রবিবার, ১১ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৬শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

অটোরিকশা থেকে লাফিয়েও রক্ষা পেল না তাজমীন, ধর্ষণে বাধা দেওয়ায় শ্বাসরোধে হত্যা

কুমিল্লা জেলা প্রতিনিধি
অক্টোবর ১০, ২০২৬ ৩:২৫ অপরাহ্ণ
Link Copied!

চলন্ত অটোরিকশার গতিপথ বদলাতেই আতঙ্কিত হয়ে পালানোর চেষ্টা • ধানখেত থেকে ধরে নিয়ে ধর্ষণ, এরপর নৃশংস হত্যাকাণ্ড • চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার চালক সুমন। ফাইল ফটো

বাড়ি ফেরার পথে একটি অটোরিকশায় উঠেছিল সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমীন। গন্তব্য ছিল পরিচিত বাসা, অপেক্ষায় ছিলেন মা-বাবা। কিন্তু সেই যাত্রাই হয়ে উঠল তার জীবনের শেষ যাত্রা। অটোরিকশার চালক গন্তব্য পরিবর্তন করায় বিপদের আশঙ্কা করে চলন্ত গাড়ি থেকে লাফিয়ে পালানোর চেষ্টা করেছিল কিশোরীটি। ধানখেতের মধ্য দিয়ে দৌড়ে বাঁচতে চেয়েছিল সে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রক্ষা হয়নি। চালকের হাতে ধরা পড়ে ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর নির্মমভাবে প্রাণ হারাতে হয় তাকে।

কুমিল্লার চাঞ্চল্যকর স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমীন হত্যা মামলার রহস্য উদ্‌ঘাটন করেছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ধর্ষণে বাধা দেওয়ায় সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমন মিয়া (৩৫) গামছা দিয়ে গলায় পেঁচিয়ে এবং পরে পা দিয়ে চেপে ধরে শ্বাসরোধে তাজমীনকে হত্যা করেন। হত্যার পর তার ব্যবহৃত ভ্যানিটি ব্যাগ, আইফোন ও স্কুলব্যাগ নিয়ে পালিয়ে যান অভিযুক্ত চালক।

শনিবার (১০ অক্টোবর) সকালে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য নিশ্চিত করেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পঙ্কজ বড়ুয়া।

গন্তব্য বদলাতেই আতঙ্ক, চলন্ত অটোরিকশা থেকে লাফ

পুলিশের তদন্ত ও আসামির জবানবন্দির বরাতে জানা যায়, গত ৮ অক্টোবর রাত সাড়ে ১২টার দিকে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকার ‘তিশা বাস কাউন্টার’-এর সামনে থেকে নিজ বাসা রেসকোর্স এলাকায় যাওয়ার জন্য অটোরিকশা ভাড়া করে তাজমীন। ৩০০ টাকা ভাড়ায় তাকে নিয়ে যাত্রা শুরু করেন চালক সুমন মিয়া। পথে তিনি তাজমীনকে ১০০ টাকার কলা ও রুটি কিনে দেন।

কিন্তু বাসার দিকে না গিয়ে অটোরিকশার গতিপথ পরিবর্তন করেন চালক। রেসকোর্সের দিকে না গিয়ে তিনি কিছুটা সামনে এগিয়ে গাড়িটি চাঁদপুরগামী সড়কে নিয়ে যান। হঠাৎ গন্তব্য পরিবর্তন হতে দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে তাজমীন। এ নিয়ে চালকের সঙ্গে তার বাগবিতণ্ডাও হয়।

একপর্যায়ে বিপদের আশঙ্কায় চলন্ত অটোরিকশা থেকে নেমে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে কিশোরীটি। কিন্তু নির্জন স্থানে ধানখেতের দিকে দৌড়ে গেলেও শেষ রক্ষা হয়নি। পেছন থেকে ধাওয়া করে সুমন তাকে ধরে ফেলেন।

