মঙ্গলবার, ২০শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’র খোঁজে ঘরছাড়া মোমিন, বিসিএস ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন ছেড়ে লালনের আখড়ায় সাধুজীবন, আত্মার সন্ধানে ছেঁউড়িয়ায় আট বছর

কুমারখালী ( কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি
অক্টোবর ২০, ২০২৬ ১০:০৫ অপরাহ্ণ
Link Copied!

কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউরিয়ার আখবাড়িতে বসে আছেন মোমিন সাধু। ছবি: সংগৃহীত

ঢাকার সরকারি তিতুমীর কলেজে পদার্থবিজ্ঞানে পড়ার সময় স্বপ্ন ছিল বিসিএস ক্যাডার হওয়ার। দিনরাত বই নিয়ে পড়ে থাকতেন আব্দুল মোমিন (৩৫)। লক্ষ্য ছিল ভালো চাকরি, প্রতিষ্ঠিত জীবন। কিন্তু বাংলা সাহিত্যের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে ফকির লালন সাঁইয়ের একটি গান যেন বদলে দিল তাঁর জীবনের গতিপথ। খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়’—এই একটি পঙ্‌ক্তি তাঁকে তাড়িয়ে বেড়াতে লাগল। খাঁচা কী, অচিন পাখিই বা কে? কোথা থেকে আসে, কোথায় যায়?

গাইড বইয়ে খুঁজে পেলেন না প্রশ্নগুলোর উত্তর। অনলাইনে শুরু হলো অনুসন্ধান। একসময় বিসিএসের প্রস্তুতি থামিয়ে দিলেন। চাকরি, সংসার আর প্রতিষ্ঠিত জীবনের স্বপ্নের চেয়েও বড় হয়ে উঠল অচিন পাখির রহস্য। সেই রহস্যের সন্ধানে পাড়ি জমালেন কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায়, মরমি সাধক ফকির লালন সাঁইয়ের আখড়াবাড়িতে।

সাল ২০১৮। কুমিল্লার গ্রামের বাড়ি, পরিবার আর বিসিএস ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন পেছনে ফেলে এক কাপড়ে ছেঁউড়িয়ায় চলে আসেন মোমিন। এরপর থেকে বদলে যায় তাঁর পরিচয়। পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র আব্দুল মোমিন হয়ে ওঠেন ‘মোমিন সাধু’। কখনো লালনের আখড়াবাড়ি, কখনো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মাজার প্রাঙ্গণ—সত্যের সন্ধানে ঘুরে বেড়ান তিনি।

গত শনিবার বিকেলে ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে দেখা হয় মোমিন সাধুর সঙ্গে। মাথায় কালো কাপড় বাঁধা, শরীরেও জড়ানো কালো কাপড়ের আরও দুই টুকরো। নিজের পুরো পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক হলেও জীবনের এমন অদ্ভুত বাঁকবদলের গল্প বলতে দ্বিধা করেননি তিনি।

মোমিন বলেন, আমি ২০০৯ সালে এসএসসি, ২০১১ সালে এইচএসসি পাস করি বিজ্ঞান বিভাগ থেকে। ২০১৬ সালে তিতুমীর থেকে ফিজিক্সে অনার্স শেষ করি। ইচ্ছে ছিল বিসিএস ক্যাডার বা ফরেন ক্যাডার হব। কিন্তু লালনের ওই একটা লাইন আমাকে ঘরছাড়া করল। মনে হলো, চাকরি পেলে হয়তো একটা খাঁচা পাব, কিন্তু পাখির খবর জানা হবে না।

দেহের খাঁচায় আত্মার অচিন পাখি

লালনের গানের সেই পঙ্‌ক্তির অর্থ খুঁজতে ২০১৮ সালের তিরোধান দিবসে আখড়ায় আসেন মোমিন। সেখানে গুরু জসিম উদ্দিনের সান্নিধ্যে শুরু হয় তাঁর নতুন সাধনার জীবন। জসিম উদ্দিন ‘জসিম পাগলা’ নামে পরিচিত ছিলেন। মোমিনের কাছে লালনের গানের খাঁচা মানে দেহ, আর অচিন পাখি মানে আত্মা। সেই আত্মার পরিচয় ও সত্যের সন্ধানেই এখন তাঁর দিন কাটে।

তাঁর গুরু জসিম পাগলা ২০২৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি মারা গেছেন। গুরুর চলে যাওয়ার পরও সাধনার পথ থেকে সরে যাননি মোমিন।

