শনিবার, ১৭ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১লা কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

রিসোর্টে আগুন: ‘আমাদের আর কেউ রইল না, কী নিয়ে বেঁচে থাকব’

আমতলী উপজেলা প্রতিনিধি
অক্টোবর ১৭, ২০২৬ ৯:২৩ অপরাহ্ণ
Link Copied!

এক আগুনে নিভে গেল বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে, একমাত্র মেয়ে ও নাতির জীবন | স্ত্রী-সন্তান-শ্যালককে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন নূর আলম | একই পরিবারের ছয়জনের মৃত্যুর আশঙ্কা। ফারিহা কবির, নাফিস তেহামী ও ফাইজান নূর

আমাদের আর কেউ রইল না, কী নিয়ে বেঁচে থাকব আমরা’—কথাগুলো বলতে বলতে নির্বাক হয়ে যান মো. জিয়াদুল কবির ও তাঁর স্ত্রী কাজল রেখা। তাঁদের বুকের ধন একমাত্র ছেলে নাফিস তেহামী (২৬), একমাত্র মেয়ে ফারিহা কবির (৩২) এবং আদরের নাতি ফাইজান আহম্মেদ নূর (৫)—তিনজনই মারা গেছেন কক্সবাজারের পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকার টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে।

এক মুহূর্তের আগুন যেন তাঁদের জীবনের সব আলো কেড়ে নিয়েছে। যে ছেলে-মেয়ে ও নাতিকে ঘিরে ছিল তাঁদের বেঁচে থাকার স্বপ্ন, সেই তিনজনকে হারিয়ে এখন শূন্য ঘর আর অসহায় কান্না ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট নেই। বরগুনার আমতলী উপজেলার কুকুয়া ইউনিয়নের কালিপুরা গ্রামের বাসিন্দা জিয়াদুল কবির অবসরপ্রাপ্ত যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা।

মোবাইল ফোনে সমকালকে জিয়াদুল কবির বলেন, আমার এখন বাইচ্যা থাইক্যা লাভ কী? কী নিয়া আমি বাঁচমু? সবতো আমার শেষ হয়ে গ্যাছে।

স্ত্রী কাজল রেখার কণ্ঠেও একই হাহাকার। তিনি বলেন, ছেলে, মেয়ে, নাতি সব শ্যাষ অইয়া গ্যাছে, আমরা আর দুনিয়ায় বাইচ্যা থাইক্যা কী করমু। ও আল্লাহ আমাদেরও এখন নিয়া যাও।

স্ত্রী, সন্তান ও শ্যালককে হারিয়ে ভেঙে পড়েছেন নূর আলম

এদিকে ফারিহা কবিরের স্বামী নূর আলমও হারিয়েছেন স্ত্রী, সন্তান ও শ্যালককে। একসঙ্গে তিন স্বজনের মৃত্যুতে তাঁর কান্না থামছে না। প্রবোধ কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘স্ত্রী, ছেলে, শ্যালক গ্যাছে, আল্লাহ মোরে এহন বাঁচাইয়া রাখছ কেন? ওগো লগে আমারেও নিয়া গ্যালেও বাইচ্যা যাইতাম।

পরিবারের সূত্রে জানা গেছে, পূজার ছুটিতে নূর আলম চুয়াডাঙ্গা থেকে স্ত্রী ফারিহা কবির, ছেলে ফাইজান নূর, শ্যালক নাফিস তেহামী এবং দুই ভায়রার পরিবারের আরও ছয়জনসহ মোট ১০ জনকে নিয়ে গত বৃহস্পতিবার দুপুরে কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানী মেরিন ড্রাইভের পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকার টুপটুপ রিসোর্টে ওঠেন।

ছেলে নাফিস তেহামী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের চীনা ভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগের পঞ্চম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। এ বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করে স্নাতকোত্তরে অধ্যয়ন করছিলেন তিনি। গত বৃহস্পতিবার বোন ও ভগ্নিপতির সঙ্গে ঢাকা থেকে কক্সবাজার বেড়াতে যান নাফিস।

পরদিন শুক্রবার সকালে জরুরি কাজের জন্য নূর আলম চুয়াডাঙ্গায় ফিরে আসেন। স্ত্রী ফারিহা, ছেলে ফাইজান ও শ্যালক নাফিসকে রিসোর্টে রেখে আসেন তিনি। কিন্তু সেই ফিরে আসাই যেন তাঁর জীবনে নেমে আসে এক অসহনীয় শোকের অধ্যায়। শনিবার সকালে রিসোর্টে আগুনের ঘটনায় একে একে হারিয়ে যান তাঁর স্ত্রী, সন্তান ও শ্যালক।

একই পরিবারের আরও তিন তরুণীর মৃত্যু

অগ্নিকাণ্ডে জিয়াদুল কবিরের দুই ভায়রার মেয়েও প্রাণ হারিয়েছেন। তাঁরা হলেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩) এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী লায়লা জাহান নাবিলা (২৭)।

ছেলে, মেয়ে, নাতি ও দুই ভায়রার তিন মেয়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে শোকে ভেঙে পড়েন জিয়াদুল কবির। স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে শনিবার দুপুর ১২টার দিকে বাসযোগে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন তিনি। যে স্বজনদের সঙ্গে আনন্দের ছুটি কাটানোর কথা ছিল, তাঁদেরই মৃত্যুর খবর বুকে নিয়ে এখন পথে পথে ছুটছেন।

মালিহা ও নাবিলার মা রোকসানা আক্তার রীনার কান্নাও থামছে না। দুই মেয়েকে হারিয়ে তিনি বলেন, আমার জান নাবিলা ও মালিহা চলে গেছে, ও আল্লাহ আমাদেরও কেন মৃত্যু দাও না। আমাদেরও ওদের সাথে নিয়ে যাও।

পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষার কথা

অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের ছয়জন রয়েছেন কি না, তা ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে বলে জানিয়েছেন উখিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার।

তিনি সমকালকে বলেন, এখন পর্যন্ত দশ জনের মৃতদেহ পাওয়া গেছে। আমরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি, এর মধ্যে একই পরিবারের ছয়জন সদস্য হতে পারে। তবে ডিএনএ রিপোর্টের মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।’

একটি পারিবারিক ভ্রমণ, স্বজনদের সঙ্গে আনন্দে কাটানোর কয়েকটি দিন—সবকিছু মুহূর্তেই পরিণত হয়েছে শোক আর হাহাকারে। সন্তান, নাতি ও স্বজনদের হারিয়ে যে পরিবার আজ নিঃস্ব, তাদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে স্বজনদের হৃদয়ও।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।