জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় ক্ষোভ-অসন্তোষ, বিপাকে মোটরসাইকেল ও গণপরিবহন চালকরা। রাজধানীর রমনা পেট্রোল পাম্পে তেল নিচ্ছেন মোচরসাইকেল চালক।ফাইল ছবি
জ্বালানি তেলের দাম একলাফে বাড়ায় এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। বাড়তি খরচ সামলাতে অনেকেই আগের তুলনায় কম পরিমাণে তেল কিনছেন। বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালকদের মধ্যে দেখা গেছে হিসাব করে চলার প্রবণতা। একই সঙ্গে রাজধানীর বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প ও ফিলিং স্টেশনে কমেছে যানবাহনের ভিড়। এ নিয়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে ক্ষোভ ও অসন্তোষ।
রাজধানীর মৎস্য ভবন সংলগ্ন রমনা পেট্রোল পাম্পে তেল নিতে এসেছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী জাফর আহমেদ। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব জানতে চাইলে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘কী আর বলবো! আগে দিনে ৫ লিটার অকটেন নিতাম। দাম বাড়ানোর পর গত দু’দিন ধরে তার থেকে কম পরিমাণ কিনতে হচ্ছে। বাজেট ঠিক রাখতে পরিমাণে কম কিনে হিসেব করে চলতে হচ্ছে।’
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির এমন প্রভাব পড়েছে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সাধারণ মানুষের জীবনে। এমনিতেই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কষাঘাতে জর্জরিত সাধারণ মানুষকে অনেকটাই হিসাব করে জীবন চালাতে হচ্ছিল। এবার তেলের দাম বাড়ায় সেই হিসাব আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
মঙ্গলবার বিকেলে রমনা পেট্রোল পাম্পসহ রাজধানীর বিভিন্ন পাম্প ঘুরে দেখা গেছে, দাম বাড়ানোর পর গত দু’দিনে বেশিরভাগ পেট্রোল পাম্প ও ফিলিং স্টেশনে প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল এবং তেলচালিত অন্যান্য যানবাহনের ভিড় কমেছে। বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালকদের উপস্থিতি স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক কম। তবে কয়েকটি পাম্পে স্বাভাবিক সময়ের মতোই ভিড় দেখা গেছে।
মগবাজারের ‘যমুনা মইন মোটর’ নামের তেলের পাম্পের কর্মচারী নূর আলম বলেন, শুধু যানবাহন ও চালকদের ভিড়ই কমেনি, তেলের বেচাকেনাও অনেক কমে গেছে। যারা আসছেন, তারাও আগের তুলনায় কম পরিমাণে তেল নিচ্ছেন। বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালকরা হিসাব করে তেল নিচ্ছেন।
নূর আলম জানান, প্রাইভেটকার, জিপ ও মাইক্রোবাস চালকরা সংখ্যায় কম আসলেও তারা আগের মতো প্রায় একই পরিমাণ তেল নিচ্ছেন।
পাম্প কর্মচারীদের এমন বক্তব্যের সায় মিলেছে রাইড শেয়ারিং করা মোটরসাইকেল চালক আরিফ হোসেনের কথাতেও। তিনি বলেন, ‘আগে ২০০ টাকার তেল নিতাম। এখনও সেই পরিমাণ টাকার তেল নিলে লিটারের হিসেবে কম পাব। এই কারণে টাকার পরিমাণ বাড়িয়ে ৩০০ টাকার নিতে হচ্ছে। কিন্তু যাত্রীরা তো আর বেশি ভাড়া দিতে রাজি হবেন না বা হচ্ছেনও না। ফলে হিসাব মিলাতে গিয়ে হিমসিম খাচ্ছি।’
