সিন্ডিকেট, বাজার কারসাজি ও ডিজিটাল প্রতিযোগিতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে কঠোর ব্যবস্থা; তিন অর্থবছরের গড় টার্নওভারের ১০ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানার প্রস্তাব
বাজারে যোগসাজশ করে পণ্যের দাম বাড়ানো, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানকে কোণঠাসা করা কিংবা ডিজিটাল মাধ্যমে প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত করার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন। এসব অনিয়মের প্রমাণ সংগ্রহে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে তল্লাশি চালানো, নথিপত্র ও ইলেকট্রনিক তথ্য জব্দ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের ক্ষমতা পাচ্ছে কমিশন। একই সঙ্গে একাধিক প্রতিষ্ঠান সিন্ডিকেট করে বাজারে আধিপত্য বিস্তার করলে তাদের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান যুক্ত হচ্ছে।
এ লক্ষ্যে ২০১২ সালের প্রতিযোগিতা আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে সংশোধনী আইনের খসড়া প্রকাশ করা হয়েছে। খসড়ার ওপর আগামী এক মাস যে কেউ মতামত দিতে পারবেন। মতামত পর্যালোচনা ও কয়েক দফা বৈঠকের পর সংশোধনী চূড়ান্ত করা হবে।
তল্লাশি, জব্দ ও জিজ্ঞাসাবাদের ক্ষমতা
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে তল্লাশি ও জব্দসংক্রান্ত নতুন বিধান যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। খসড়া অনুযায়ী, কমিশনের ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কোনো স্থান, ভবন, কক্ষ বা অফিসে প্রবেশ করে তল্লাশি চালাতে পারবেন। প্রয়োজন হলে প্রতিষ্ঠানের হিসাবের খাতাপত্র, বই, কম্পিউটার, ইলেকট্রনিক ডেটা, সফটওয়্যারসহ সংশ্লিষ্ট নথি ও বস্তু জব্দ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবেন।
জব্দ করা বস্তু নির্ধারিত সময় পর্যন্ত সাময়িকভাবে কমিশনের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। প্রয়োজনে কমিশনের নির্দেশ অনুসারে তা ফেরত দেওয়া যাবে। এ ক্ষেত্রে কোর্টস অব ইনকোয়ারি অ্যাক্ট, ১৮৯৮-এর প্রাসঙ্গিক বিধান প্রয়োগের সুযোগও রাখা হয়েছে। তল্লাশি ও জব্দের সময় অন্তত দুজন সাক্ষীর উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রয়েছে।
খসড়ায় বলা হয়েছে, তদন্তের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা এবং সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহের লক্ষ্যেই তল্লাশি ও জব্দের বিধান যুক্ত করা হচ্ছে। বিশেষ করে প্রতিষ্ঠানের হিসাবের খাতাপত্র, কম্পিউটার ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র থেকে প্রতিযোগিতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের প্রমাণ সংগ্রহে এ ক্ষমতা ব্যবহার করা হবে।
সিন্ডিকেট ও ডিজিটাল কারসাজিও আসছে আইনের আওতায়
বিদ্যমান আইনে কোনো একক প্রতিষ্ঠান বাজারে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে সংশোধনী খসড়ায় একাধিক প্রতিষ্ঠান সম্মিলিতভাবে সিন্ডিকেট গড়ে বাজারে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করলে তাদের শাস্তির বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ ছাড়া ডিজিটাল বাজারে প্রতিযোগিতা নষ্ট করার বিভিন্ন কৌশলও আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গ্রাহকের তথ্য নিয়ন্ত্রণ করে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানকে বাজারে প্রবেশে বাধা দেওয়া কিংবা স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে দাম নির্ধারণের মাধ্যমে প্রতিযোগিতায় বিরূপ প্রভাব ফেলার মতো কর্মকাণ্ড চিহ্নিত করতে কমিশনের ক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে।
কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল শুনানির জন্য আলাদা ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রস্তাবও রয়েছে খসড়ায়।
সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ টার্নওভার জরিমানা
প্রস্তাবিত সংশোধনী অনুযায়ী, প্রতিযোগিতাবিরোধী চুক্তি কিংবা কর্তৃত্বমূলক অবস্থানের অপব্যবহার প্রমাণিত হলে কমিশন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ওই কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দিতে পারবে। পাশাপাশি বিগত তিন অর্থবছরের গড় টার্নওভারের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত প্রশাসনিক আর্থিক জরিমানা আরোপ করতে পারবে।
বাজারে যোগসাজশের ক্ষেত্রে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তিকে চুক্তির মাধ্যমে অর্জিত মুনাফার তিন গুণ অথবা বিগত তিন অর্থবছরের গড় টার্নওভারের ১০ শতাংশ—এই দুইয়ের মধ্যে যেটি বেশি, সেই পরিমাণ জরিমানা করার বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে।
জরিমানা পরিশোধে ব্যর্থ হলে প্রতিদিনের জন্য সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড হতে পারে। কমিশনের আদেশ বা নির্দেশনা যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া অমান্য করলে সর্বোচ্চ এক বছর কারাদণ্ড অথবা প্রতিদিনের জন্য সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া কমিশনের কর্মকর্তাকে তল্লাশি, তলব কিংবা সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে বাধা দেওয়া বা নির্দেশ অমান্য করলে সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের প্রস্তাব রয়েছে।
আইন সংশোধনে বাড়বে কমিশনের কার্যকারিতা?
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও প্রতিযোগিতা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর অনুরূপ আইন অনুসরণ করে প্রতিযোগিতা আইনকে যুগোপযোগী করা হচ্ছে। সংশোধনের মাধ্যমে আইনের কিছু অপ্রয়োজনীয় বিষয় বাদ দেওয়া হবে এবং নতুন বিধান যুক্ত হবে। এতে কমিশনের কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে বলে আশা করছেন তারা।
তবে কমিশনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা। কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসেন সমকালকে বলেন, ‘প্রতিযোগিতা কমিশনের কর্মকাণ্ড নিয়ে আমরা খুবই হতাশ। তাই প্রতিযোগিতা আইন সংশোধনের বিষয়ে আমাদের অনেক প্রস্তাব ছিল। আমাদের কাছে মনে হয়েছে, আইনের সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি কমিশনে নিয়োজিত ব্যক্তিদের উদ্যোগ ও কার্যকর ভূমিকারও ঘাটতি রয়েছে।’
তিনি বলেন, কমিশন এতদিন আইনের যেসব সীমাবদ্ধতার কথা বলে আসছিল, সংশোধনের মাধ্যমে সেগুলো দূর করার সুযোগ তৈরি হবে। তবে কমিশনকে আরও জনমুখী ও কার্যকর করতে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। বর্তমানে কমিশন অনেক ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশের অপেক্ষায় থাকে। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটি যথাযথভাবে কার্যকর হচ্ছে না।
এস এম নাজের হোসেন আরও বলেন, কমিশনের অন্যতম সমস্যা হলো, তারা ঠিকমতো তদন্ত করতে পারে না। কিছু ক্ষেত্রে লোক দেখানোভাবে জরিমানা ঘোষণা করা হয়। পরে মন্ত্রণালয় বা আদালতের পর্যায়ে গিয়ে সেই সিদ্ধান্ত বাতিল হয়ে যায়। এতে সরকারি অর্থের অপচয় হয়। যারা অনিয়ম বা অপরাধ করে, তারাও এসব সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দেয় না।
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে কমিশনের হাতে তল্লাশি, জব্দ ও কঠোর জরিমানার ক্ষমতা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও এসব ক্ষমতা কতটা স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কার্যকর তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োগ করা হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে আইনের নতুন ক্ষমতার পাশাপাশি কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও স্বাধীনভাবে কাজ করার কার্যকারিতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