ভবিষ্যৎ নিয়ে কী ভাবেন—এমন প্রশ্নে তাঁর সংক্ষিপ্ত উত্তর, এক সেকেন্ডের ভরসা নাই।

মোমিন বলেন, ভবিষ্যৎ নিয়ে কখনো ভাবি না। যেহেতু সেকেন্ডের ভরসা নাই, সেহেতু যতক্ষণ সৃষ্টিকর্তা আমাকে রাখেন, ততক্ষণ আমি সত্যের সঙ্গে থাকতে চাই। সত্য কথা বলে, জ্ঞানার্জন করে সত্য জ্ঞান পেতে চাই। যে জ্ঞান অবিনশ্বর, যেটা সত্যের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।

নিজেকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টার কথাও বলেন তিনি। মিথ্যা, গিবত, হিংসা, অহংকার ও রাগ থেকে মুক্ত হতে চান। দূরে থাকতে চান মানুষের ভেতরের পশুত্ব, হানাহানি আর প্রবৃত্তির টান থেকে। তাঁর সাধনা শুধু অচিন পাখির পরিচয় খোঁজা নয়, নিজের ভেতরের মানুষটিকেও চিনে নেওয়া।

পরিবারের স্বপ্ন এক, মোমিনের পথ অন্য

তিন ভাই ও চার বোনের সংসারে মোমিন ছিলেন সবার বড়। পরিবারের প্রত্যাশা ছিল, ছেলে ভালো চাকরি করবেন, সংসারের হাল ধরবেন। কিন্তু সেই প্রত্যাশার বিপরীতে মোমিন বেছে নেন সাধনার জীবন। বাড়ি ছেড়ে চলে আসার সিদ্ধান্ত আজও মেনে নিতে পারেননি তাঁর বাবা-মা। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগও প্রায় বিচ্ছিন্ন।

তবে এ নিয়ে কোনো আক্ষেপ নেই মোমিনের। তাঁর চাওয়া, পৃথিবীর সব মানুষকে একই পরিবারের সদস্য হিসেবে দেখা হোক।

তিনি বলেন, আমার এখন একটাই চাওয়া—এক ফ্যামিলিতে পৃথিবীর সকল মানুষকে দেখতে চাই। লালন সাঁই তো সেটাই বলে গেছেন—“জাত গেল জাত গেল বলে, একি আজব কারখানা।

মোমিনের বিশ্বাস, মানুষের প্রতি ভালোবাসা সব জায়গা থেকেই সম্ভব। তবে সত্যের সন্ধানে থেকে মানুষকে ভালোবাসার গুরুত্ব আলাদা। লালনের গানের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, ‘কবে গো সৃজন হবে, যেদিন হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান, জাতি-গোত্র নাহি রবে।

ধর্মীয় বিভাজন নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে তাঁর। মোমিনের ভাষায়, ধর্মের মধ্যেই যখন এত দল ও বিভক্তি, তখন মানুষ কীভাবে সত্যবাদী হবে? একে অন্যকে পরাজিত করার চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে সত্যের পথে থাকা কঠিন বলে মনে করেন তিনি।

আমি একই ফ্যামিলিতে পৃথিবীর সকল মানুষকে দেখতে চাই,—আবারও বলেন মোমিন।

লালনের আখড়ায় এসে কেউ ফেরেন, কেউ থেকে যান

ছেঁউড়িয়ার সাধুদের ভাষ্য, প্রতিবছর লালন উৎসবের আগে শিক্ষিত তরুণদের অনেকে আখড়ায় আসেন। তাঁদের কেউ কেউ ফিরে গেলেও কয়েকজন থেকে যান সাধনার পথে। মোমিন তাঁদেরই একজন। বিসিএস ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে যে তরুণ একসময় বইয়ের পাতায় উত্তর খুঁজতেন, আট বছর ধরে তিনি সেই উত্তর খুঁজছেন লালনের আখড়ায়।

প্রায় ১৩৬ বছর আগে দেহত্যাগ করেছেন লালন সাঁই। কিন্তু তাঁর গান আজও মানুষের মনে জাগায় অজানা প্রশ্ন, জীবনের অর্থ খুঁজতে উদ্বুদ্ধ করে। ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’, ‘সময় গেলে সাধন হবে না’ মিলন হবে কত দিনে’—এসব গানের বাণী যেন মোমিনের জীবনেও নতুন অর্থ নিয়ে এসেছে।

একসময় যে তরুণের স্বপ্ন ছিল বিসিএস ক্যাডার হয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়া, আজ তাঁর সাধনা দেহের খাঁচায় বন্দি অচিন পাখির পরিচয় জানা। চাকরি, সংসার আর সামাজিক প্রতিষ্ঠার পরিচিত পথ ছেড়ে তিনি বেছে নিয়েছেন অনিশ্চিত এক জীবন। সেই পথের শেষ কোথায়, তা তাঁরও জানা নেই। তবে মোমিনের কাছে পথচলার চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে সত্যের সন্ধান—আর সেই সন্ধানেই ছেঁউড়িয়ার আখড়ায় কাটছে তাঁর দিন।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।