রবিবার, ১৮ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২রা কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

লালনের দর্শন মানবতা, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার অনন্য দৃষ্টান্ত: সংস্কৃতিমন্ত্রী

এস এম বাদল
অক্টোবর ১৮, ২০২৬ ৩:৫২ অপরাহ্ণ
Link Copied!

ছেঁউড়িয়ায় ১৩৬তম তিরোধান দিবসের লালনমেলা উদ্বোধন, ‘লালন নগরী’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের কথা জানালেন নিতাই রায় চৌধুরী। ছবি: সমতল মাতৃভূমি

কুষ্টিয়া, ১৭ অক্টোবর ২০২৬: ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’—বাউলসম্রাট ফকির লালন শাহের এই চিরন্তন দর্শনকে ধারণ করে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় শুরু হয়েছে লালনমেলা ও আলোচনা অনুষ্ঠান। লালন শাহের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে লালন একাডেমি চত্বরে আয়োজিত এ মেলা চলবে আগামী ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত।

বাউলগানের সুর, সাধক-ভক্তদের মিলন এবং মানবতার বাণীতে মুখর হয়ে উঠেছে লালন আখড়াবাড়ি। উদ্বোধনী ও আলোচনা অনুষ্ঠানে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেছেন, লালনের দর্শন মানবতা, সাম্য, অসাম্প্রদায়িকতা ও সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁর গান ও সাধনা মানুষকে সব ধরনের বিভেদ ভুলে মানবিক বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার শিক্ষা দেয়।

শনিবার বিকেলে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার এবং সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও লালন একাডেমির সভাপতি তৌহিদ বিন-হাসান।

‘লালনের দর্শন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মানবতার শিক্ষা দেয়’

প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী লালন সাধক ও ভক্তদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান। তিনি বলেন, লালন সাধকেরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে লালন দর্শন ও সাধনাকে ধারণ করে আসছেন। লালনের দর্শন আমাদের মানবতা, সাম্য, অসাম্প্রদায়িকতা ও সম্প্রীতির শিক্ষা দেয়।

মন্ত্রী বলেন, বিগত শাসনামলে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চার পথ রুদ্ধ হওয়ায় সমাজে অন্ধকার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল। একই সঙ্গে আর্থিক প্রতিষ্ঠান, শিল্প-বাণিজ্য ও বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল ও ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। তরুণ সমাজ মাদকাসক্তিসহ নানা সামাজিক সংকটে নিমজ্জিত ছিল।

তিনি বলেন, বিগত দুই দশকের শাসনামলকে জনগণের কাছে একটি ‘অন্ধকার যুগ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গুম, খুন, নির্যাতন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত করা এবং বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাধা দেওয়ার মাধ্যমে মানুষের স্বাভাবিক অধিকার ও সাংস্কৃতিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছিল। এর বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান দেশের মানুষকে নতুন আশার পথ দেখিয়েছে।

নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার জনগণের বিপুল সমর্থন নিয়ে সেই অন্ধকার যুগের অবসান ঘটিয়ে একটি নতুন ও আলোকিত বাংলাদেশের সূচনা করতে চায়। এ নতুন বাংলাদেশ হবে জ্ঞান, শিক্ষা, সংস্কৃতি, মানবিকতা ও সৃজনশীলতার বাংলাদেশ—একটি নবজাগরণের বাংলাদেশ।

কুষ্টিয়ায় ‘লালন নগরী’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ

কুষ্টিয়ায় ‘লালন নগরী’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে সংস্কৃতিমন্ত্রী বলেন, লালনের স্মৃতি ও দর্শনকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলকে দেশ-বিদেশের মানুষের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তোলা হবে।

তিনি গড়াই-মধুমতী নদীতে নৌকাবাইচসহ দেশীয় খেলাধুলা, লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবাহী আয়োজনকে উৎসাহিত করতে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন।

বিশ্বমানবতার সম্পদ লালনের দর্শন

গেস্ট অব অনারের বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার এবং সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, লালন শাহ শুধু বাংলাদেশের নন; তাঁর দর্শন বিশ্বমানবতার সম্পদ। বর্তমান বিশ্বে বিভাজন, সংঘাত ও অসহিষ্ণুতার প্রেক্ষাপটে লালনের মানবতাবাদী দর্শন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

তিনি লালনগীতির সংরক্ষণ, স্বরলিপি প্রণয়ন ও বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। উপদেষ্টা বলেন, লালন শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নন; শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষের কাছে তাঁর দর্শন ও সৃষ্টি পৌঁছে দিতে হবে।

ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী যে মধ্যপন্থী, উদার ও মানবিক বাংলাদেশের কথা বলেন, তার প্রতিফলন লালন ও কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টিতে সুস্পষ্টভাবে পাওয়া যায়। এ দর্শনকে সামনে রেখে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় লালন ও নজরুলের সাহিত্য, সংগীত ও দর্শন দেশ-বিদেশে আরও ব্যাপকভাবে তুলে ধরতে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করছে।

আলোচনা, লালনগীতি ও সাধক-ভক্তদের মিলন

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন সংরক্ষিত মহিলা আসন-৩০৬-এর সংসদ সদস্য মোছা. ফরিদা ইয়াসমিন, কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মো. আমিনুল ইসলাম এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমি।

‘লালন শাহের তিরোধান ও তাঁর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার’ শীর্ষক আলোচনায় মুখ্য আলোচক ছিলেন বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ড. রশিদুন্নবী। তিনি লালন শাহের জীবন, দর্শন, সাধনা ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

উদ্বোধনী দিনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল বিকেল ৫টায় অনুষ্ঠিত লালনসংগীতের আসর। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত শিল্পীদের কণ্ঠে লালনের গান উপভোগ করেন দর্শনার্থীরা। একতারার সুর, বাউলগানের আবেশ আর সাধক-অনুরাগীদের উপস্থিতিতে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে লালন একাডেমি চত্বর।

দীর্ঘ ঐতিহ্য ও প্রাণের টানে যুগ যুগ ধরে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার লালন আখড়াবাড়িতে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে লালনমেলা। বাউলসম্রাটের ভক্ত-অনুসারী ছাড়াও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ এ মেলায় অংশ নেন। গান, সাধনা ও ভাবের আদান-প্রদানে এ আয়োজন হয়ে ওঠে মানুষের মিলনমেলা।

বিভেদের ঊর্ধ্বে মানুষ—লালনের চিরন্তন আহ্বান

লালনের দর্শনে মানুষের পরিচয়ই মুখ্য; ধর্মীয়, সামাজিক কিংবা অন্য কোনো বিভাজন নয়। তাঁর গানে দেহতত্ত্ব, আত্মঅন্বেষণ, প্রেম, সাম্য ও মানবমুক্তির যে গভীর বাণী উচ্চারিত হয়েছে, তা মানুষকে ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে উঠে মানবতার বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানায়।

তাই ছেঁউড়িয়ার লালনমেলা কেবল একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন নয়; এটি বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনা, লোকজ ঐতিহ্য ও মানবিক মূল্যবোধের অনন্য উদযাপন। লালনের গানের সুরে, সাধকদের ভাবনায় এবং মানুষের মিলনে বারবার উচ্চারিত হয় সেই চিরন্তন সত্য—মানুষের চেয়ে বড় পরিচয় আর কিছু নেই।

লালন শাহের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এ মেলা আগামী ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত লালন একাডেমি চত্বরে চলবে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।