বৃহস্পতিবার, ১২ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৭শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

১৬ মার্চ শুরু খাল–নদী খনন কর্মসূচি: ‘জিয়া মডেল’-এর প্রত্যাবর্তনে জাগছে হারানো স্বস্তি ও আশার আলো

রওশন জাহান মিতু
মার্চ ১১, ২০২৬ ৫:৩০ অপরাহ্ণ
Link Copied!

বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি, কৃষি উৎপাদন এবং পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার ইতিহাসে এক সময় যুগান্তকারী উদ্যোগ হিসেবে আলোচিত হয়েছিল সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচি। ১৯৭৭–৭৮ অর্থবছরে তিনি যে দূরদর্শী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন, তা শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্পই ছিল না—বরং এটি ছিল কৃষি পুনরুজ্জীবন, পানি ব্যবস্থাপনা এবং গ্রামীণ স্বনির্ভরতার এক অনন্য মডেল, যা পরবর্তীতে ‘জিয়া মডেল’ নামে পরিচিতি পায়।

দীর্ঘদিন পর আবারও সেই কর্মসূচিকে নতুন করে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়ায় দেশের বিভিন্ন মহলে তৈরি হয়েছে আশাবাদ ও স্বস্তির আবহ। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি বাস্তবায়িত হলে বন্যা, খরা এবং পানিসংকট মোকাবিলায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।

🌾 কৃষি ও অর্থনীতিতে বিপ্লব এনেছিল ‘জিয়া মডেল’
সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ এবং শুষ্ক মৌসুমে কৃষিকাজে সেচব্যবস্থা নিশ্চিত করা। এই কর্মসূচির মাধ্যমে অল্প দিনের মধ্যেই প্রায় দুই লাখ হেক্টর অনাবাদি জমি চাষের উপযোগী করে তোলা সম্ভব হয়েছিল। ফলে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং ধীরে ধীরে খাদ্য ঘাটতি কাটিয়ে ওঠে বাংলাদেশ।
খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরতা কমে যায় এবং দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ছিল বাংলাদেশের কৃষি পুনরুজ্জীবনের অন্যতম বড় ভিত্তি।

জনগণের অংশগ্রহণে গড়ে উঠেছিল এক অনন্য উন্নয়ন মডেল- এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে ছিল সাধারণ মানুষের অভূতপূর্ব অংশগ্রহণ। ছাত্র, শিক্ষক, চাকরিজীবী, জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে গ্রাম সরকার এবং বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে খাল খননে অংশ নেন।
কর্মসূচিটি পরিচালিত হয়েছিল কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা) কর্মসূচির মাধ্যমে। ফলে স্থানীয় জনগণ সরাসরি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। এতে মানুষের মধ্যে সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও সামাজিক বন্ধন আরও দৃঢ় হয়—যা আধুনিক ভাষায় আজ কমিউনিটি-বেইসড ডেভেলপমেন্ট মডেল হিসেবে পরিচিত।

প্রযুক্তি ছাড়াই দূরদর্শী পরিকল্পনা- বর্তমানে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় জিওস্পেশাল প্রযুক্তি, ডাটা মডেলিং এবং বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এসব আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়াই জিয়াউর রহমান তখন একটি সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনার ধারণা দিয়েছিলেন। একাডেমিক গবেষণায় যখন ডেনড্রাইটিক, ট্রেলিস, রেডিয়াল বা আয়তক্ষেত্রাকার নিষ্কাশনব্যবস্থার মডেল নিয়ে আলোচনা হয়, তখন অনেক গবেষকের মতে জিয়া মডেল বাস্তব প্রয়োগের একটি সফল উদাহরণ।

গবেষণায় মিলেছে সাফল্যের প্রমাণ- বিভিন্ন গবেষণা ও তথ্যসূত্রে এই কর্মসূচির সাফল্যের চিত্র উঠে এসেছে।
বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, দেড় বছরের মধ্যে প্রায় ১৫০০টির বেশি খাল খনন ও পুনরুদ্ধার করা হয়েছিল।
BISS জার্নালের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ১৯৭৯–১৯৮১ সালের মধ্যে ২৭৯টি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ৩৬৩৬ মাইল খাল খনন করা হয়।
ResearchGate-এর একটি গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, এই কর্মসূচির ফলে ১৯৮০ সালে খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটে।
DTIC-এর তথ্য অনুযায়ী, কর্মসূচিটি গ্রামীণ স্বনির্ভরতা ও কর্মসংস্থান তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

