বেনাপোল স্থল বন্দরের কার্গো ইয়ার্ড। ফাইল ছবি
বেনাপোল স্থলবন্দরের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বলয়ের ভেতরে ঘটে গেছে এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা। কাস্টমসের জব্দ করা প্রায় ৬ কোটি টাকা মূল্যের ভারতীয় শাড়ি, থ্রিপিস, বেবিওয়্যার ও প্রসাধনী সামগ্রী রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে গেছে। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, সেই মূল্যবান পণ্যের জায়গায় রাখা হয়েছে নিম্নমানের দেশীয় শাড়ি, থ্রিপিস ও অন্যান্য সামগ্রী। কোরবানি ঈদের ছুটির মধ্যেই ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় বন্দরজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে।
কাস্টমস কর্মকর্তাদের মতে, কঠোর নিরাপত্তা ও সার্বক্ষণিক নজরদারির মধ্যে থাকা বন্দরের তালাবদ্ধ শেড থেকে কোটি কোটি টাকার পণ্য গায়েব হয়ে যাওয়া কোনো সাধারণ চুরির ঘটনা নয়। তাদের ধারণা, বন্দরের অভ্যন্তরের প্রভাবশালী কোনো চক্রের সহযোগিতা ছাড়া এমন দুঃসাহসিক জালিয়াতি সম্ভব নয়।
কীভাবে ধরা পড়ে জালিয়াতি?
কাস্টমস সূত্র জানায়, যশোরের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘সাফা ইমপেক্স’ গত ১২ মার্চ ভারত থেকে একটি চালান আমদানি করে। ম্যানিফেস্ট নম্বর ৬০১২০২৬০০১০০১৬৩৩৩-এর ওই চালানটি সিএন্ডএফ এজেন্ট হিসেবে গ্রহণ করে বেনাপোলের মেসার্স হুদা এন্টারপ্রাইজ। পরে চালানটি বন্দরের ৩৭ নম্বর শেডে সংরক্ষণ করা হয়।
আমদানি নথিতে পণ্য হিসেবে বেকিং পাউডারের ঘোষণা দেওয়া হলেও কাস্টমসের কায়িক পরীক্ষায় বেরিয়ে আসে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। ১০৮টি কার্টনের ভেতর পাওয়া যায় দামি ভারতীয় শাড়ি, থ্রিপিস, বেবিওয়্যার, ফেসওয়াশ, ক্রিম, লোশনসহ বিভিন্ন প্রসাধনী সামগ্রী। কাস্টমসের হিসাবে এসব পণ্যের বাজারমূল্য প্রায় ৬ কোটি টাকা এবং এর মাধ্যমে ২ কোটি ৩২ লাখ ৬৪ হাজার ৫১৫ টাকার রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা করা হয়েছিল।
ঘটনার পর ২০২৩ সালের কাস্টমস আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় চালানটি জব্দ করা হয় এবং বন্দরের জিম্মায় রাখা হয়। একইসঙ্গে আইনি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত চালানটি খালাস না করার জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার লিখিত নির্দেশনা দেওয়া হয়। সিএন্ডএফ এজেন্ট মেসার্স হুদা এন্টারপ্রাইজের লাইসেন্সও সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়।
তালাবদ্ধ শেডে ঘটল অবিশ্বাস্য ঘটনা
কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ১২ মার্চ, ২ এপ্রিল ও ২০ মে পৃথক তিনটি চিঠির মাধ্যমে চালানটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বন্দর কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করে। কিন্তু সেই সতর্কতার মধ্যেই কোরবানি ঈদের ছুটির সময় তালাবদ্ধ ৩৭ নম্বর শেড থেকে জব্দ করা ভারতীয় পণ্য সরিয়ে ফেলা হয়।
পরে সেখানে সাজিয়ে রাখা হয় নিম্নমানের দেশীয় পণ্য। অভিযোগ ওঠার পর শুল্ক গোয়েন্দারা তদন্তে নামে। ২ জুন বন্দর ও ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে পুনরায় কায়িক পরীক্ষা করা হলে অভিযোগের সত্যতা মিলেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
দেশীয় কার্টন, কুরিয়ার স্টিকার ও সংবাদপত্র—মিলল চাঞ্চল্যকর আলামত
বেনাপোল কাস্টমস হাউসের কমিশনার মোহাম্মদ ফাইজুর রহমান জানান, ভারতীয় মূল্যবান পণ্যের পরিবর্তে যে পণ্য পাওয়া গেছে, সেগুলো বসুন্ধরা ও মেঘনা গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামযুক্ত কার্টনে রাখা ছিল। এছাড়া দেশীয় সংবাদপত্রে মোড়ানো প্যাকেট এবং বিভিন্ন কুরিয়ার সার্ভিসের স্টিকারযুক্ত পিপি বস্তাও উদ্ধার করা হয়েছে।
তার ভাষায়, এসব আলামত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে বিকল্প পণ্যগুলো দেশের অভ্যন্তর থেকেই এনে ওই শেডে রাখা হয়েছে।
নিরাপত্তার বলয় ভেদ করল কারা?
