মঙ্গলবার, ২২শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৭ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ফায়ার সার্ভিসে শামস আরমান-হেলালকে ঘিরে ক্রয়, সরবরাহে দুর্নীতি ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬ ৮:৫৬ অপরাহ্ণ
Link Copied!

দরপত্রের আগেই কাজ নির্ধারণের অভিযোগ, জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জামের মান নিয়েও প্রশ্ন।  ক্রয়-গুদাম ব্যবস্থাপনায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ। ফাইল ছবি

মানুষের জীবন বাঁচাতে আগুনের লেলিহান শিখা, ধোঁয়া ও বিষাক্ত গ্যাসের মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা। তাঁদের নিরাপত্তার জন্য কেনা বুট, গ্লাভস, মাস্ক, পোশাকসহ বিভিন্ন সুরক্ষা সরঞ্জামের মান ও ক্রয়প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা শুধু সরকারি অর্থ ব্যয়ের অনিয়মের অভিযোগে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে পড়ে উদ্ধারকর্মীদের জীবন ও নিরাপত্তা।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের ক্রয় ও স্টোর শাখাকে ঘিরে ওঠা একাধিক অভিযোগে এখন এমনই গুরুতর চিত্র সামনে এসেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (ক্রয় ও স্টোর) মো. হেলাল উদ্দিন খান এবং সিনিয়র স্টাফ অফিসার শামস আরমান।

অভিযোগ রয়েছে, দরপত্র, ক্রয়, সরবরাহ, পণ্য গ্রহণ, গুদাম ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁদের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। নির্দিষ্ট সরবরাহকারীকে সুবিধা দেওয়া, দরপত্র আহ্বানের আগেই কাজ নির্ধারণ, কমিশনের বিনিময়ে সরবরাহকারী নির্বাচনের সুযোগ তৈরি এবং নিম্নমানের সামগ্রী গ্রহণের মতো অভিযোগও রয়েছে তাঁদের ঘিরে।

দরপত্রের আগেই কাজ নির্ধারণের অভিযোগ

ক্রয় ও স্টোর শাখাকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুতর বিষয় হলো—দরপত্র আহ্বানের আগেই নির্দিষ্ট সরবরাহকারীকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার সমঝোতা।

অভিযোগকারীদের দাবি, পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিতে দরপত্রের শর্ত প্রণয়ন, মূল্যায়ন এবং পণ্য গ্রহণের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করা হয়। ফলে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

বিভিন্ন ক্রয়ে কমিশনের বিনিময়ে সরবরাহকারী নির্বাচন এবং পণ্য গ্রহণের প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগের সূত্রে বলা হয়েছে, ক্রয় ও স্টোর-সংক্রান্ত কাজে ৩ থেকে ৫ শতাংশ এবং ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম, পোশাক ও বুট কেনায় ২ থেকে ৩ শতাংশ কমিশন নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট ক্রয়ের দরপত্র নথি, মূল্যায়ন প্রতিবেদন, কার্যাদেশ, বিল-ভাউচার ও পণ্য গ্রহণের কাগজপত্র পর্যালোচনা করলেই প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।

জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জামের মান নিয়ে প্রশ্ন

ফায়ার ফাইটারদের জন্য কেনা তাপ-প্রতিরোধী বুট, সুরক্ষা গ্লাভস, মাস্ক, পোশাক, চোখের সুরক্ষা সামগ্রীসহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামের মান নিয়েও অভিযোগ উঠেছে।

আগুনের তীব্র তাপ, ধোঁয়া ও বিষাক্ত গ্যাসের মধ্যে এসব সরঞ্জাম ব্যবহার করেন উদ্ধারকর্মীরা। ফলে নির্ধারিত মান বা স্পেসিফিকেশনের বাইরে কোনো সরঞ্জাম সরবরাহ ও গ্রহণ করা হলে তা সরকারি অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি কর্মরত সদস্যদের নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

অভিযোগ অনুযায়ী, নির্ধারিত স্পেসিফিকেশনের সঙ্গে সামঞ্জস্য না থাকা কিছু পণ্যও গ্রহণ করা হয়েছে। এ অভিযোগের প্রকৃত চিত্র জানতে পণ্যের নমুনা অনুমোদন, মান পরীক্ষা, পরিদর্শন কমিটির প্রতিবেদন এবং সরবরাহকৃত পণ্যের স্পেসিফিকেশন মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

গুদাম ব্যবস্থাপনাতেও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ

ক্রয় করা সরঞ্জাম গুদামে সংরক্ষণ, স্টক রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্তি এবং মাঠপর্যায়ে সরবরাহের প্রক্রিয়াও অভিযোগের আওতায় এসেছে।

অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্বপ্রাপ্ত স্টোরকিপার বাহাউদ্দিনকে যথাযথভাবে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার বিষয়টির বাইরে গুদাম পরিচালনার বিভিন্ন পর্যায়েও প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।

