মঙ্গলবার, ২৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৪ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

দুই কোটি টাকার নিচে নেব না’—ঘুষ দাবির ভিডিও ভাইরাল

লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি
সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬ ১০:৫৮ অপরাহ্ণ
Link Copied!

সাময়িক বরখাস্ত লক্ষ্মীপুর পিডিবির নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল আমিন, শুরু হচ্ছে আনুষ্ঠানিক তদন্ত। ফাইল ছবি

‘আমি দুই কোটি টাকা থেকে নড়ব না’—ঘুষ দাবির এমন কথোপকথনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর লক্ষ্মীপুরে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুল আমিনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আজ সোমবার পিডিবির তদন্ত ও শৃঙ্খলা পরিদপ্তর থেকে জারি করা এক দাপ্তরিক আদেশে তাকে সাময়িক বরখাস্তের বিষয়টি জানানো হয়।

দাপ্তরিক আদেশে বলা হয়েছে, লক্ষ্মীপুরের বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুল আমিনের বিরুদ্ধে আর্থিক লেনদেনসংক্রান্ত কথোপকথনের একটি ভিডিও গণমাধ্যমে প্রচারিত হওয়ায় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (কর্মচারী) চাকরি বিধিমালা, ১৯৮২-এর ১৪১(১) বিধির অধীনে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাকে বিউবোর চাকরি থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়।

এর আগে রোববার রাতে প্রায় ৮ মিনিট ৫০ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে বিভিন্ন প্রকল্পের মালামাল, ঠিকাদারি বিল, বিল আটকে রাখা, ‘ক্রস আর্ম’ এবং অর্থ লেনদেন নিয়ে কথোপকথন শোনা যায়।

ভিডিওতে একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি দুই কোটি টাকা থেকে নড়ব না। এরপর আরও বলা হয়, ‘ছয় কোটি টাকা তিনগুণ না, আমি দুই কোটি টাকার কমে নড়ব না। চেয়ারম্যানের কাছে যেতে হলে যাবো। দেখি চেয়ারম্যান কী কয়।

ভিডিওর আরেক অংশে কথিত প্রকৌশলীর কণ্ঠে শোনা যায়, ‘একটা বিলের জন্য যদি দুই কোটি টাকা নিই, তাহলে চেয়ারম্যান কি আমার বিরুদ্ধে যাবে? আমাকে জায়গামতো পোস্টিং দেবে।

এরপর একটি কাজের মালামালের হিসাব নিয়ে বলা হয়, ‘তিন লাখ টাকার ওয়ার্কে মালামাল লাগে ৩০ লাখ টাকা।’ পরে পাঁচ কোটি টাকার মালামাল আত্মসাতের প্রসঙ্গ তুলে বলা হয়, ‘পাঁচ কোটি টাকা থেকে আমাকে দুই কোটি টাকা দেন, আমি সব সই করে দেবো।

ভিডিওর অন্য একটি অংশে কয়েকজন ব্যক্তির কাছ থেকে নগদ টাকা গ্রহণের দৃশ্য দেখা যায়। তবে তাদের মুখ স্পষ্ট নয় এবং পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ওই অংশে টাকার অঙ্ক নিয়েও কথোপকথন শোনা যায়।

পিডিবি চেয়ারম্যানের নির্দেশে ব্যবস্থা

পিডিবি চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ভিডিওটির বিষয়ে জানার পরপরই সংশ্লিষ্ট বিভাগকে ওই কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। ইতোমধ্যে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, তদন্ত শেষ হওয়ার পর তার চাকরির বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পিডিবি চেয়ারম্যান আরও বলেন, প্রতিষ্ঠানের ভেতরে থাকা কোনো অসাধু ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পিডিবি পিছপা হবে না।

পুরোনো অভিযোগও সামনে

ভাইরাল ভিডিও এবং প্রকৌশলীকে সাময়িক বরখাস্তের খবরের পর লক্ষ্মীপুর পিডিবির সেবা নিয়ে ২০২৫ সালে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগও নতুন করে সামনে এসেছে।

