রাজনৈতিক তদবির, হামলা ও হুমকির মুখেও অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান—সরকারি জমি উদ্ধারে জিরো টলারেন্সের বার্তা। ফাইল ছবি
রাজধানীতে সরকারি জমি দখলমুক্ত করতে প্রভাবশালী মহলের বাধা, রাজনৈতিক তদবির ও হামলার হুমকি উপেক্ষা করে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনায় সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মারুফা বেগম নেলী। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে তাঁর কঠোর অবস্থান ও আইন প্রয়োগের দৃঢ়তা নিয়ে প্রশাসনিক মহল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সরকারি জমি ও সড়ক দখল করে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে গিয়ে প্রশাসনকে প্রায়ই প্রভাবশালী ব্যক্তি ও দখলদার চক্রের বাধার মুখে পড়তে হয়। এসব প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও অভিযান অব্যাহত রেখেছেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মারুফা বেগম নেলী।
সম্প্রতি একটি উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, শতাধিক ব্যক্তি লোহার রড ও ইট-পাটকেল নিয়ে সরকারি অভিযানের দলকে ঘিরে ফেলেন। এ সময় ছোড়া ইটে সরকারি গাড়ির কাচ ভেঙে যায়। হামলা ও বাধার মুখেও অভিযান থেকে পিছিয়ে না গিয়ে ঘটনাস্থলে অবস্থান করেন ম্যাজিস্ট্রেট নেলী। হামলাকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ কার্যক্রম চালিয়ে যান তিনি। অভিযানে বুলডোজার দিয়ে অবৈধ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
তদবিরের ঊর্ধ্বে আইন, উচ্ছেদে কঠোর অবস্থান
দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সরকারি জমি দখলমুক্ত করার অভিযান এবং দখলদারদের পুনরায় স্থাপনা গড়ে তোলার প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মারুফা বেগম নেলীর অভিযানকে দখলদারদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগ রয়েছে, উচ্ছেদ অভিযান ঠেকাতে কখনো রাজনৈতিক পরিচয়, কখনো প্রভাবশালী মহলের সুপারিশ ও তদবির ব্যবহার করা হয়। তবে এসব চাপের মুখেও আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন এই কর্মকর্তা।
গুলশানের মতো অভিজাত এলাকায় অবৈধভাবে পরিচালিত কফি শপ এবং মিরপুরে চাঁদাবাজির অভিযোগ থাকা চক্রের নিয়ন্ত্রণাধীন অবৈধ বাজার উচ্ছেদের বিষয়েও তাঁর অভিযান আলোচনায় এসেছে। এসব ক্ষেত্রে স্থাপনার মালিকানা, দখলের বৈধতা ও সংশ্লিষ্ট অভিযোগের স্বতন্ত্র যাচাই গুরুত্বপূর্ণ।
ঢাকায় দায়িত্ব পালনের আগে চট্টগ্রামেও প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকাকালে অবৈধ ভূমি দখল, প্রভাবশালী মহল ও বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে তাঁর কঠোর অবস্থানের কথা আলোচনায় আসে।
সাহসী পদক্ষেপ, তবে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
আইন প্রয়োগে দৃঢ়তা ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দায়িত্ব পালনের বিষয়টি সাধারণ মানুষের প্রশংসা কুড়ালেও সৎ ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা এবং কর্মপরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। অতীতে বিভিন্ন কর্মকর্তার বদলি, প্রশাসনিক চাপ ও দায়িত্ব পালনে প্রতিবন্ধকতার অভিজ্ঞতা থেকে এ শঙ্কা আরও জোরালো হয়েছে।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, সারওয়ার আলম ও নওশাদ জামিলের মতো কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ড থেকে দেখা যায়, আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতাধর ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকেও জবাবদিহির আওতায় আনা সম্ভব। তবে এ ধরনের উদ্যোগ কার্যকর ও টেকসই করতে হলে ব্যক্তিগত সাহসিকতার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থনও প্রয়োজন।
সরকারি জমি উদ্ধারের অভিযান কেবল স্থাপনা ভাঙার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রেখে দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা, উদ্ধার করা জমির পুনর্দখল ঠেকানো এবং অভিযানের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
তাঁদের দাবি, দায়িত্ব পালনকালে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও অভিযান পরিচালনাকারী দলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবের বাইরে থেকে আইন প্রয়োগের পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে সরকারি সম্পদ রক্ষায় কর্মকর্তারা নির্ভয়ে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
প্রভাবশালী মহলের বাধা ও হামলার অভিযোগের মধ্যেও উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত রাখার ঘটনা সরকারি জমি দখলমুক্ত করার প্রশ্নে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে অভিযানে ওঠা হামলা, অবৈধ দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য নেওয়া জরুরি।