সরকারি মালামালের হিসাব, সংরক্ষণ ও বিতরণ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা যাচাই করতে স্টক রেজিস্টার, ইস্যু রেজিস্টার, দায়িত্ব হস্তান্তরের নথি এবং গুদাম থেকে বিভিন্ন ইউনিটে সরঞ্জাম সরবরাহের রেকর্ড পরীক্ষা করা জরুরি।

মাসিক অর্থ ও উপহার দেওয়ার অভিযোগ

ক্রয় ও গুদাম শাখা থেকে শামস আরমানকে প্রতি মাসে ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এর পাশাপাশি নিয়মিত উপহার ও বাজারসামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগের আরও একটি অংশে বলা হয়েছে, সদরঘাটের বাসায় ব্যাগভর্তি বাজার পৌঁছে দেওয়া হতো। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে আর্থিক লেনদেনের নথি, সরবরাহকারীদের হিসাব, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য পর্যালোচনা প্রয়োজন।

পদায়ন ও দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন

শামস আরমানের পদায়ন ও দায়িত্ব পালন নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। তাঁকে ময়মনসিংহে উপসহকারী পরিচালক হিসেবে বদলি করা হলেও ঢাকায় অধিদপ্তরের স্টাফ অফিসারের দায়িত্ব পালন করার অভিযোগ উঠেছে।

বদলি আদেশের পর তাঁর প্রকৃত কর্মস্থল, দায়িত্ব বণ্টন এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক আদেশগুলো পর্যালোচনা করলে বিষয়টির বাস্তব চিত্র পরিষ্কার হতে পারে।

হেলালকে ঘিরে পুরোনো অভিযোগও

মো. হেলাল উদ্দিন খানকে ঘিরে বদলি, নিয়োগ, প্রশাসন, ক্রয় ও স্টোর ব্যবস্থাপনা নিয়ে আগেও অভিযোগ ওঠার কথা জানা গেছে। ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে তাঁর পদায়ন এবং পরবর্তী দায়িত্ব পরিবর্তন নিয়েও বিভিন্ন অভিযোগ সামনে এসেছে।

বরিশালে দায়িত্ব পালনকালে পরিদর্শকদের কাছ থেকে লাইসেন্সপ্রতি মাসে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। পরে সদর দপ্তরে ফিরে এসে ক্রয় ও গুদাম শাখায় দায়িত্ব পাওয়ার প্রক্রিয়াতেও প্রভাবশালী মহলের সুপারিশ ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে।

তবে এসব পুরোনো অভিযোগের ক্ষেত্রেও স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট সময়ের পদায়ন আদেশ, দায়িত্ব বণ্টন, লাইসেন্সসংক্রান্ত নথি ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরূপণ করা সম্ভব।

অভিযোগের কেন্দ্রে পুরো ক্রয়-গুদাম ব্যবস্থা

হেলাল উদ্দিন খান ও শামস আরমানকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো একটি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়। দরপত্র নির্বাচন থেকে সরবরাহ, পণ্য গ্রহণ, গুদামে সংরক্ষণ এবং মাঠপর্যায়ে বিতরণ—ক্রয় ও সরবরাহ ব্যবস্থার একাধিক ধাপ নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।

এ কারণে শুধু কোনো একটি ক্রয় বা নির্দিষ্ট কর্মকর্তার ভূমিকা খতিয়ে দেখার পরিবর্তে পুরো ক্রয় ও সরবরাহ ব্যবস্থার নথিভিত্তিক পর্যালোচনার দাবি উঠেছে।

বিশেষ করে গত কয়েক বছরের দরপত্র, কার্যাদেশ, সরবরাহকারী নির্বাচন, মূল্যায়ন কমিটির প্রতিবেদন, পণ্য গ্রহণের সনদ, মান পরীক্ষার নথি, স্টক রেজিস্টার এবং মাঠপর্যায়ে সরঞ্জাম বিতরণের হিসাব পর্যালোচনা করা হলে অভিযোগগুলোর বাস্তব ভিত্তি যাচাই করা সম্ভব হবে।

নিরাপত্তার সরঞ্জামে অনিয়ম হলে ঝুঁকি সরাসরি জীবনেই

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মতো জরুরি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে ক্রয়সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগের গুরুত্ব অন্য অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠানের তুলনায় আলাদা। কারণ এখানে কেনা বুট, পোশাক, গ্লাভস, মাস্কসহ বহু সরঞ্জাম সরাসরি আগুন, বিস্ফোরণ, ধোঁয়া ও দুর্ঘটনাস্থলে কর্মরত সদস্যদের জীবন রক্ষায় ব্যবহৃত হয়।

তাই এসব সরঞ্জামের মান, স্পেসিফিকেশন, সরবরাহ ও গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সামান্য অনিয়মের অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

হেলাল উদ্দিন খান ও শামস আরমানকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ ও নথিভিত্তিক তদন্ত হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।