শিল্পকারখানা নেই। ফলে লিজের শর্ত বাস্তবায়ন হয়েছিল কি না, শর্ত ভঙ্গের পরও কীভাবে লিজ বহাল ছিল এবং পরবর্তীতে কীভাবে তা হস্তান্তর হলো—এসব প্রশ্নও সামনে এসেছে।
৪০৩ নম্বরে ভাঙাচোরা ভবন, ৪০৪-এ বিশ্ববিদ্যালয়
সরেজমিনে দেখা গেছে, ৪০৩ নম্বর প্লটে স্টিল ও গ্লাসের সমন্বয়ে তৈরি একটি দোতলা ভবন রয়েছে। ভবনটি বর্তমানে অনেকটাই ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে আছে। ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকেই ভবনটির এমন দশা বলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে। বর্তমানে জমিটি দারাজের গাড়ির গ্যারেজ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
পাশের ৪০৪ নম্বর প্লটে রয়েছে রয়েল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা। স্টিলের কাঠামোয় নির্মিত তিনতলা ভবনের একটি অংশ শিক্ষার্থীরা খেলার মাঠ হিসেবেও ব্যবহার করছেন।
অর্থাৎ যে জমি শিল্পকারখানা স্থাপনের উদ্দেশ্যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, সময়ের ব্যবধানে তার ব্যবহার ও মালিকানা কাঠামো সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ পেয়েছে।
নামজারি ফি মাত্র ৪০ হাজার টাকা
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের নথিতে দেখা যায়, ৪০৩ ও ৪০৪ নম্বর প্লটের হস্তান্তরদাতা হিসেবে আব্দুল্লাহ সোলেনখী ওরফে আব্দুল্লাহর ওয়ারিশদের নাম রয়েছে। তাঁরা হলেন—সাবিরা আব্দুল্লাহ, জাকাউল্লাহ আব্দুল্লাহ, সাইফুল্লাহ আব্দুল্লাহ সোলেনখী, সানাউল্লাহ আব্দুল্লাহ, হেদায়েতউল্লাহ আব্দুল্লাহ এবং সাইফুল্লাহ আব্দুল্লাহ সোলেনখী।
তাঁদের কাছ থেকে ৪০৩ নম্বর প্লট বেক্সিমকো হোল্ডিংস লিমিটেড এবং ৪০৪ নম্বর প্লট রয়েল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকার কাছে হস্তান্তর করা হয়।
হস্তান্তরের পর ২০২৩ সালের ২৯ মে ৪০৩ নম্বর প্লটের নামজারি ফি বাবদ ৪০ হাজার টাকা চালানের মাধ্যমে জমা দেন বেক্সিমকো হোল্ডিংস লিমিটেডের পরিচালক ওসমান কায়সার চৌধুরী।
বেক্সিমকো হোল্ডিংস লিমিটেডের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন সালমান এফ রহমান, যিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন।
অন্যদিকে, ৪০৪ নম্বর প্লটের নামজারি ফি বাবদও ৪০ হাজার টাকা জমা দেওয়া হয়। রয়েল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকার পক্ষে ভাইস চেয়ারম্যান ডা. এইচ বি এম ইকবালের নামও সংশ্লিষ্ট নথিতে এসেছে। তিনি সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১০ আসনের আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য এবং প্রিমিয়ার ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
৩০ কাঠা জমি ‘ট্রাস্টের’ নামে দান
ঘটনার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রয়েছে ৪০৩ নম্বর প্লটকে ঘিরে।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের নথি অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি এক একর জমি বেক্সিমকো হোল্ডিংস লিমিটেডের নামে হস্তান্তর করা হয়। এর পর ২০২৩ সালের ৭ জুন মূল প্লটটি অবিভক্ত ও অবিভাজ্য রেখে এক একর জমির মধ্য থেকে ৩০ কাঠা ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টের’ নামে দানপত্রের মাধ্যমে হস্তান্তর করা হয়।
এই দানপত্র সম্পাদন করেন বেক্সিমকো হোল্ডিংস লিমিটেডের ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক এমপি সালমান এফ রহমান।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, জমি হস্তান্তরের বৈধতা ও পূর্ববর্তী প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর প্রভাবশালী একটি ট্রাস্টের নামে জমি দানের মাধ্যমে বিষয়টিকে আইনি ও প্রশাসনিকভাবে সুরক্ষিত করার চেষ্টা করা হয়ে থাকতে পারে। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই প্রয়োজন।
সরকারি রাজস্ব ক্ষতির অভিযোগ
সরকারি জমি লিজ ও হস্তান্তরের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় পর বকেয়া পরিশোধ, দলিল কার্যকর এবং নামজারির সময় হালনাগাদ সরকারি মূল্য ও প্রযোজ্য ফি বিবেচনার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
