পিবিআই তদন্তে তরুণীকে মানসিক হাসপাতালে আটকে রাখার ঘটনার তথ্য উঠে আসার দাবি, সাময়িক বরখাস্তের আদেশও বাতিল; ভবিষ্যৎ তহবিল থেকে ৩৭ লাখ টাকা উত্তোলনের অভিযোগ। ফাইল ছবি
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্বে থাকা মো. জামানুর রহমানকে ঘিরে পুরোনো নানা বিতর্ক ও গুরুতর অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার, পদোন্নতি ও বেতনসংক্রান্ত অনিয়ম, ঠিকাদারি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, নারী নির্যাতন এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রভাবশালী মন্ত্রী ও নেতাদের ঘনিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে অধিদপ্তরে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠলেও সেসব অভিযোগের কার্যকর নিষ্পত্তি হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অবস্থান বদলে নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা এবং শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব পাওয়ায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
কুষ্টিয়ায় নিজ বাড়ি এবং মেহেরপুরে শ্বশুরবাড়ি হওয়ার সুবাদে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী ও নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ গড়ে তোলেন প্রকৌশলী জামানুর রহমান—এমন অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে সাবেক মন্ত্রী তাজুল ইসলাম, মাহবুবউল আলম হানিফ, হাসানুল হক ইনু ও ফরহাদ হোসেনের আস্থাভাজন হিসেবে তিনি অধিদপ্তরে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগকারীদের দাবি। পঞ্চম গ্রেডের কর্মকর্তা হয়েও চতুর্থ গ্রেডের বেতন গ্রহণ এবং তৎকালীন মন্ত্রীদের বিশেষ সুপারিশে পূর্ববর্তী তারিখ থেকে পদোন্নতি বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। খুলনা সার্কেলে টানা পাঁচ বছর দায়িত্ব পালনকালে একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রেখে পছন্দের ঠিকাদারদের মাধ্যমে নিম্নমানের কাজ করানো এবং সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জামানুর রহমানের অবস্থানেও নাটকীয় পরিবর্তন আসে বলে অভিযোগ রয়েছে। অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠতা ও দলীয় প্রভাব কাজে লাগিয়ে টেন্ডার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ থাকলেও বর্তমানে নিজেকে আওয়ামী লীগবিরোধী এবং বিএনপিসমর্থিত হিসেবে পরিচয় দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। টুঙ্গিপাড়ায় মাজারে ফুলের ডালি নিয়ে যাওয়ার বিষয়টিও তার অতীত রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার প্রসঙ্গে আলোচনায় এসেছে। তবে কুষ্টিয়া ও খুলনা সার্কেলে দায়িত্ব পালনকালে তার প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণে অধস্তন কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের অনেকেই প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করার সাহস পেতেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। যারা অনিয়মের প্রতিবাদ করেছেন, তাদের মানসিক হয়রানি, প্রশাসনিক চাপ এবং শাস্তিমূলক বদলির মুখে পড়তে হয়েছে বলেও অভিযোগকারীদের দাবি।
চাকরির প্রলোভন থেকে মানসিক হাসপাতালে আটকে রাখার অভিযোগ
জামানুর রহমানকে ঘিরে অভিযোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর ও স্পর্শকাতর বিষয় নারী নির্যাতন এবং এক তরুণীকে জোরপূর্বক মানসিক হাসপাতালে আটকে রাখার অভিযোগ। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৩ সালে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে এক তরুণীকে অনৈতিক প্রস্তাব দেন প্রকৌশলী জামানুর রহমান। ওই তরুণী প্রস্তাবে রাজি না হয়ে প্রতিবাদ করলে তাকে মানসিক ভারসাম্যহীন হিসেবে উপস্থাপন করে পাবনা মানসিক হাসপাতালে শিকলবন্দি করে আটকে রাখার ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ উঠেছে।
পরবর্তী সময়ে অজ্ঞাত সূত্রের ফোন পেয়ে ভুক্তভোগীর স্বামী বিষয়টি জানতে পারেন এবং আদালতের শরণাপন্ন হন। আদালতের নির্দেশে ওই তরুণীকে উদ্ধার করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্তেও জামানুর রহমানের সংশ্লিষ্টতার তথ্য ও ঘটনার সত্যতা উঠে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে। ঘটনাটি শুধু একজন কর্মকর্তার ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ নয়, বরং সরকারি চাকরির প্রলোভনকে কেন্দ্র করে একজন নারীর সঙ্গে গুরুতর অন্যায়ের অভিযোগ হিসেবেও আলোচনায় এসেছে।
সাময়িক বরখাস্ত, পরে আদেশ বাতিল; ৩৭ লাখ টাকা উত্তোলনের অভিযোগ
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে জামানুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল বলে জানা গেছে। তবে পরবর্তীতে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের তদবিরে সেই বরখাস্তের আদেশ বাতিল করিয়ে তিনি আবারও চাকরিতে বহাল হন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া তিন পৃষ্ঠার একটি অভিযোগপত্রে তার বিরুদ্ধে চাকরি বাণিজ্য, প্রশাসনিক অনিয়ম এবং নারী নির্যাতনসংক্রান্ত অভিযোগের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এ ছাড়া সাময়িক বরখাস্ত থাকা অবস্থায় জীবন ধারণ ভাতা ছাড়া অন্যান্য আর্থিক সুবিধা গ্রহণের বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও ভবিষ্যৎ তহবিল থেকে ৩৭ লাখ টাকা উত্তোলনের অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। ওই অর্থ উত্তোলনের ক্ষেত্রে বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
এত অভিযোগের পরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে কীভাবে?
একাধিক গুরুতর অভিযোগ, সাময়িক বরখাস্তের অতীত এবং তদন্তের বিষয় সামনে আসার পরও জামানুর রহমান কীভাবে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব পেলেন—এ প্রশ্ন এখন সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনার কেন্দ্রে। তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তি, পিবিআই তদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন, বরখাস্তের আদেশ বাতিলের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং ভবিষ্যৎ তহবিল থেকে অর্থ উত্তোলনের বৈধতা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বশীল পদে নিয়োগ ও দায়িত্ব অর্পণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, যোগ্যতা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। ফলে জামানুর রহমানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রকৌশলী মো. জামানুর রহমানের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা এবং পিবিআই তদন্তের পূর্ণাঙ্গ নথি পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন। অভিযোগগুলোর প্রতিটি বিষয় স্বাধীনভাবে যাচাই করাও জরুরি।
