ফায়ার সার্ভিসের অনুমতি ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছিল না। অগ্নিনিরাপত্তার সরঞ্জামও মেলেনি। নিহত ১০, আহত ৬। দুর্ঘটনায় পুড়ে যাওয়া টুপটুপ রিসোর্ট। ছবি: সংগৃহীত
কক্সবাজারের ইনানীর টুপটুপ রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্তোরাঁয় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত রান্নাঘরের চুল্লি থেকে হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করছে জেলা প্রশাসন। আগুন লাগার কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এদিকে ফায়ার সার্ভিসের অনুমতি ছাড়াই রিসোর্টটি নির্মাণ করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রও ছিল না প্রতিষ্ঠানটির। অগ্নিনিরাপত্তার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও ব্যবস্থা না থাকার বিষয়টিও সামনে এসেছে। শনিবার সকালে এ অগ্নিকাণ্ডে এখন পর্যন্ত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন ছয়জন।
রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাতের ধারণা
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, ইনানীর টুপটুপ রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্তোরাঁয় রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তদন্ত কমিটি আগুন লাগার কারণ, রিসোর্টের নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় খতিয়ে দেখবে।
ফায়ার সার্ভিসের অনুমতি ছাড়াই নির্মাণ
ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়াই রিসোর্টটি নির্মাণ করা হয়েছিল। কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন জানান, গত জুন মাসে এ বিষয়ে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, সমুদ্রের তীব্র বাতাসে কাঠের রিসোর্টে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এ ধরনের স্থাপনায় বহনযোগ্য অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, অগ্নিসংকেত, হোস পাইপ ও অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা থাকা দরকার। কিন্তু রিসোর্টটিতে এগুলোর কিছুই ছিল না। ফায়ার লাইসেন্সও ছিল না।
রিসোর্টটি মাত্র সাত-আট মাস আগে নির্মিত হয়েছিল বলে জানান তিনি। জায়গাটির মালিকানা নিয়েও দ্বন্দ্ব ছিল। রিসোর্টের নিচতলায় খাবার তৈরি করা হতো বলেও উল্লেখ করেন ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা।
পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রও ছিল না
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা জানান, ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্তোরাঁ নামে কোনো প্রতিষ্ঠানকে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্তোরাঁ নামের কোনো প্রতিষ্ঠানকে পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি। সম্ভবত এ নামের কোনো প্রতিষ্ঠান ছাড়পত্র নেওয়ার জন্য আবেদনও করেনি।
আগুনে পোড়া রিপোর্ট: ফাইল ছবি
অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০, আহত ৬
শনিবার সকালে রিসোর্টটিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার সমকালকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত দশ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় ছয় জন আহত হয়েছেন। হোটেলে মোট ১৮ জন পর্যটক ছিলেন। এখনো উদ্ধার কাজ চলমান রয়েছে।
নিহতদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) দুই শিক্ষার্থীসহ একই পরিবারের ছয়জন রয়েছেন। তাঁরা হলেন—ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী লায়লা জাহান নাবিলা (২৭), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাফিস তেহামী, ফারিহা কবির (৩৩) ও পাঁচ বছর বয়সী ফাইয়াজ আহম্মেদ।
অগ্নিকাণ্ডে আহত ছয়জন হলেন—মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন (৩১), তাঁর স্ত্রী নাফিসা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)।
ডিএনএ পরীক্ষায় নিশ্চিত হবে পারিবারিক পরিচয়
একই পরিবারের ছয়জনের মৃত্যুর বিষয়টি ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে বলে জানিয়েছেন উখিয়ার ইউএনও পান্না আক্তার।
তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত দশ জনের মৃতদেহ পাওয়া গেছে। আমরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি, এর মধ্যে একই পরিবারের ছয়জন সদস্য হতে পারে। তবে ডিএনএ রিপোর্টের মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।
অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি গঠনের পাশাপাশি রিসোর্টটির নির্মাণ, অনুমোদন ও অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তদন্তে এসব বিষয়ে কী তথ্য উঠে আসে, তা এখন দেখার বিষয়।
