বুধবার, ২রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৮ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

আলমডাঙ্গার নিগার সিদ্দিক কলেজে ‘ভুতুড়ে’ নিয়োগের অভিযোগ, আরলিজা খাতুনের নামে বেতন-ভাতা উত্তোলন, অধ্যক্ষ-সভাপতির বিরুদ্ধে তদন্তে ‘৯৫ শতাংশ অনিয়ম’ পাওয়ার দাবি

আলমডাঙ্গা (চুয়াডাঙ্গা) প্রতিনিধি
সেপ্টেম্বর ২, ২০২৬ ৬:৩৬ অপরাহ্ণ
Link Copied!

চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী নিগার সিদ্দিক ডিগ্রি কলেজে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ যেন থামছেই না। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সারাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ চললেও এই কলেজে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। দীর্ঘ সময় পার হলেও গঠিত হয়নি পূর্ণাঙ্গ ম্যানেজিং কমিটি। আর এই অভিভাবকহীনতার সুযোগে কলেজের অধ্যক্ষ আবু নাসির ও এডহক কমিটির সভাপতি ইউসুফ হাসানের বিরুদ্ধে গোপনে গভর্নিং বডি গঠন, নিয়োগ-বাণিজ্য, অর্থ আত্মসাৎ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর হলো বাংলা বিভাগে আরলিজা খাতুন নামে এক শিক্ষকের ‘ভুতুড়ে’ নিয়োগের অভিযোগ। প্রায় ২৫ লাখ টাকার বিনিময়ে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর কাগজে-কলমে তার নামে সরকারি অনুদানের বেতন-ভাতা নিয়মিত উত্তোলন করা হলেও বাস্তবে তিনি কলেজে উপস্থিত থাকেন না—এমন অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা।

‘শিক্ষককে দেখেননি’ শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা

কলেজের শিক্ষক, কর্মচারী ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবি, আরলিজা খাতুন নামে কোনো শিক্ষককে তারা কখনো শ্রেণিকক্ষে কিংবা কলেজ প্রাঙ্গণে দেখেননি। এমনকি তার নামে হাজিরা খাতায় নিয়মিত স্বাক্ষর রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, অধ্যক্ষ আবু নাসির ও এডহক কমিটির সভাপতি ইউসুফ হাসানের প্রত্যক্ষ মদদে কাগজপত্রের মাধ্যমে আরলিজার নামে সরকারি বেতন-ভাতা উত্তোলন করে তা আত্মসাৎ করা হচ্ছে।

তবে অভিযুক্ত শিক্ষক আরলিজা খাতুন তার নিয়োগ বৈধ বলে দাবি করেছেন। কিন্তু কলেজে অনুপস্থিত থাকা কিংবা নিয়মিত ক্লাস না নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

অধ্যক্ষের নিয়োগ নিয়েও পুরোনো অভিযোগ

অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে আরও জানা যায়, ২০১১ সালে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে যোগ্য প্রার্থীদের বাদ দিয়ে অর্থের বিনিময়ে অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে আবু নাসিরের বিরুদ্ধে।

অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সোলাইমান হক জোয়ার্দ্দার সেলুন ও তার স্ত্রীর ভাই আরশাদ উদ্দিন চন্দনের প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও অধ্যক্ষ তার রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা ও অনিয়মের চর্চা থেকে বের হতে পারেননি। এরই ধারাবাহিকতায় আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্য হিসেবে পরিচিত আরলিজা খাতুনকে বাংলা বিভাগে নিয়োগ দিয়ে কথিত ‘ভুতুড়ে’ উপায়ে সরকারি অর্থ উত্তোলন করা হচ্ছে।

নির্বাচন ছাড়াই গভর্নিং বডি গঠনের অভিযোগ

শুধু নিয়োগ নিয়েই নয়, কলেজের গভর্নিং বডি নিয়েও উঠেছে গুরুতর অভিযোগ।

শিক্ষক-কর্মচারীদের অন্ধকারে রেখে প্রশাসনিক নিয়ম-নীতি উপেক্ষা করে নির্বাচন ছাড়াই নিজেদের পছন্দের লোকজনকে নিয়ে গোপনে গভর্নিং বডি গঠনের পরিকল্পনা করছেন অধ্যক্ষ ও সভাপতি—এমন অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

অন্যদিকে, ২১ মাসের একটি অভ্যন্তরীণ অডিট প্রতিবেদনে কলেজের ফান্ড থেকে প্রায় ২০ লাখ টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

তদন্তে ‘৯৫ শতাংশ অনিয়ম’ পাওয়ার দাবি

অভিযোগগুলো সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর গত ৩ আগস্ট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাসুদ হোসেন পলাশের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি সরেজমিনে তদন্ত করে।

তদন্ত শেষে কমিটির প্রধান উপস্থিত সাংবাদিকদের জানান, প্রাথমিক তদন্তে প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৯৫ শতাংশ অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে তিনি সাত কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়ার কথা জানান।

তবে নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়ায় নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। প্রতিবেদনের অগ্রগতি জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির একজন সদস্য জানান, প্রতিবেদনটি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।

সত্য চাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে’—শিক্ষকের অভিযোগ

তদন্ত প্রতিবেদনের প্রাথমিক কপি অভিযোগকারীদের হাতে না দেওয়া এবং তদন্তের ধীরগতিতে সচেতন মহলে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কলেজের এক শিক্ষক বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বিলম্ব করে সত্য ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তবে অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ার পরও যদি ঊর্ধ্বতন মহল প্রকৃত তথ্য গোপন করে, তাহলে শিক্ষক-কর্মচারীরা কঠোর আন্দোলনে নামতে প্রস্তুত।

ওই শিক্ষক আরও জানান, প্রতিবেদন প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছেন তারা। নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন না পেলে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে আবারও আন্দোলনে যাওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

অপসারণ ও বৈধ কমিটি গঠনের দাবি

একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লাখ লাখ টাকার কথিত নিয়োগ-বাণিজ্য, ফান্ড তছরূপ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে এলাকায় তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় সচেতন এলাকাবাসী, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা, অধ্যক্ষ আবু নাসির ও সভাপতি ইউসুফ হাসানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত এবং আরলিজা খাতুনের নিয়োগের বৈধতা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন।

একই সঙ্গে দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে একটি বৈধ ও পূর্ণাঙ্গ ম্যানেজিং কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন তারা।

এখন সংশ্লিষ্টদের অপেক্ষা—তদন্ত প্রতিবেদনে আসলে কী উঠে আসে এবং অভিযোগগুলোর বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নেয়।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
সারাবাংলা সর্বশেষ