‘ধাওয়া দিলে নদীতে ঝাঁপ দেন তাহসিফ, পালিয়ে আসি আমি’—জিজ্ঞাসাবাদে দাবি; উদ্ধার মোটরসাইকেলটি তাঁরই কি না, চলছে যাচাই। তাহসিফের ‘বন্ধুস্থানীয় ছোট ভাই’ আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দ্বীপকে নিয়ে ঘটনাস্থলে নৌ পুলিশ ও পিবিআই
বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির (২৮) মৃত্যুর ঘটনায় নতুন তথ্য সামনে এসেছে। মৃত্যুর আগে তুরাগ নদের তীরবর্তী এলাকায় তাহসিফের সঙ্গে থাকা তাঁর ‘বন্ধুস্থানীয় ছোট ভাই’ আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দ্বীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে নৌ পুলিশ ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
জিজ্ঞাসাবাদে দ্বীপ দাবি করেছেন, ঘটনার রাতে তাঁরা দুজন টঙ্গীর হোন্ডা রোড ও হাজী মাজার বস্তি সংলগ্ন ইজতেমার মাঠ এলাকায় কথা বলছিলেন। এ সময় কয়েকজন তাঁদের ধাওয়া করলে তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন। আর তিনি পালিয়ে আসেন। তবে দ্বীপের দেওয়া বক্তব্যে এখনো পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারেনি পিবিআই। ঘটনার অন্যান্য দিক সামনে রেখে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে সংস্থাটি।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) দুপুর ১টার দিকে দ্বীপকে সঙ্গে নিয়ে টঙ্গীর হোন্ডা রোড ও হাজী মাজার বস্তি সংলগ্ন ইজতেমার মাঠ এলাকা পরিদর্শন করেন নৌ পুলিশ ও পিবিআইয়ের কর্মকর্তারা।
রাজধানীর উত্তরখানের তুরাগ নদের রাজবাড়ী ঘাট থেকে বুধবার বিকেলে তাহসিফের ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। এর কাছাকাছি টঙ্গী সেনাকল্যাণ সংস্থার পাশে হোন্ডা রোড থেকে শুক্রবার সকালে একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। তাহসিফের মৃত্যুর আগে তিনি ও দ্বীপ ওই এলাকায় এসেছিলেন বলে জানা গেছে।
ধাওয়া করেছিল কারা, খতিয়ে দেখছে পিবিআই
পিবিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দ্বীপ জানিয়েছেন, তাঁদের ধাওয়া করা ব্যক্তিদের কয়েকজন পুলিশের পোশাক পরা ছিলেন। তবে কারা তাঁদের ধাওয়া করেছিল, কী কারণে ধাওয়া করা হয়েছিল এবং এর সঙ্গে তাহসিফের মৃত্যুর কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পিবিআই কর্মকর্তাদের প্রাথমিক ধারণা, রাজবাড়ী ঘাট এলাকাটি মাদক কারবারিদের আনাগোনার স্থান হিসেবে পরিচিত। ফলে ধাওয়াকারীরা মাদক কারবারি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাঁদের ধাওয়ার মুখে তাহসিফ নদীতে পড়ে ডুবে যেতে পারেন বলেও মনে করছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে এসব ধারণার পক্ষে এখনো চূড়ান্ত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
দ্বীপের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ঘটনাস্থল শনাক্ত করা এবং মোটরসাইকেলটি উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পিবিআইয়ের একটি সূত্র।
জিজ্ঞাসাবাদে দ্বীপ আরও বলেছেন, ধাওয়া দেওয়ার পর তাঁরা দুজন দুই দিকে দৌড় দেন। সাবেক বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা তাহসিফ নদীর দিকে চলে যান। তবে দ্বীপের বক্তব্যের সত্যতা যাচাইয়ে আরও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
মোটরসাইকেলটি তাহসিফের কি না, চলছে যাচাই
তাহসিফ যে মোটরসাইকেল নিয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন, উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেলটি সেটিই বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে পিবিআই। তবে মোটরসাইকেলটির কোনো নম্বর প্লেট না থাকায় এর প্রকৃত মালিকানা যাচাই করা হচ্ছে।
পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার আবু ইউসুফ বলেন, ‘দ্বীপ বলেছেন, আমরা সেখানে (ঘটনাস্থল) কথা বলছিলাম। এ সময় কিছু লোক ধাওয়া করে। তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেয়। আর আমি পালিয়ে আসি। তার এ কথাসহ জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া অন্যান্য তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, যে মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়েছে, তাতে কোনো নম্বর প্লেট নেই। তাহসিফ যে মোটরসাইকেলটি ব্যবহার করতেন, তাতেও কোনো নম্বর প্লেট নেই বলে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এটি তাঁরই মোটরসাইকেল। তবে বিষয়টি নিশ্চিত হতে আরও যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
দ্বীপের বক্তব্যে পুরোপুরি আশ্বস্ত নয় পিবিআই
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় তথ্য সংগ্রহের জন্য বুধবার রাতে দ্বীপকে পিবিআইয়ের ঢাকা মেট্রো উত্তরে নেওয়া হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, তাহসিফ ও দ্বীপ একসঙ্গে ছিলেন। তাঁরা কোথায় কোথায় গিয়েছিলেন, কী ঘটেছিল এবং তাঁদের চলাচলের সঙ্গে মৃত্যুর ঘটনার কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না—দ্বীপের দেওয়া এসব তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।
পিবিআইয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা এখনও তাঁর (দ্বীপের) বক্তব্যে পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারছি না। মামলার অন্যান্য দিকগুলো মাথায় রেখে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছি।
জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দ্বীপকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে জানিয়ে পিবিআই বলছে, তাঁর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তদন্তের বিভিন্ন দিক যাচাই করা হচ্ছে।
মূল তদন্ত নৌ পুলিশের, ছায়া তদন্ত করছে পিবিআই
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় মূল তদন্ত করছে নৌ পুলিশ। তবে ঘটনাটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় পিবিআই ছায়া তদন্ত করছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
পিবিআইয়ের কর্মকর্তারা জানান, নৌ পুলিশকে সহযোগিতার জন্য পুলিশের অন্যান্য ইউনিটের মতো পিবিআইও কাজ করছে। তদন্তে পাওয়া তথ্য ও উপাত্ত মূল তদন্তকারী সংস্থা নৌ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে।
তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, তাঁকে ধাওয়া করার পেছনের ঘটনা এবং উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেলটির মালিকানা—সবকিছুই তদন্তের আওতায় রয়েছে। দ্বীপের বক্তব্যের পাশাপাশি অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ যাচাই করে ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা করছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
