বুধবার, ২১শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

পাঁচ বছরেও শেষ হয়নি এলেঙ্গার ১৩ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ

টাঙ্গাইল জেলা প্রতিনিধি
অক্টোবর ২১, ২০২৬ ১২:৩৪ অপরাহ্ণ
Link Copied!

ব্যয় বেড়েছে ১১১ কোটি টাকা, ঈদে যানজটের দুর্ভোগে লাখো যাত্রী। সরাতৈল এলাকায় নেট বাঁধছে শ্রমিকরা। ছবি: সমতল মাতৃভূমি

এলেঙ্গা থেকে যমুনা সেতুর পূর্বপ্রান্ত পর্যন্ত চার লেনের মহাসড়ক নির্মাণে পাঁচ বছরেও শেষ হয়নি কাজ। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ধীরগতিতে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০৪ কোটি টাকা। অথচ অগ্রগতি মাত্র ৫২ থেকে ৫৫ শতাংশ। নির্ধারিত সময়েও কাজ শেষ হচ্ছে না বলে আশঙ্কা প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের।

ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের এলেঙ্গা থেকে যমুনা সেতুর পূর্বপ্রান্তের গোলচত্বর পর্যন্ত ১৩ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণকাজ পাঁচ বছরেও শেষ হয়নি। ২০২১ সালে দরপত্রের মাধ্যমে কাজ পাওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আবদুল মোনেম লিমিটেডের বিরুদ্ধে ধীরগতির অভিযোগ উঠেছে। এ কারণে প্রকল্পের ব্যয় ১১১ কোটি টাকা বেড়ে গেছে। নির্মাণকাজের দীর্ঘসূত্রতায় প্রতি বছর দুই ঈদে এই মহাসড়কে যানজটের ভোগান্তিতে পড়ছেন যাত্রী ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিজেদের মতো করে ধীরগতিতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। যদিও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দাবি, প্রকল্পের ৫২ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। প্রকল্প পরিচালকের হিসাবে অগ্রগতি ৫৫ শতাংশ। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলেও জানিয়েছেন তিনি।

১৩ কিলোমিটার সড়কে নেই চার লেন, দুর্ভোগে যাত্রী

গত সোমবার সরেজমিনে দেখা গেছে, এলেঙ্গা থেকে যমুনা সেতুর পূর্বপ্রান্তের গোলচত্বর পর্যন্ত ১৩ কিলোমিটার এলাকায় এখনো সড়ক বিভাজক নির্মাণ হয়নি। ফলে এই অংশে দুই লেনে যানবাহন চলাচল করছে। চান্দরা থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত চার লেনের সড়ক থাকলেও এলেঙ্গা থেকে সেতুর পূর্বপ্রান্ত পর্যন্ত রয়ে গেছে আগের সড়কব্যবস্থা।

এলেঙ্গা থেকে সেতুর পূর্বপ্রান্ত পর্যন্ত এক পাশের সার্ভিস লেনের কাজ শেষ হয়েছে। পুরোনো সড়ক ও সার্ভিস লেন দিয়ে যানবাহন চলাচল করছে। মূল সড়কের এক পাশে চলছে সিসি ঢালাইয়ের কাজ। কোথাও আবার নির্মাণকাজ শুরুই হয়নি। সব মিলিয়ে অগ্রগতি প্রায় অর্ধেক।

সরেজমিনে নির্মাণস্থলে আট থেকে দশজন শ্রমিককে ঢালাইয়ের জন্য নেট বাঁধতে দেখা গেছে। শ্রমিকরা জানান, নেট বাঁধার কাজ শেষ হলে ঢালাই করা হবে। প্রায় ছয় মাস ধরে সেখানে কাজ করছেন নির্মাণশ্রমিক রফিকুল ইসলাম। তাঁর ভাষ্য, কাজের গতি খুবই ধীর।

ঈদে যানজট, ক্ষোভ পরিবহন শ্রমিক ও যাত্রীদের

রংপুরের হানিফ পরিবহনের সুপারভাইজার মোস্তাক হোসেন বলেন, যে সময়ে এখানে কাজ শুরু হয়েছে, একই সময়ে কড্ডার মোড় থেকে রংপুরের মডার্ন মোড় পর্যন্ত সড়কের কাজ শুরু হয়েছিল। ওই কাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু এখনো সেতুর পূর্বপ্রান্তের কাজ শেষ হয়নি। এটা চরম দায়িত্বহীনতা। মনে হয়, কেউ কোনো তদারকি করে না।

তিনি বলেন, প্রতি বছর দুই ঈদে এই এলাকায় যানজটের কারণে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। কবে নির্মাণকাজ শেষ হবে, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।

সেতুর পূর্বপ্রান্তের সরাতৈল এলাকার বাসিন্দা সৈয়দ মহসিন মির্জাপুরের একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। প্রতিদিন বাসে বাড়ি থেকে কারখানায় গিয়ে কাজ শেষে আবার বাড়ি ফেরেন। দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণকাজ চলায় তাঁরও ভোগান্তি বেড়েছে।

মহসিন বলেন, ‘প্রায় পাঁচ বছর হলো নির্মাণকাজ চলছে। এত ধীরগতির কাজ কখনো দেখিনি। পুরো রাস্তা ভালোভাবে এসে বাড়ির কাছে এলেঙ্গায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকা পড়ে থাকতে হয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কি এসব দায়িত্বহীনতা চোখে পড়ে না?

দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ করার দাবি জানান তিনি।

প্রতিদিন ২০-২৫ হাজার যানবাহন, দুর্ঘটনার ঝুঁকি

যমুনা সেতু চালু হওয়ার পর থেকে এই মহাসড়ক দিয়ে উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের প্রায় ২২টি জেলার যানবাহন চলাচল করছে। প্রতিদিন প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার গাড়ি চলাচল করে এই পথে।

চার লেনের নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় সার্ভিস লেন দিয়ে পাশাপাশি দুটি গাড়ি চলাচলের সময় ঝুঁকিতে পড়তে হচ্ছে চালকদের। এতে যানজটের পাশাপাশি দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়ছে। মাঝেমধ্যে দুর্ঘটনা ঘটছে বলেও স্থানীয়দের অভিযোগ।

৫৯৩ কোটি টাকার প্রকল্প, ব্যয় এখন ৭০৪ কোটি

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাসেক-২ প্রকল্পের আওতায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের এলেঙ্গা থেকে যমুনা সেতুর পূর্বপ্রান্ত পর্যন্ত উন্নয়নকাজের দরপত্রে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে অংশ নিয়ে কাজ পায় আবদুল মোনেম লিমিটেড। তখন প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫৯৩ কোটি টাকা।

২০২২ সালের মার্চে নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রথমে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়। পরে আরও এক দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ মূল বরাদ্দের তুলনায় ব্যয় বেড়েছে ১১১ কোটি টাকা।

কিন্তু ব্যয় ও মেয়াদ বাড়লেও নির্মাণকাজ শেষ হয়নি। প্রকল্পের অগ্রগতি এখনো অর্ধেকের কিছু বেশি।

আট সেতু, ১০ কালভার্টের কাজ শেষ

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, এলেঙ্গা থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত আটটি সেতু ও ১০টি কালভার্টের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। এলেঙ্গা ফ্লাইওভারের পাইলিংয়ের কাজ প্রায় শেষ। পিলার নির্মাণের কাজও শেষের দিকে। আগামী ঈদের আগে ফ্লাইওভারটির কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

মহাসড়কের মাঝের অংশের নির্মাণকাজ চলছে। ১৩ কিলোমিটারের মধ্যে এক পাশে সাত কিলোমিটার সড়কের কাজ শেষ হয়েছে। তিনটি আন্ডারপাসের নির্মাণকাজও চলমান। এসব আন্ডারপাসের পাইলিং শেষ হয়েছে, এখন কলাম নির্মাণ করা হচ্ছে।

আবদুল মোনেম লিমিটেডের প্রকল্প ব্যবস্থাপক রবিউল আওয়াল বলেন, এখন পর্যন্ত ৫২ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। তবে এই মেয়াদেও প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ হবে না বলে মনে করা হচ্ছে। আরও সময় বাড়াতে হবে।

ডিসেম্বরেও শেষ হচ্ছে না, আরও ছয় মাসের মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাব

সাসেক-২ প্রকল্পের পরিচালক প্রকৌশলী সৈয়দ রিয়াজ উদ্দিন বলেন, নির্মাণকাজের ধরন পরিবর্তনসহ বিভিন্ন পরিবর্তনের কারণে প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে। কাজের মান পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। তবে নির্মাণকাজের গতি আশানুরূপ নয়। তাঁর হিসাবে, এখন পর্যন্ত ৫৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।

তিনি বলেন, কাজের গতি আরও বাড়ানো প্রয়োজন। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করার জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে আগেও সতর্কতামূলক চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আগামী ডিসেম্বরেও নির্মাণকাজ শেষ করা সম্ভব হবে না। এ জন্য আরও ছয় মাস মেয়াদ বাড়াতে হবে।

প্রকল্প পরিচালক আশা করছেন, আগামী বছরের এপ্রিলের মধ্যে নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ হবে।

পাঁচ বছর ধরে চলা নির্মাণকাজ, বাড়তি ব্যয় এবং নির্ধারিত সময়ের পরও প্রকল্প শেষ না হওয়ার আশঙ্কায় এলেঙ্গা থেকে যমুনা সেতুর পূর্বপ্রান্তের ১৩ কিলোমিটার সড়ক এখনো উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের যাত্রীদের দুর্ভোগের বড় কারণ হয়ে রয়েছে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।