২০২৫ সালের ৩ জুলাই লক্ষ্মীপুর প্রেস ক্লাবের সামনে পিডিবির সেবা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন একদল গ্রাহক। ওই সমাবেশ থেকে নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল আমিনকে অপসারণের দাবি জানানো হয়।

সমাবেশে বণিক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আব্দুল আজিজ, সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদসহ গ্রাহকেরা বক্তব্য দেন। বক্তারা অভিযোগ করেন, পিডিবির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঘুষ ও অনিয়মের কারণে সাধারণ গ্রাহকেরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

তাদের দাবি, ২০২৫ সালের ২২ জুন হঠাৎ করে দুই শতাধিক প্রিপেইড মিটার লক হয়ে যায়। ঘুষ না দেওয়ার কারণে এসব মিটার লক করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।

সমাবেশে দেওয়া লিখিত অভিযোগে মোট ১৬টি অনিয়মের অভিযোগ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে সরকারি মিটার ও ট্রান্সফরমার ব্যবহারের নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, এলটি সংযোগের ভয় দেখিয়ে টাকা নেওয়া, সরকারি মালামাল বিক্রি, একই ঠিকাদারকে বারবার কাজ দেওয়া, মিটার পরিবর্তন ও সংযোগের ক্ষেত্রে ঘুষ দাবি এবং সরকারি ফ্রি সেবার নামেও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ ছিল।

গ্রাহক তছলিম মিয়া বলেন, ব্যাটারির সমস্যায় তার মিটার বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর কয়েক দিন অফিসে ঘোরাঘুরি করেন। পরে তাকে সুমন মজুমদার নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়। তার দাবি, ওই ব্যক্তির মাধ্যমে তিনটি মিটারের জন্য দুই হাজার টাকা করে মোট ছয় হাজার টাকা দিতে হয়েছে।

আরেক গ্রাহক আমির হোসেন অভিযোগ করেন, মিটারের ব্যাটারিসংক্রান্ত সমস্যার জন্য রিমন নামে এক ব্যক্তির মাধ্যমে তাকে এক হাজার ৫০০ টাকা দিতে হয়েছে।

তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

স্থানীয় ঠিকাদার লোকমান হোসেন বলেন, তিনি প্রায় ৪০ বছর ধরে ঠিকাদারি করছেন। তার অভিযোগ, নির্বাহী প্রকৌশলীর পছন্দের লোক না হওয়ায় বর্তমানে তাকে বাদ দিয়ে সবুজ নামের একজন ঠিকাদারের মাধ্যমে কাজ করানো হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন ধরে ঠিকাদারি করছি। কিন্তু বর্তমানে আমাকে বাদ দিয়ে অন্যদের মাধ্যমে কাজ করানো হচ্ছে।

ভিডিও ঘিরে এখন তদন্তের অপেক্ষা

এদিকে ভাইরাল ভিডিওটির সত্যতা, কণ্ঠস্বরের পরিচয়, ভিডিও ধারণের সময় ও স্থান এবং কথোপকথনে উল্লেখ করা অর্থের সঙ্গে বাস্তব কোনো লেনদেনের সম্পর্ক রয়েছে কি না—এসব বিষয় এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

পিডিবির আনুষ্ঠানিক তদন্তে ভিডিওটির উৎস, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয়, কথোপকথনের প্রেক্ষাপট এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হবে। তদন্ত শেষে এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

এখন প্রশ্ন—ভাইরাল ভিডিওতে শোনা ‘দুই কোটি টাকা’-র কথোপকথনের পেছনে বাস্তবে কোনো আর্থিক লেনদেন ছিল কি না, নাকি কথোপকথনের ভিন্ন কোনো প্রেক্ষাপট রয়েছে? পিডিবির তদন্তেই মিলতে পারে সেই প্রশ্নের উত্তর।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।