কর্মসূচি বন্ধ হওয়ার পর বেড়েছে বন্যা ও পানিসংকট
বিশেষজ্ঞদের মতে, জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর কর্মসূচিটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দীর্ঘমেয়াদে দেশের পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় বড় ক্ষতি হয়েছে।
যদি এই কর্মসূচি অব্যাহত থাকত, তবে—
বর্ষাকালের ভয়াবহ বন্যা এতটা প্রকট হতো না
শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট কম থাকত কৃষি উৎপাদন আরও স্থিতিশীল থাকত।
২০২৪ সালে ফেনীর দীর্ঘস্থায়ী বন্যার পেছনেও স্থানীয় নিষ্কাশনব্যবস্থার ধ্বংস হয়ে যাওয়াকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বরেন্দ্র, মধ্যাঞ্চল ও উপকূলে সংকট আরও প্রকট
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খাল ভরাট ও নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ার প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।
বরেন্দ্র অঞ্চল। শুষ্ক মৌসুমে সেচের জন্য খালের পানি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখন ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় অনেকেই সাবমার্সিবল পাম্প ব্যবহার করছেন, আবার অনেকে পানি কিনে ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন।
মধ্যাঞ্চল নদী ও খালের নেটওয়ার্ক একসময় অতিরিক্ত বর্ষার পানি দ্রুত নিষ্কাশন করত। এখন খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্ষায় বন্যা ও শীতে পানির সংকট তৈরি হচ্ছে।
দক্ষিণাঞ্চল দিন দিন বাড়ছে লবণাক্ততা। যদি খালগুলো সচল থাকত, তবে মিষ্টি পানির সংরক্ষণ সম্ভব হতো এবং কৃষি ও মাছ চাষ উভয় ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়ত।

কর্মসংস্থান ও সামাজিক ঐক্যেরও উৎস ছিল এই কর্মসূচি- খাল খনন কর্মসূচি শুধু পানি ব্যবস্থাপনা বা কৃষি উন্নয়নেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি ছিল গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য একটি বড় কর্মসংস্থানের উৎস।
খাদ্যের বিনিময়ে কাজের সুযোগ গরিব কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের জন্য বিশেষ সহায়ক ছিল। পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের স্বেচ্ছাসেবী অংশগ্রহণ একটি অনন্য সামাজিক ঐক্যের উদাহরণ তৈরি করেছিল।
মানিকগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে—গ্রামের মানুষ নিজেরাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে খাল খননে অংশ নিয়েছেন।

খাল দখল ও ভরাটের ভয়াবহ বাস্তবতা
বর্তমানে দেশের বহু খাল ভরাট হয়ে গেছে বা দখল হয়ে গেছে। ফলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, খাল খননের কর্মসূচি পুনরায় চালু হলে শুধু পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনাই উন্নত হবে না, বরং খাল–বিল ও জলাশয় দখলমুক্ত রাখতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও গুরুত্বপূর্ণ- বিশ্লেষকদের মতে, এই কর্মসূচি অব্যাহত থাকলে জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) বাস্তবায়নেও বড় অবদান রাখতে পারত।
তাই বর্তমান সরকারের উদ্যোগকে অনেকেই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন।

ভবিষ্যতের প্রত্যাশা- বিশেষজ্ঞদের মতে, খাল ও নদী খননের এই উদ্যোগ শুধু একটি প্রকল্প নয়—এটি হতে পারে বাংলাদেশের পানি ব্যবস্থাপনা ও কৃষি উন্নয়নের নতুন দিগন্ত।
যদি ধারাবাহিকভাবে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা যায়, তবে—
* কৃষি উৎপাদন বাড়বে
* বন্যা ও খরা মোকাবিলা সহজ হবে
* পানিসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত হবে
* সুপেয় পানির প্রাপ্যতা বাড়বে

সবচেয়ে বড় কথা, আবারও জীবন্ত হয়ে উঠবে বাংলাদেশের নদী–খাল–বিলের প্রাণচাঞ্চল্য।
আর সেই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের কাছে আবারও ফিরে আসবে জিয়া মডেলের সফলতার গল্প—যা একসময় বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়নের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে উঠেছিল।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।