অভিযোগ রয়েছে, ৪০৩ ও ৪০৪ নম্বর প্লটের ক্ষেত্রে পাকিস্তান আমলের পুরোনো রেট অনুসরণ করে বকেয়া কিস্তি নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এতে বর্তমান মূল্যের তুলনায় সরকার বিপুল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
আরও অভিযোগ রয়েছে, লিজ চুক্তির শর্ত অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শিল্পকারখানা স্থাপন না হওয়ায় ইজারা বাতিল ও জমি পুনর্দখলের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে শেষ পর্যন্ত জমি দুটি হস্তান্তরের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনিক সহযোগিতা ছিল কি না, প্রশ্ন
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, বিপুল মূল্যমানের এই জমি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে একটি প্রভাবশালী চক্র কৌশল অবলম্বন করেছে।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে আব্দুল্লাহ সোলেনখীর ওয়ারিশ সূত্রে মেসার্স রহমান মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজের পক্ষে মো. জাকাউল্লাহ আব্দুল্লাহ নামজারি ফি বাবদ ৪০ হাজার টাকা জমা দেন। পরবর্তী সময়ে মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসচিব মো. শাহীনুর ইসলামের স্বাক্ষরিত চিঠির মাধ্যমে দুই একর জমি হস্তান্তরের অনুমোদন দেওয়া হয়।
নথিতে থাকা এই ধারাবাহিকতা প্রশ্ন তুলেছে—৬৬ বছর ধরে বকেয়া থাকা একটি পুরোনো শিল্প লিজ কীভাবে পুনরুজ্জীবিত হলো, বর্তমান মূল্যায়ন ছাড়াই কীভাবে বকেয়া নিষ্পত্তি হলো এবং এরপর এত দ্রুত দুই প্লটের হস্তান্তর অনুমোদন পেল?
বিশেষজ্ঞের তদন্তের দাবি
সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, তেজগাঁওয়ের প্লট নিয়ে অভিযোগগুলোর পেছনে রাজনৈতিক ক্ষমতার ব্যবহার হয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করার পাশাপাশি প্রশাসনিক পর্যায়ে যারা সহযোগিতা করেছেন, তাঁদেরও চিহ্নিত করে আইন ও চাকরিবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি হয়ে থাকলে তা নিরূপণ করে আদায়ের ব্যবস্থাও নেওয়া প্রয়োজন।
বেক্সিমকোর বক্তব্য মেলেনি
৪০৩ নম্বর প্লটের বিষয়ে বক্তব্য জানতে তেজগাঁওয়ে বেক্সিমকো হোল্ডিংস লিমিটেডের সংশ্লিষ্ট অফিসে দুদিন গিয়ে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বেক্সিমকো গ্রুপের শাহজাহান মিয়া নামের এক কর্মকর্তা বলেন, তিনি ২০২৫ সালের আগস্টে সর্বশেষ বেতন পেয়েছেন এবং দীর্ঘদিন ধরে বেতন না পাওয়ার কারণে এখন শুধু অফিসে আসা-যাওয়া করছেন। প্লটের বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার মতো কেউ অফিসে নেই বলেও তিনি জানান।
মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর আশ্বাস
তেজগাঁও শিল্প এলাকার ৪০৩ ও ৪০৪ নম্বর প্লটের বিষয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর বলেন, পূর্ব পাকিস্তান আমলে দুই একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। ওই জমির বকেয়া কিস্তি পরিশোধের ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হবে এবং অনিয়ম পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ফলে এখন মূল প্রশ্ন—৬৬ বছর পর পাকিস্তান আমলের শর্তে ৭০ লাখ ৯৫ হাজার টাকা পরিশোধের বৈধতা কী, দুই একর জমির বর্তমান মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল কি না, লিজের শিল্প-শর্ত কেন কার্যকর হয়নি এবং হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় সরকারি রাজস্বের কোনো ক্ষতি হয়েছে কি না।
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর মিলবে তদন্তে। আর তদন্ত নিরপেক্ষ হলে তেজগাঁওয়ের বহুল আলোচিত ৪০৩ ও ৪০৪ নম্বর প্লটের ৬৬ বছরের পুরোনো লিজ থেকে ৬০০ কোটি টাকা মূল্যের জমি হস্তান্তরের পুরো নেপথ্য চিত্রও স্পষ্ট হতে পারে।
এখন গণপূর্ত ও গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সঠিকভাবে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারেন। এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।
