পাবনায় মাদকাসক্ত ছেলের হাতে মা খুন, কুড়িগ্রামে নাতির হাতে দাদা; সিলেটে অটোরিকশাচালককে কুপিয়ে হত্যা, যশোরে বৃদ্ধার গলাকাটা লাশ উদ্ধার। ফাইল ছবি
পারিবারিক বিরোধ, মাদকের টাকা এবং তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ঝিনাইদহের মহেশপুরে ঘুমন্ত জামাইকে কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে হত্যার পর সেই কুড়াল কাঁধে নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর অভিযোগ উঠেছে শ্বশুরের বিরুদ্ধে। পাবনায় মাদক কেনার টাকা না পেয়ে মাকে কাঁচি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছে এক ছেলে। কুড়িগ্রামে চাচাতো দাদাকে গলা কেটে হত্যার অভিযোগ উঠেছে এক নাতির বিরুদ্ধে। অন্যদিকে, সিলেটে অটোরিকশার সিরিয়াল নিয়ে বিরোধের জেরে এক চালককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। যশোরে নিজ বাড়ির খাটের ওপর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে এক বৃদ্ধার গলাকাটা লাশ। তাঁর ঘর থেকে জমির দলিল, নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার লুটের অভিযোগও উঠেছে।
মঙ্গলবার (২১ অক্টোবর) ঝিনাইদহ, পাবনা, সিলেট ও যশোরে এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এর আগে সোমবার রাতে কুড়িগ্রামে দাদাকে হত্যার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় কয়েকজন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর—
ঝিনাইদহে জামাইকে হত্যার পর কাঁধে কুড়াল নিয়ে ঘোরেন শ্বশুর
মহেশপুর (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি: ঝিনাইদহের মহেশপুরে পারিবারিক মনোমালিন্যের জেরে ঘুমন্ত জামাই গোলাম রহমানকে কুড়াল দিয়ে আঘাত করে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তাঁর শ্বশুর তরিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে। হত্যার পর ব্যবহৃত কুড়ালটি কাঁধে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন তিনি। পরে স্থানীয় লোকজন তাঁকে আটক করে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখেন। পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করেছে।
মঙ্গলবার সকালে উপজেলার বলিভদ্রপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শ্বশুর তরিকুল ইসলামের সঙ্গে জামাই গোলাম রহমানের মনোমালিন্য চলছিল। এর জেরে সকালে ঘুমন্ত অবস্থায় গোলাম রহমানের ঘাড়ে কুড়াল দিয়ে আঘাত করেন তরিকুল। এতে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।
এরপর হত্যায় ব্যবহৃত কুড়াল কাঁধে নিয়ে এলাকায় ঘুরে বেড়ান অভিযুক্ত। বিষয়টি জানাজানি হলে স্থানীয়রা তাঁকে আটক করেন।
নিহত গোলাম রহমান পার্শ্ববর্তী কালীগঞ্জ উপজেলার নাইড়িপাড়া গ্রামের ক্বারী গোলাম হুদার ছেলে।
মহেশপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইমরান আলম বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে অভিযুক্তকে আটক করেছে। মরদেহ ও হত্যায় ব্যবহৃত কুড়াল উদ্ধার করা হয়েছে।
পাবনায় মাদক কেনার টাকা না পেয়ে মাকে হত্যা
পাবনা প্রতিনিধি: পাবনার ফরিদপুরে মাদক কেনার টাকা না দেওয়ায় সূর্য বেগম (৫৫) নামে এক মাকে কাঁচি দিয়ে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তাঁর ছেলে মো. উদ্দিন সরদারের বিরুদ্ধে। মঙ্গলবার সকালে উপজেলার বিএলবাড়ি ইউনিয়নের লক্ষ্মীকোল গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত ছেলেকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সকালে মো. উদ্দিন তাঁর মা সূর্য বেগমের কাছে মাদক কেনার জন্য টাকা চান। কিন্তু টাকা দিতে না পারায় ক্ষিপ্ত হয়ে তিনি কাঁচি দিয়ে মায়ের ওপর হামলা চালান। এতে ঘটনাস্থলেই সূর্য বেগমের মৃত্যু হয়।
নিহত সূর্য বেগম লক্ষ্মীকোল গ্রামের লোকমান আলীর স্ত্রী। পরিবারের দাবি, মো. উদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্ত।
ফরিদপুর থানার ওসি মনজুরুল হাসান মাসুদ বলেন, এ ঘটনায় অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে।
সিলেটে অটোরিকশার সিরিয়াল নিয়ে বিরোধে চালককে কুপিয়ে হত্যা
সিলেট প্রতিনিধি: সিলেটের কানাইঘাটে সিএনজিচালিত অটোরিকশার সিরিয়াল দেওয়া নিয়ে বিরোধের জেরে শাহাব উদ্দিন নামে এক চালককে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে।
