রেজাউল করিম। ফাইল ফটো
মাত্র সাত বছরের চাকরিজীবনেই বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম—এমন অভিযোগ উঠেছে। সরকারি উন্নয়নকাজে অনিয়ম, দুর্নীতি, কমিশন বাণিজ্য, ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ এবং নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগে তাঁকে ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে তাঁর আয়-ব্যয়, সম্পদের উৎস, ব্যাংক হিসাব এবং অতীত কর্মস্থলের নথিপত্র নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
২০১৮ সালে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে গণপূর্ত অধিদপ্তরে কর্মজীবন শুরু করেন রেজাউল করিম। ফরিদপুর জেলার সদরপুর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব শ্যামপুর গ্রামের একটি সাধারণ কৃষক পরিবারের সন্তান তিনি। তাঁর বাবা মোমিন মোল্লা ও মা আনোয়ারা বেগম। অভিযোগ রয়েছে, ছাত্রলীগের রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব কাজে লাগিয়ে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একাধিক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন তিনি। সেই রাজনৈতিক যোগাযোগকে পুঁজি করেই অল্প সময়ে অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগও প্রভাব খাটিয়ে আড়াল করা হয়েছে বলে দাবি অভিযোগকারীদের।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনেও বহাল প্রভাবের অভিযোগ
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ব্যাপক পরিবর্তন এলেও গণপূর্ত অধিদপ্তরের কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আগের প্রভাব ও সুবিধা ধরে রাখার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বিগত সরকারের আমলে অধিদপ্তরের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও সরকারি অর্থ লোপাটের ঘটনা ঘটেছে। রেজাউল করিম ওই সিন্ডিকেটের অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য ছিলেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও সংশ্লিষ্ট চক্রের প্রভাব পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি। বরং পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়ে অনেকেই প্রশাসনিক অবস্থান ধরে রেখেছেন। সম্প্রতি লটারির মাধ্যমে গণপূর্ত অধিদপ্তরের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলীদের বদলি প্রক্রিয়ায় রেজাউল করিমের কর্মস্থল ময়মনসিংহে নির্ধারিত হয়েছে।
সাত বছরের চাকরিতে বিলাসবহুল জীবন, সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন
ষষ্ঠ গ্রেডের একজন সরকারি কর্মকর্তার মাত্র সাত বছরের চাকরিজীবনে এত বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া কীভাবে সম্ভব—এমন প্রশ্ন উঠেছে তাঁর সম্পদ ও জীবনযাপন ঘিরে। অভিযোগ রয়েছে, একসময় টিনের ঘরে বেড়ে ওঠা রেজাউল করিম চাকরিতে যোগদানের পরপরই গ্রামের বাড়িতে নির্মাণ করেন বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স ভবন।
অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, রাজধানীর আফতাবনগরের ই-ব্লকের ১৭/১৯ নম্বর ভবনের বি/২ নম্বর ফ্ল্যাটে বসবাস করেন তিনি। ফ্ল্যাটটির বর্তমান বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা বলে দাবি করা হচ্ছে। ওই ভবনের মালিকদের তালিকায় তাঁর নাম রয়েছে বলেও জানা গেছে। এ ছাড়া তাঁর ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য প্রায় কোটি টাকা মূল্যের একটি গাড়ি রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
শুধু রাজধানীতেই নয়, ফরিদপুর সদর, সদরপুর উপজেলা এবং শ্বশুরবাড়ি কুমিল্লার দেবিদ্বারেও জমি, প্লট ও ফ্ল্যাটসহ বিপুল সম্পদের মালিকানা রয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি। এসব সম্পদ ক্রয়ের অর্থের উৎস কী, সরকারি চাকরির আয় দিয়ে এত সম্পদ অর্জন সম্ভব কি না—তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
স্বজনদের নামে সম্পদ, ব্যাংক হিসাবেও বিপুল অর্থের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, নিজের নামে সম্পদ অর্জনের ঝুঁকি এড়াতে রেজাউল করিম তাঁর বাবা মোমিন মোল্লা, মা আনোয়ারা বেগম, স্ত্রী ফারহানা সুলতানা, শ্বশুর সুলতান আহমেদ, শাশুড়ি ফেরদৌসী আহমেদ, সন্তান ও অন্যান্য আত্মীয়স্বজনের নামে বিভিন্ন স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ গড়ে তুলেছেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, পরিবারের সদস্যদের নামে একাধিক ব্যাংক হিসাব খুলে সেখানে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের ভিত্তিতে সম্পদের বিবরণী, জমি ও ফ্ল্যাটের দলিল, গাড়ির নিবন্ধন এবং ব্যাংক লেনদেন পর্যালোচনা করা হলে সম্পদের প্রকৃত মালিকানা ও অর্থের উৎস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
এ ক্ষেত্রে শুধু তাঁর নিজের সম্পদ বিবরণী নয়, পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ স্বজনদের নামে থাকা সম্পদের উৎসও যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অতীত কর্মস্থলের ফাইলেই মিলতে পারে অনিয়মের তথ্য
রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের মধ্যে সরকারি উন্নয়নকাজে অনিয়ম, কমিশন বাণিজ্য, ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি যেসব কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করেছেন, সেসব এলাকার প্রকল্পের কার্যাদেশ, প্রাক্কলন, বিল-ভাউচার, পরিমাপ বই (এমবি), ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া অর্থের বিবরণ এবং কাজের বাস্তব অগ্রগতি যাচাই করা হলে অনিয়মের চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
বিশেষ করে প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয়, বাস্তব কাজের পরিমাণ, ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আর্থিক লেনদেনের মধ্যে কোনো অসংগতি রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। পাশাপাশি তাঁর চাকরিতে যোগদানের সময়কার আর্থিক অবস্থা এবং বর্তমান সম্পদের তুলনামূলক হিসাবও তদন্তের আওতায় আনার প্রয়োজন রয়েছে।
প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুর্নীতি, অনিয়ম, কমিশন বাণিজ্য ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য জানতে ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে হোয়াটসঅ্যাপে অভিযোগের বিস্তারিত বিবরণ পাঠিয়ে তাঁর প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
তবে অভিযোগগুলো এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। একই সঙ্গে প্রকৌশলী রেজাউল করিমের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে। চলবে……..