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বন্দরের প্রতিটি শেডে রয়েছে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা, নিয়মিত টহল ও সিসিটিভি নজরদারি। বিশেষ করে ৩৭ নম্বর শেডটি সবসময় তালাবদ্ধ অবস্থায় থাকে। ফলে অভ্যন্তরীণ সহযোগিতা ছাড়া সেখানে প্রবেশ করে কয়েক কোটি টাকার পণ্য সরিয়ে নেওয়া কার্যত অসম্ভব।
এই প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে—কারা এই অপারেশনের নেপথ্যে? কীভাবে তালাবদ্ধ শেডে প্রবেশ করা হলো? আর কোথায় গেল কোটি টাকার ভারতীয় পণ্য?
আড়াই কোটি টাকার রাজস্ব পরিশোধে চরমপত্র
ঘটনার পর ৩ জুন বন্দর কর্তৃপক্ষকে পাঠানো এক চিঠিতে কাস্টমস জানায়, জব্দকৃত পণ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ওয়্যারহাউজ রক্ষকের। বন্দরের জিম্মায় থাকা অবস্থায় পণ্য পরিবর্তন ও সরিয়ে ফেলার মাধ্যমে কাস্টমস আইন লঙ্ঘিত হয়েছে।
ফলে হারিয়ে যাওয়া পণ্যের বিপরীতে ক্ষতিগ্রস্ত ২ কোটি ৩২ লাখ ৬৪ হাজার ৫১৫ টাকার রাজস্ব বন্দর কর্তৃপক্ষকে পরিশোধ করতে হবে বলে জানানো হয়েছে। একইসঙ্গে শেডের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়েও ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
তদন্তে নেমেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ
বেনাপোল স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (ট্রাফিক) মো. শামীম হোসেন জানিয়েছেন, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা চলছে। শেড ইনচার্জ মোহাম্মদ শাহজালালকে প্রত্যাহার করে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া উপ-পরিচালক (ট্রাফিক) মো. রুহুল আমিনের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
সামনে আসছে নতুন নাম
এদিকে সিএন্ডএফ এজেন্ট মেসার্স হুদা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আনিসুর রহমান দাবি করেছেন, জব্দ হওয়া চালানটির খালাসের জন্য তারা কোনো বিল অব এন্ট্রি দাখিল করেননি। বরং ‘রাজু’ নামের এক ব্যক্তি তাদের প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে এসব কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। তার পরিচয়ও কাস্টমসকে জানানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে কাস্টমস সূত্র বলছে, কাগজে-কলমে একজন নারীর নামে থাকা ‘সাফা ইমপেক্স’ প্রকৃতপক্ষে পরিচালনা করেন আমদানি জালিয়াতি ও শুল্ক ফাঁকির ঘটনায় আলোচিত ব্যবসায়ী আশরাফ হোসেন ওরফে বাবু। তবে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
রহস্যের জাল আরও ঘনীভূত
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, প্রথমে মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি করে রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা করা হয়। পরে চালানটি জব্দ হওয়ার পর বন্দরের ভেতর থেকেই মূল্যবান পণ্য সরিয়ে ফেলে প্রমাণ নষ্টের চেষ্টা করা হয়েছে।
তাদের ধারণা, পুরো ঘটনাটি একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সুপরিকল্পিত অপারেশন। এখন তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসতে পারে বন্দরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সেই শক্তিশালী সিন্ডিকেটের নাম, যারা কোটি কোটি টাকার পণ্য উধাও করে দিয়েও এতদিন আড়ালে ছিল।
বেনাপোল বন্দরের এই রহস্যময় কাণ্ড এখন শুধু চুরির ঘটনা নয়, বরং দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দরের নিরাপত্তা ও শুল্ক ব্যবস্থাপনাকে ঘিরে বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
