ফিরোজ আলম শাওন। ফাইল ছবি
মারামারি মামলার আসামি হয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় চলে গেছেন খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার ফিরোজ আলম শাওন। অথচ তাঁর পরিবর্তে অন্য এক ব্যক্তিকে আদালতে হাজির করে ‘শাওন সাজিয়ে’ জামিন নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রায় চার মাস পর বিষয়টি আদালতের নজরে আসে। এরপর জামিন জালিয়াতির অভিযোগে আসামি ফিরোজ আলম শাওন ও তাঁর আইনজীবী সরদার শাহজাহান আলীর বিরুদ্ধে মামলা করেছেন খুলনার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৪-এর বিচারক ফাতেমা জান্নাত।
এ ঘটনায় গত শনিবার রাতে শাওনের ভাই ফেরদৌস আলম সেতুকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রোববার তাঁকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। সেতুকে গ্রেপ্তারের পরই কথিত জামিন জালিয়াতির ঘটনাটি নতুন করে সামনে আসে। এর আগে গত ৬ আগস্ট এ ঘটনায় খুলনা সদর থানায় মামলা করা হয়।
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত
ভুক্তভোগী, পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, জমি-জমা নিয়ে বিরোধের জেরে ২০২৫ সালের ১৫ মার্চ রাতে দিঘলিয়া উপজেলার সেনহাটি বরইতলা ঘাট এলাকায় তরিকুল আমিনকে মারধরের অভিযোগ ওঠে প্রতিবেশী ফিরোজ আলম শাওন ও তাঁর স্বজনদের বিরুদ্ধে।
এ ঘটনায় তরিকুল আমিন বাদী হয়ে শাওনসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন। আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য দিঘলিয়া থানাকে নির্দেশ দেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দিঘলিয়া থানার এসআই জামিল হোসেন গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর শুধু ফিরোজ আলম শাওনকে অভিযুক্ত করে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। বর্তমানে খুলনার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-দিঘলিয়ায় মামলাটির সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে।
বিদেশে থেকেও আদালতে হাজির
তরিকুল আমিনের আইনজীবী আজমল হোসেন জানান, আদালত চার্জ গঠনের দিন ধার্য করলে তাঁরা জানতে পারেন, চলতি বছরের ১৬ মার্চ আসামি ফিরোজ আলম শাওন জামিন নিয়েছেন। তখন বাদী আদালতকে জানান, শাওন দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থান করছেন এবং এর মধ্যে তিনি দেশে ফেরেননি।
বিষয়টি আদালতের নজরে আনা হলে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৪-এর বিচারক ফাতেমা জান্নাত বিষয়টি খতিয়ে দেখেন। পরে তদন্তে কথিত জামিন জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়ার কথা উল্লেখ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে উদ্যোগ নেন তিনি।
আদালতের নথিতে যা বলা হয়েছে
গত ২২ জুলাই খুলনার মুখ্য মহানগর হাকিমের কাছে পাঠানো প্রতিবেদনে বিচারক ফাতেমা জান্নাত উল্লেখ করেন, তাঁর আদালতে সিআর ৬৩/২০২৫ (দিঘলিয়া) মামলার আসামি ফিরোজ আলম শাওন গত ১৬ মার্চ অ্যাডভোকেট শাহজাহান আলীর ওকালতনামা দিয়ে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করেন। অপরাধ জামিনযোগ্য হওয়ায় ১০০ টাকা বন্ডে তাঁর জামিন মঞ্জুর করা হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গত ২৩ এপ্রিল বাদী তরিকুল আমিন আবেদন করে জানান, আসামি বিদেশে অবস্থান করেও অন্য ব্যক্তিকে তাঁর পরিচয়ে আদালতে হাজির করে জামিন নিয়েছেন। পরে ২৭ এপ্রিল আসামির কৌঁসুলি সরদার শাহজাহান আলী ভিন্ন ব্যক্তিকে আসামি সাজিয়ে জামিন নেওয়ার বিষয় উল্লেখ করে ওকালতনামা প্রত্যাহারের আবেদন করেন।
ম্যাজিস্ট্রেটের প্রতিবেদনে বলা হয়, আসামি ফিরোজ আলম শাওন দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থানকালে ভুল ব্যক্তিকে প্রদর্শন করে জামিন নিয়েছেন বলে প্রতীয়মান হয়েছে। প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে জামিন নেওয়ার ঘটনায় ব্যক্তি, আইনজীবী কিংবা আদালতের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত থাকতে পারেন বলেও আদালতের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে।
এ ঘটনায় জড়িত আইনজীবী সরদার শাহজাহান আলী, আসামি ফিরোজ আলম শাওন এবং অন্য কোনো ব্যক্তি জড়িত থাকলে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করার অনুমতিও চান বিচারক।
আইনজীবী ও আসামির বিরুদ্ধে মামলা
গত ২ আগস্ট আদালত অভিযোগটি মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করতে খুলনা সদর থানার ওসিকে নির্দেশ দেন। পরে ৬ আগস্ট ফিরোজ আলম শাওনকে প্রধান আসামি এবং আইনজীবী শাহজাহান আলীকে দ্বিতীয় আসামি করে সদর থানায় মামলা রেকর্ড করা হয়।
ভাই গ্রেপ্তার, মূল আসামি বিদেশে
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা খুলনা সদর থানার এসআই মেহেদী হাসান খান জানান, মামলার মূল আসামি ফিরোজ আলম শাওন দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ কোরিয়ায় বসবাস করেন। গত বছর দেশে এসে মারামারির ঘটনায় জড়ান। মামলা হওয়ার পর তিনি আবার দক্ষিণ কোরিয়ায় চলে যান।
তিনি বলেন, মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তি করতে ভুয়া ব্যক্তিকে আদালতে হাজির করে জামিন নেওয়া হয়েছিল বলে তদন্তে পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় শাওনের ভাই ফেরদৌস আলম সেতুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
ঘটনাটি আদালতের প্রক্রিয়ায় পরিচয় যাচাই, জামিনের আবেদন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। তবে মামলায় উত্থাপিত অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত সত্যতা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।
