মেহেরপুরের গাংনী উপজেলায় পারিবারিক সম্পর্কের আড়ালে অর্থ আত্মসাতের এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। লন্ডনে পাঠানোর খরচ বাবদ দেওয়া ৩০ লাখ টাকা ফেরত চাইতে গিয়ে মারধর, ভয়ভীতি ও প্রভাবশালীদের মাধ্যমে হুমকির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন এক ব্যক্তি। অভিযুক্ত আর কেউ নন, তারই আপন বড় ভাই।
এ ঘটনায় গাংনী উপজেলার তেতুলবাড়ীয়া ইউনিয়নের শহড়াতলা গ্রামের বাসিন্দা আব্দুস সালামের ছেলে মোঃ আরিফুল ইসলাম গাংনী থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
অভিযোগে বলা হয়েছে, আরিফুল ইসলামের আপন বড় ভাই মোঃ জান্নাতুল ফেরদৌস এবং তার স্ত্রী মোছাঃ সোহানা শিরিন ওরফে বিনতে লন্ডনে যাওয়ার উদ্দেশ্যে দফায় দফায় তার কাছ থেকে মোট ৩০ লাখ টাকা গ্রহণ করেন।
পরবর্তীতে ২০২২ সালের ৬ অক্টোবর ঢাকার একটি প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট/নোটারি পাবলিক কার্যালয়ে একটি বিশেষ আম-মোক্তারনামা দলিল সম্পাদন করা হয়। ওই দলিলের মাধ্যমে কুষ্টিয়া ও মেহেরপুর জেলার বিভিন্ন মৌজায় অবস্থিত প্রায় ৪ শতক জমির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব আরিফুল ইসলামের ওপর অর্পণ করা হয়।
চুক্তি অনুযায়ী, জান্নাতুল ফেরদৌস লন্ডন থেকে দেশে ফিরে এসে ৩০ লাখ টাকা পরিশোধ করে দলিল ফেরত নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অভিযোগকারী দাবি করেন, বিদেশে যাওয়ার পর থেকেই বিবাদীরা তার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, কয়েক মাস আগে দেশে ফিরে এলেও জান্নাতুল ফেরদৌস পাওনা টাকা পরিশোধ না করে বিভিন্ন অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন।
‘কর্নেল’ পরিচয়ে ফোনে হুমকি-
ঘটনাটি নতুন মোড় নেয় গত ২ জুন ২০২৬ রাতে। অভিযোগ অনুযায়ী, মোঃ হুমায়ুন কবির নামের এক ব্যক্তি অপর একটি মোবাইল নম্বর থেকে ফোন করে নিজেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন কর্নেল পরিচয় দেন।
তিনি নাকি বিবাদীদের পক্ষ নিয়ে আরিফুল ইসলামকে সতর্ক করে বলেন, পাওনা টাকা দাবি অব্যাহত রাখলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে তাকে তুলে নেওয়া হবে।
এই ফোনকলের পর থেকেই তিনি চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে দাবি করেন।
টাকা চাইতেই মারধরের অভিযোগ
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ৩ জুন সকাল ৬টার দিকে নিজ গ্রামে জান্নাতুল ফেরদৌসের সঙ্গে দেখা হলে আরিফুল ইসলাম তার পাওনা টাকা ফেরত চান। এ সময় অভিযুক্ত ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং তাকে কিল-ঘুষি মেরে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
আরিফুল ইসলামের দাবি, মারধরের সময় জান্নাতুল ফেরদৌস স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে তিনি কোনো টাকা ফেরত দেবেন না।
ঘটনার সময় স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন ফিরোজা বেগম (৬৫), স্বপন আলী (৫৫), বিল্লাল হোসেন (৪৭) ও মালেক হোসেন (৪৩)।
‘আইনি দলিল ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা’
আরিফুল ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১৬ অক্টোবর সম্পাদিত আম-মোক্তারনামা দলিলে জান্নাতুল ফেরদৌস ৩০ লাখ টাকা গ্রহণের বিষয়টি আইনগতভাবে স্বীকার করেছিলেন।
তার অভিযোগ, লন্ডনে গিয়ে নানা জটিলতায় পড়ে দেশে ফিরে আসার পর জান্নাতুল ফেরদৌস পাওনা টাকা পরিশোধের পরিবর্তে গত ৩ জুন পৈতৃক বাড়িতে দলবল নিয়ে এসে তার কাছে থাকা মূল আইনি দলিল জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেওয়া এবং ছিঁড়ে ফেলার চেষ্টা করেন।
অভিযুক্তের পাল্টা দাবি
তবে অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন জান্নাতুল ফেরদৌস।
ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আরিফুল ইসলামের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। আমি লন্ডনে অবস্থানকালে বিভিন্ন সময়ে তাকে প্রায় ৩৬ লাখ টাকা পরিশোধ করেছি। এ সংক্রান্ত সব ধরনের ডকুমেন্ট আমার কাছে রয়েছে।”
তদন্তে পুলিশ
এ বিষয়ে গাংনী থানা পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এদিকে একই পরিবারের দুই ভাইয়ের মধ্যে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন, আইনি দলিল, বিদেশযাত্রা, হুমকির অভিযোগ এবং পাল্টাপাল্টি দাবিকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এখন সবার নজর পুলিশের তদন্ত ও পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের দিকে।
