সোমবার, ৫ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২০শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ভোলা পৌরসভায় মশক নিধনে ৪১ লাখ টাকা ব্যয়ের হিসাব, মাঠে নেই কার্যক্রম

আশিকুর রহমান শান্ত ভোলা জেলা প্রতিনিধি
অক্টোবর ৪, ২০২৬ ৫:৫৯ অপরাহ্ণ
Link Copied!

৪৫ লাখ টাকার বাজেটের মধ্যে ব্যয় দেখানো ৪১ লাখ ২২ হাজার ৯০০ টাকা, ড্রেনজুড়ে এডিসের লার্ভা। ফাইল ছবি

ভোলা পৌরসভায় মশক নিধন কার্যক্রমে প্রায় ৪৫ লাখ টাকা বাজেটের বিপরীতে ৪১ লাখ ২২ হাজার ৯০০ টাকা ব্যয় দেখানো হলেও বাস্তবে এর তেমন কোনো দৃশ্যমান কার্যক্রম নেই—এমন অভিযোগ উঠেছে পৌর কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। মশার উপদ্রব ও ডেঙ্গুর আতঙ্ক বাড়লেও পৌর এলাকার বিভিন্ন ড্রেন, সড়কের পাশ ও জলাবদ্ধ স্থানে এডিস মশার লার্ভা দেখা যাচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

পৌরবাসীর প্রশ্ন—মশক নিধনে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় দেখানো হলেও সেই অর্থের কার্যকারিতা কোথায়?

সারাদেশের মতো ভোলা পৌরসভাতেও দিন দিন বাড়ছে মশার উপদ্রব। মশার কামড়ে জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকে। অথচ মশা নিয়ন্ত্রণে পৌরসভার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, ড্রেন ও আশপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা এবং জনসচেতনতা সৃষ্টি করা। কিন্তু এসব কার্যক্রমের কোনোটি দৃশ্যমানভাবে হচ্ছে না বলে অভিযোগ পৌরবাসীর।

স্থানীয়দের দাবি, প্রায় ৬-৭ মাস আগে ফগার মেশিন দিয়ে ধোঁয়া ও ওষুধ ছিটানো হয়েছিল এক-দুবার। এরপর থেকে আর কোনো কার্যক্রম চোখে পড়েনি।

সম্প্রতি সরেজমিনে পৌর এলাকার বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখা যায়, আবহাওয়া অফিস রোড, পৌর ভূমি অফিস রোড, ভদ্রপাড়া, গাজীপুর রোড, উকিল পাড়া, কালিবাড়ী রোড, নবী মসজিদ রোড, নূর মসজিদ রোড, মুসলমান পাড়া, রিজার্ভ পুকুরপাড়সহ বিভিন্ন এলাকার ড্রেনে দীর্ঘদিনের ময়লা-আবর্জনা ও জমে থাকা পানির মধ্যে মশার লার্ভা রয়েছে।

পৌর এলাকার এমন চিত্র দেখে স্থানীয়দের কেউ কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, মশা নিধনের পরিবর্তে যেন মশার ‘চাষাবাদ’ চলছে। রাস্তার পাশে দীর্ঘদিনের বর্জ্য পড়ে থাকা, ড্রেনে ময়লা জমে থাকা এবং বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টির পানি জমে থাকায় মশার প্রজননের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মশক নিধন কার্যক্রমে ৪৫ লাখ টাকা বাজেট করা হয়। এর মধ্যে ৪১ লাখ ২২ হাজার ৯০০ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও মশক নিধনের জন্য ১৮ লাখ টাকা বাজেট রাখা হয়েছে। তবে ২০২৫-২৬ ও চলতি অর্থবছরের মশক নিধন কার্যক্রমের তেমন কোনো দৃশ্যমান কার্যক্রম দেখা যায়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

স্থানীয় বাসিন্দা মাহমুদুল হাসান ও গাজীপুর রোডের সাইয়েদ আলী জানান, বাড়িতে মশার উৎপাত এতটাই বেড়েছে যে স্বাভাবিকভাবে বসবাস করা কঠিন হয়ে পড়েছে। মশার কয়েল জ্বালিয়েও রেহাই মিলছে না। মশারি টানানোর পরও মশা ভেতরে ঢুকে ছোট শিশুদের কামড় দিচ্ছে। এতে শিশুদের হাত-পা ফুলে যাচ্ছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সভাপতি মোবাশ্বের উল্লাহ চৌধুরী বলেন, প্রায় ছয়-সাত মাস আগে উকিল পাড়ায় একবার পৌরসভা থেকে মশার ওষুধ ছিটানো হয়েছিল। এরপর আর কোনো কার্যক্রম দেখা যায়নি। ঘরে বসে বই পড়া কিংবা খাওয়া-দাওয়ার সময়ও মশার কামড় থেকে রেহাই পাওয়া যায় না।