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রাইভেটকার চালক আলমাস আলী বলেন, প্রতিষ্ঠানের নির্দেশনা ও আইন মেনেই তাকে তেল নিতে হয়। তিনি চাকরি করেন, তেলের হিসাব মেলানোর দায়িত্ব তার নয়।

তবে রমনা পেট্রোল পাম্পের স্বত্বাধিকারী নাজমুল হক মনে করেন, পাম্পগুলোতে তেল নিতে আসা মানুষের ভিড় কমে যাওয়ার পেছনে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নাকি রাজধানীতে সাম্প্রতিক ককটেল বিস্ফোরণ ও সহিংসতা—কোনটি বেশি দায়ী, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, ‘তেলের দাম বাড়ানোর আগের দিন রোববার থেকেই রাস্তায় গাড়ি-ঘোড়া ও মানুষের ভিড় স্বাভাবিকের তুলনায় কম দেখা যাচ্ছিল। এর পরপরই সোমবার থেকে তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা এলো। গত দু’দিন ধরে পেট্রোল পাম্পে তেল নিতে আসা মানুষের ভিড় কমে গেছে। এখন দাম বাড়ানো নাকি সহিংসতা—ঠিক কোনো কারণে এই ভিড় কমলো, সেটা আমরাও বুঝতে পারছি না।’
নাজমুল হক বলেন, তবে এটুকু দেখা যাচ্ছে, মূল্যবৃদ্ধির কারণে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন মোটরসাইকেল চালকরা। তারা আগের বাজেট ঠিক রেখে পরিমাণে কম তেল নিয়ে হিসাব করে চলছেন।
একলাফে ২০ টাকা বাড়ায় ক্ষোভ
রোববার জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সোমবার থেকে জ্বালানি তেলের নতুন দাম কার্যকর হয়েছে। নতুন দামে ডিজেল প্রতি লিটার ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকা করা হয়েছে। এটি দেশের ইতিহাসে জ্বালানি তেলের সর্বোচ্চ দাম।
এর আগে ডিজেল ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ টাকা লিটারে বিক্রি হয়েছে।
সরকারের এ সিদ্ধান্তে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে ক্ষোভ-অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে স্বল্পআয়ের মানুষ পড়েছেন বাড়তি চাপের মুখে।
মিরপুর-সদরঘাট রুটে চলাচলকারী বিহঙ্গ পরিবহনের হেলপার আবুল কাশেম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বুঝলাম তেলের দাম বাড়াতে হবে! তাই বলে একলাফে ২০ টাকা। এখন তো ভাড়া বাড়াতে গেলেই যাত্রীরাও খেপে যাবে।
পাশে থাকা যাত্রী মনসুর আহমেদ বলেন, ‘মাত্র কয়েকদিন আগেও তেলের দাম বাড়ায় বাড়তি ভাড়া দিতে হচ্ছে। এখন আরেকবার বাড়ালে আমরা কই যাব!’
ধাপে ধাপে দাম বাড়ানোর পরামর্শ
রমনা পেট্রোল পাম্পের স্বত্বাধিকারী নাজমুল হক আরও বলেন, জ্বালানি তেলের দাম একলাফে ২০ টাকা বাড়ানো, বিশেষ করে ডিজেলের দাম একবারে এতটা বাড়ানো ঠিক হয়নি। কারণ সাধারণ মানুষের পরিবহন এবং কল-কারখানা চালানোর জন্য ডিজেল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে কল-কারখানা, রাস্তায় চলাচল করা গণপরিবহন এবং সাধারণ যানবাহনগুলো চাপে পড়বে।
তার মতে, একবারে এতটা না বাড়িয়ে ধাপে ধাপে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো উচিত ছিল।
জ্বালানি তেলের নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পর রাজধানীর পেট্রোল পাম্পগুলোতে যানবাহনের উপস্থিতি কমে যাওয়া এবং আগের তুলনায় কম পরিমাণে তেল কেনার প্রবণতা—দামবৃদ্ধির তাৎক্ষণিক প্রভাব হিসেবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বাড়তি চাপের চিত্রই তুলে ধরছে।
