বৃহস্পতিবার, ২২শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৮ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

“নীল অর্থনীতির স্বপ্নভঙ্গ” বিশ্বব্যাংকের হাজার কোটি টাকা ফেরত, উপকূলবাসী বঞ্চিত—ব্যর্থতার দায় কার?

নিজস্ব প্রতিবেদক
জানুয়ারি ২২, ২০২৬ ২:০৪ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

নীল অর্থনীতির স্বপ্নভঙ্গ

বিশ্বব্যাংকের হাজার কোটি টাকা ফেরত, উপকূলবাসী বঞ্চিত—ব্যর্থতার দায় কার?

বাংলাদেশের বিশাল সমুদ্রসীমা ঘিরে এক দশক আগে যে ‘নীল অর্থনীতি’ বা ব্লু-ইকোনমির সোনালি স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, তা আজ কেবল নথিপত্রে সীমাবদ্ধ এক ব্যর্থ উন্নয়ন কাহিনি। সেই স্বপ্নের অন্যতম বাহক ছিল মৎস্য অধিদপ্তরের উচ্চাভিলাষী প্রকল্প—‘সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রকল্প’।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, ১ হাজার ৮৬৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকার এই প্রকল্পের বড় অংশ বাস্তবায়ন না হওয়ায় বিশ্বব্যাংকের প্রতিশ্রুত হাজার কোটি টাকা অব্যবহৃত থেকেই বিদেশে ফেরত যাচ্ছে।

২০১৮ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটি সাড়ে সাত বছর পেরিয়ে গেলেও উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবনে কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে পারেনি। বরং এটি পরিণত হয়েছে প্রশাসনিক অদক্ষতা, পরিকল্পনাহীনতা ও সমন্বয়হীনতার এক প্রকট উদাহরণে।

অবকাঠামোই যেখানে ভিত্তি, সেখানেই চরম ব্যর্থতা-

প্রকল্পের মূল ভিত্তি ছিল ১৮টি আধুনিক ফিশ ল্যান্ডিং সেন্টার নির্মাণ। এসব কেন্দ্র ছাড়া মাছের মান নিয়ন্ত্রণ, সংরক্ষণ, মূল্য সংযোজন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি—সবই প্রায় অসম্ভব। অথচ সাড়ে সাত বছরেও এসব কেন্দ্র নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণ করতে পারেনি মৎস্য অধিদপ্তর।

কর্তৃপক্ষ জমির মালিকানা জটিলতার কথা বললেও প্রশ্ন উঠেছে— যথাযথ সমীক্ষা ও ভূমি নিশ্চয়তা ছাড়া কীভাবে হাজার কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন পেল?

এর সরাসরি ফলাফল—

*১৬টি সার্ভিল্যান্স চেকপোস্টের জায়গায় নির্মিত হয়েছে মাত্র ৫টি।

*১৬টি ফিশারিজ পন্টুনের পরিবর্তে হয়েছে মাত্র ৬টি

অর্থাৎ প্রকল্পের মেরুদণ্ডই ভেঙে পড়েছে।

‘সাশ্রয়’ না কি ব্যর্থতার অজুহাত? কর্তৃপক্ষের দাবি, সংশোধিত ডিপিপি অনুযায়ী প্রকল্পের ৯৭ শতাংশ বাস্তবায়ন সম্পন্ন হয়েছে।

তাঁদের ব্যাখ্যা—

*ডলারের বিনিময় হার পরিবর্তন-

*কোভিড-১৯–এর কারণে বিদেশ সফর বাতিল-

*কম দামে দরপত্র পাওয়া

*এসব কারণেই অর্থ ‘সাশ্রয়’ হয়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন।

অবকাঠামো নির্মাণে দরদাতা না পাওয়া, কাজ শুরু না হওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ প্যাকেজ বাদ পড়াই অর্থ অব্যয়ের প্রধান কারণ—এমনটাই বলছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

একজন উন্নয়ন অর্থনীতিবিদের ভাষায়- “উন্নয়ন প্রকল্পের লক্ষ্য পূরণ না করে হাজার কোটি টাকা ফেরত দেওয়া কোনোভাবেই সাশ্রয় নয়—এটি প্রশাসনিক দেউলিয়াপনার স্পষ্ট প্রমাণ।”

সমুদ্র পাহারা দেওয়ার নৌকাই নেই!

প্রকল্পের আওতায় ৮টি আধুনিক প্যাট্রোল বোট কেনার পরিকল্পনা ছিল, যা অবৈধ মাছ ধরা, সামুদ্রিক সম্পদ লুট ও জলদস্যুতা প্রতিরোধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু ‘সরকারি অনুমোদন পাওয়া যায়নি’—এই অজুহাতে সেই পরিকল্পনাও বাদ দেওয়া হয়েছে। এর অর্থ দাঁড়ায়—বাংলাদেশ তার বিশাল সামুদ্রিক সম্পদ সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করেছে।

মাঠে হাহাকার, কাগজে সাফল্য, খুলনা থেকে কুয়াকাটা—উপকূলজুড়ে জেলেদের কণ্ঠে একই ক্ষোভ। ভাঙা ঘাট, পলি জমে ভরাট খাল, আধুনিক সংরক্ষণ সুবিধার অভাব—সবকিছুই রয়ে গেছে আগের মতো।

বরগুনার পাথরঘাটার এক জেলের ভাষ্যমতে, “নাম-ধাম লিখে গেছে, সভা-সেমিনার হয়েছে—কিন্তু আমাদের জীবনে কোনো পরিবর্তন আসেনি।”

প্রকল্প পরিচালকের বক্তব্য, প্রশ্নের জবাব কি মিলল?

মৎস্য অধিদপ্তরের প্রকল্প পরিচালক জিয়া হায়দার চৌধুরী দাবি করেছেন— জমি জটিলতা প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণে ছিল না, অর্থ অব্যবহৃত নয়, বরং হিসাব সংশোধনের ফল। পিডি পরিবর্তন ছিল নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। তবে  ৮,৫০০ নৌযানে পরীক্ষামূলক জিএসএম ট্র্যাকিং করা হয়েছে।

তবু প্রশ্ন থেকেই যায়—

যদি প্রকল্প এতটাই সফল হতো, তবে বিশ্বব্যাংকের হাজার কোটি টাকা কেন ফেরত গেল? অপচয় শুধু অর্থের নয়, অপচয় সম্ভাবনার। যে অর্থ দিয়ে উপকূলের লাখো মানুষের জীবনমান বদলানো যেত, যে প্রকল্প বাংলাদেশের নীল অর্থনীতিকে আন্তর্জাতিক মানচিত্রে তুলে ধরতে পারত— তা আজ কেবল ব্যর্থতার সাক্ষী হয়ে কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ।

এই ব্যর্থতা শুধু একটি প্রকল্পের নয়— এটি একটি জাতীয় সম্ভাবনার অপচয়। নীল অর্থনীতির যে সোনালি স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, আজ তা ঢেকে গেছে ধূসর বাস্তবতার মোটা পর্দায়।

উল্লেখ্য যে বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা ও মৎস্য উন্নয়ন প্রকল্পের অবকাঠামো সুসংহত রাখতে বাংলাদেশের প্রতিটি পদক্ষেপ দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে এগুতে হবে। অবহেলিত জনগোষ্ঠীর প্রতি নিঃস্বার্থভাবে দেখভাল করতে হবে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
বিশেষ খবর সর্বশেষ