তিনি বলেন, সারাদেশে ডেঙ্গুর ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে সাধারণ মানুষকে সতর্ক করা প্রয়োজন। এ দায়িত্ব পৌরসভার। কিন্তু ভোলায় ডেঙ্গু ও এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে পৌরসভার দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম নেই। ড্রেন ঠিকমতো পরিষ্কার করা হয় না, মশা নিধনের ওষুধও দেওয়া হয় না। তার অভিযোগ, কাগজে-কলমে কার্যক্রম দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়ে থাকতে পারে।

উকিল পাড়ার বাসিন্দা নোমান জানান, গত বছর শীতের পর একবার পৌরসভা থেকে তাদের এলাকায় ওষুধ ছিটানো হয়েছিল। এরপর আর কোনো ওষুধ দেওয়া হয়নি। বর্তমানে মশার উপদ্রব এতটাই বেড়েছে যে বসতঘরে থাকা কষ্টকর হয়ে পড়েছে। মশার কামড়ে অনেকেই জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন। কারও কারও ডেঙ্গু জ্বরও হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

আবহাওয়া অফিস সড়কের বাসিন্দা আরিফ হোসেন বলেন, সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত মশা তুলনামূলক কম থাকলেও সন্ধ্যার পর পুরো এলাকা মশার নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। বর্তমানে পৌরসভা থেকে সরকারি অফিসগুলোতে ধোঁয়া ও ওষুধ ছিটানো হলেও সাধারণ মানুষের বাড়িঘরে তেমন কোনো কার্যক্রম দেখা যায় না। মশা এখন সাধারণ মানুষের জন্য বড় ধরনের দুর্ভোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিল্লাহ মসজিদ সড়কের অ্যাডভোকেট শাহাদাত শাহীন বলেন, প্রতিবছরই মশক নিধনের জন্য ভোলা পৌরসভার বাজেট থাকে। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৪৫ লাখ টাকা বাজেট করা হলেও কার্যক্রম তেমন চোখে পড়েনি। মশার জন্য ধোঁয়া ও ওষুধ ছিটানো, ড্রেন পরিষ্কার, সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ কিংবা মাইকিং—কোনোটিই নিয়মিত দেখা যায়নি।

তিনি বলেন, প্রায় সাত-আট মাস আগে নামমাত্র ধোঁয়া ও ওষুধ ছিটানো হয়েছিল, যা কার্যত কোনো কাজে আসেনি। তাহলে গত অর্থবছরের এত টাকা কীভাবে ব্যয় করা হলো, তা পৌরবাসী জানতে চায়। বর্ষা-পরবর্তী সময়ে মশা নিয়ন্ত্রণে পৌরসভার ব্যাপক কার্যক্রম নেওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত তেমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি।

এদিকে মশক নিধন কার্যক্রমে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ভোলা পৌরসভার প্রশাসক ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. বেলাল হোসেন।

তিনি জানান, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে তিনি ভোলা পৌর প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে আগের অর্থবছরের অনেক বিষয় তার জানা নেই। তবে তার জানামতে, গত অর্থবছরে কেনা মশার ওষুধের কিছু এখনো মজুত রয়েছে।

অতি বৃষ্টির কারণে চলতি বছরে ড্রেন পরিষ্কার ও মশক নিধন অভিযান কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

তবে পৌরবাসীর প্রশ্ন, মশক নিধনে কোটি টাকার কাছাকাছি নয়, বরং ধারাবাহিকভাবে লাখ লাখ টাকা বরাদ্দ ও ব্যয়ের হিসাব থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন কোথায়? বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও যদি ড্রেনজুড়ে মশার লার্ভা, রাস্তায় বর্জ্য ও বসতবাড়িতে মশার উৎপাত অব্যাহত থাকে, তাহলে মশক নিধন কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক বলেই মনে করছেন স্থানীয়রা।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।