ধর্ষণে বাধা, গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তাজমীনকে ধরার পর সুমন তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করেন। এ সময় তাজমীন ধস্তাধস্তি ও চিৎকার শুরু করলে তাকে থামাতে গামছা দিয়ে গলা পেঁচিয়ে ধরেন তিনি। একপর্যায়ে তাজমীন নিস্তেজ হয়ে পড়লে তাকে মাটিতে ফেলে পা দিয়ে চেপে ধরে শ্বাসরোধ করে মৃত্যু নিশ্চিত করেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

যে কিশোরীটি প্রাণ বাঁচাতে চলন্ত অটোরিকশা থেকে লাফ দিয়েছিল, যে অন্ধকার ও নির্জন পথ পেরিয়ে পালাতে চেয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয় ঘাতকের নিষ্ঠুরতায়।

হত্যার পর আইফোন নিয়ে আত্মগোপন

হত্যাকাণ্ডের পর তাজমীনের ভ্যানিটি ব্যাগ, আইফোন ও স্কুলব্যাগ নিয়ে যান সুমন। পরে ব্যাগটি পাশের ধানখেতে ফেলে দিয়ে অন্য একটি অটোরিকশায় করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন তিনি। এরপর পাশের কাচিকাটা মসজিদের পুকুরে হাত-মুখ ধুয়ে আইফোনটি সেখানে লুকিয়ে রাখেন। পরে চট্টগ্রামে গিয়ে আত্মগোপন করেন।

ধানখেতে মিলল স্কুলছাত্রীর মরদেহ

গত ৮ অক্টোবর সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার ভোরাজগৎপুর এলাকার একটি ধানখেতের আইলের পাশে তাজমীনের মরদেহ দেখতে পান স্থানীয়রা। পরে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে বিষয়টি জানান তারা। খবর পেয়ে লালমাই থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে এবং পরিচয় শনাক্তে আইনগত প্রক্রিয়া শুরু করে। পরে তাজমীনের বাবা এসে মরদেহটি তার মেয়ের বলে শনাক্ত করেন।

তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় গ্রেপ্তার

ঘটনার পর হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটনে তদন্ত শুরু করে ডিবি ও লালমাই থানা পুলিশ। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় যৌথ অভিযান চালিয়ে ৯ অক্টোবর চট্টগ্রাম থেকে সুমন মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাগমারা এলাকার একটি পুকুরপাড়ের জঙ্গল থেকে তাজমীনের আইফোন এবং হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অটোরিকশা উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ জানিয়েছে, সুমনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ শেষে তাকে আদালতে সোপর্দ করার প্রক্রিয়া চলছে।

স্বজনদের স্বপ্ন ভেঙে দিল নির্মম হত্যাকাণ্ড

জান্নাতুল তাজমীন রেনাটা পিএলসি, কুমিল্লায় কর্মরত আবদুল আলীম ও কেয়া আক্তার দম্পতির মেয়ে। তাদের গ্রামের বাড়ি যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা গ্রামে। বাবার চাকরির সুবাদে পরিবারের সঙ্গে কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকায় বসবাস করত সে। পড়াশোনা করত কুমিল্লার ফরিদা বিদ্যায়তনে সপ্তম শ্রেণিতে।

বয়স ছিল স্বপ্ন দেখার, পড়াশোনা করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার। কিন্তু বাড়ি ফেরার পথে নিরাপদে পৌঁছানোর সাধারণ প্রত্যাশাটুকুও পূরণ হলো না তাজমীনের। তার এমন মর্মান্তিক মৃত্যু পরিবারকে গভীর শোকের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

একটি অটোরিকশায় চেপে বাড়ি ফেরার যে যাত্রা স্বাভাবিক হওয়ার কথা ছিল, তা শেষ হয়েছে ধানখেতের পাশে নিথর দেহ হয়ে। এখন এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করাই স্বজনদের জন্য ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা।

উল্লেখ্য, প্রতিবেদনটি পুলিশের প্রেস বিজ্ঞপ্তি, তদন্তের তথ্য ও আসামির জবানবন্দির বরাতে প্রস্তুত। মামলার অভিযোগ ও জবানবন্দির তথ্য আদালতে বিচারিক প্রক্রিয়ায় যাচাইযোগ্য।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।