মঙ্গলবার উপজেলার সুরইঘাট এলাকায় এ হামলার ঘটনা ঘটে। গুরুতর আহত অবস্থায় শাহাব উদ্দিনকে উদ্ধার করে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত শাহাব উদ্দিন কানাইঘাট উপজেলার লক্ষীপ্রসাদ পশ্চিম ইউনিয়নের সোনাতনপুঞ্জি গ্রামের বাসিন্দা।
কানাইঘাট থানার ওসি মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিকভাবে পূর্বশত্রুতার জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
যশোরে ঘরে একা ছিলেন বৃদ্ধা, সকালে খাটে মিলল গলাকাটা লাশ
যশোর প্রতিনিধি: যশোরের অভয়নগরে নিজ বাড়ি থেকে আছিয়া বেগম (৭৫) নামে এক বৃদ্ধার গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। দুর্বৃত্তরা তাঁকে হত্যার পর ঘর থেকে জমির দলিল, নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার নিয়ে গেছে বলে অভিযোগ করেছে পরিবার।
মঙ্গলবার সকালে উপজেলার রামনগর গ্রামে এ ঘটনা প্রকাশ্যে আসে। নিহত আছিয়া বেগম ওই গ্রামের আবু দাউদ শেখের স্ত্রী।
পরিবারের সদস্যরা জানান, সোমবার রাতে বাড়িতে একাই ছিলেন আছিয়া বেগম। মঙ্গলবার সকালে প্রতিবেশীরা তাঁকে ডাকাডাকি করে কোনো সাড়া না পেয়ে ঘরের ভেতরে উঁকি দেন। এ সময় খাটের ওপর তাঁর গলাকাটা মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন তাঁরা।
নিহতের মেয়ে পান্না বেগম বলেন, সকালে বাড়িতে এসে তিনি খাটের ওপর মায়ের গলাকাটা মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন। ঘরের মালামাল এলোমেলো ছিল। জমির দলিল, স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা খুঁজে পাওয়া যায়নি।
অভয়নগর থানার ওসি মো. নুরুজ্জামান বলেন, বৃদ্ধার গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ ঘটনাটি তদন্ত করছে।
কুড়িগ্রামে চাচাতো নাতির হাতে দাদা খুন, গ্রেফতার অভিযুক্ত
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি: কুড়িগ্রামের উলিপুরে মোকছেদ আলী বাচ্চু নামে এক ব্যক্তিকে গলা কেটে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তাঁর চাচাতো নাতি রাব্বি মিয়ার বিরুদ্ধে। সোমবার রাতে উপজেলার পণ্ডিতপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। পরে অভিযুক্ত রাব্বিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, রংপুরের মাহিগঞ্জ এলাকার মোকছেদ আলী বাচ্চু সোমবার বেড়াতে আসেন কুড়িগ্রামের উলিপুরে তাঁর বড় ভাই একাব্বর আলীর বাড়িতে। একই দিন ঢাকা থেকে ওই বাড়িতে আসেন একাব্বর আলীর বড় ছেলে মিঠু মিয়ার ছেলে রাব্বি মিয়া।
রাতে খাওয়াদাওয়া শেষে বাচ্চু ও রাব্বি একই কক্ষে ঘুমাতে যান। গভীর রাতে রাব্বির ডাকে ঘুম থেকে উঠে একাব্বর আলী তাঁর ভাইয়ের গলাকাটা মরদেহ দেখতে পান। এ সময় রক্তমাখা ছুরি হাতে রাব্বিকে পালিয়ে যেতে দেখেন বলে জানান তিনি।
একাব্বর আলী বলেন, পরে তাঁর ছেলে মিঠু জানিয়েছেন, রাব্বি মাদকাসক্ত। মাদকের কারণে সে এমন ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে বলে পরিবারের ধারণা। তবে হত্যার প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
কুড়িগ্রাম সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাসুদ রানা জানান, অভিযুক্ত রাব্বিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যায় ব্যবহৃত ছুরিও উদ্ধার করা হয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ডের কারণ এখনো জানা যায়নি।
একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড, উদ্বেগ
একই সময়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় পারিবারিক বিরোধ, মাদকাসক্তি ও স্থানীয় বিরোধকে কেন্দ্র করে এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনা জনমনে উদ্বেগ তৈরি করেছে। কোথাও ঘুমন্ত জামাই, কোথাও নিজের মা, আবার কোথাও পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্যকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি যশোরের ঘটনায় বৃদ্ধাকে হত্যার পর লুটপাটের অভিযোগও সামনে এসেছে।
তবে এসব ঘটনার পেছনের প্রকৃত কারণ, অভিযুক্তদের দায় এবং সম্ভাব্য অন্য কোনো সংশ্লিষ্টতা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। পুলিশের তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে হত্যাকাণ্ডগুলোর পূর্ণ চিত্র স্পষ্ট হবে।
