বুধবার, ২৬শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১১ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ইয়াবা ডন বদির শিষ্য ও কিংফিশার বারের শেয়ারহোল্ডার? কাস্টমস কর্মকর্তা ওয়াসেক বিল্লাহর বিরুদ্ধে ঘুষ-চোরাচালান সিন্ডিকেটের গুরুতর অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার
আগস্ট ২৬, ২০২৬ ১:০৬ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) ওয়াসেক বিল্লাহ বর্তমানে ঢাকা কাস্টম হাউসে কর্মরত। চাকরিজীবনের শুরু থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ গ্রহণ এবং বিভিন্ন অনিয়মে জড়িত থাকার গুরুতর অভিযোগ উঠে আসছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই শিক্ষার্থী ২০১৮ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে যোগদানের পর থেকেই প্রভাবশালী একটি বলয় গড়ে তোলেন—এমন দাবি সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের।

ওয়াসেক বিল্লাহর গ্রামের বাড়ি নওগাঁয়। তিনি দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের এক সহযোগী অধ্যাপককে—যাঁর নাম গোপন রাখা হলো—বিয়ে করেছেন। তবে ব্যক্তিগত পরিচয়ের চেয়ে তাঁর কথিত রাজনৈতিক যোগাযোগ, প্রভাব বিস্তার এবং অবৈধ উপায়ে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগই এখন বেশি আলোচনায়।

অভিযোগ রয়েছে, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ওয়াসেক বিল্লাহ নিজেকে তৎকালীন প্রভাবশালী নেতা সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের আত্মীয় হিসেবে পরিচয় দিতেন। এই পরিচয় ও রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে ২০২০-২১ সালে তিনি ঢাকা এভ-এর সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ প্যানেল থেকে বাগিয়ে নেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

আরও অভিযোগ রয়েছে, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম মন্নু হাজরাকে ওয়াসেক বিল্লাহ ‘গুরু’ বলে সম্বোধন করতেন। এমনকি ছাত্র-জনতার জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আন্দোলন দমনে নজরুল ইসলাম মন্নু হাজরাকে তিনি অর্থের জোগান দিয়েছিলেন—এমন অভিযোগও সামনে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

তৎকালীন রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাব কাজে লাগিয়ে ওয়াসেক বিল্লাহ উত্তরার আলোচিত ‘কিংফিশার বার’-এর লাইসেন্স ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন করিয়ে নেন—এমন অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে বারটি তাঁর এক বন্ধুর নামে পরিচালিত হলেও কাস্টমস অঙ্গনে এর প্রকৃত মালিকানা ওয়াসেক বিল্লাহর—এমন দাবি ‘ওপেন সিক্রেট’ হিসেবে প্রচলিত রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য।

ওয়াসেক বিল্লাহর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের সূত্রপাত চট্টগ্রাম ভ্যাটের অধীন বান্দরবান সাব-ডিভিশনে কর্মরত থাকার সময় থেকে বলে জানা যায়। সেখানে তিনি তাঁর সহযোগী হিসেবে পরিচিত মানিক দত্তকে সঙ্গে নিয়ে স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ীদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতেন—এমন অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁরা নিয়মবহির্ভূতভাবে বিভিন্ন হোটেল ও রিসোর্টে অভিযান চালাতেন, গেস্ট রেজিস্টার ও গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র তল্লাশির নামে তছনছ করতেন এবং পর্যটকদের কক্ষে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করে হয়রানি করতেন। এসব অভিযানের আড়ালে ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হতো—এমন অভিযোগও রয়েছে।

ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানালে ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মামলা ও প্রশাসনিক হয়রানির ভয় দেখানো হতো বলে অভিযোগ। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২২ সালের ৫ এপ্রিল বান্দরবান হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন তৎকালীন জেলা প্রশাসক ইয়াছমিন পারভীন তিবরীজির কাছে ওয়াসেক বিল্লাহর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক স্মারকলিপি দিয়েছিল বলে জানা যায়।

বান্দরবানে বিতর্কিত ভূমিকার পর ওয়াসেক বিল্লাহ আরও প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন এবং তৎকালীন বিতর্কিত সংসদ সদস্য ও ‘ইয়াবা সম্রাট’ হিসেবে পরিচিত আব্দুর রহমান বদির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন—এমন অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, বদির রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে ওয়াসেক বিল্লাহ কৌশলগতভাবে টেকনাফ শুল্ক স্টেশনে পদায়ন লাভ করেন। আর সেখান থেকেই তাঁর কথিত চোরাচালান-সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড আরও বিস্তৃত হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, টেকনাফে কর্মরত থাকার সময় তিনি ইয়াবা চোরাচালান সিন্ডিকেটের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। কাঠের গুঁড়ি ও আচারের প্যাকেটের ভেতরে ইয়াবা পাচারের কাজে তিনি অন্যতম হোতা হিসেবে ভূমিকা পালন করতেন—এমন গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ এই প্রতিবেদনের আওতায় পাওয়া যায়নি।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কথিত মাদক কারবার ও অনিয়মের মাধ্যমে ওয়াসেক বিল্লাহ বিপুল অর্থের মালিক হয়েছেন এবং তাঁর নামে-বেনামে অবৈধ সম্পদের একটি বড় ভাণ্ডার গড়ে উঠেছে।

বর্তমানে প্রায় ১০ মাস ধরে ঢাকা কাস্টম হাউসে কর্মরত ওয়াসেক বিল্লাহর বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানটির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটকে ঘিরে প্রভাব বিস্তার এবং ঘুষের সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে।

তিনি এয়ারফ্রেইট ইউনিটের ‘ডেলিভারি গেট-১’ নিয়ন্ত্রণ করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এই গেট দিয়ে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার পণ্য খালাস হয়। অভিযোগ রয়েছে, এখান থেকে ওয়াসেক বিল্লাহ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ আদায় করেন।

আরও অভিযোগ করা হয়েছে, ‘মিথ্যা ঘোষণা’র আড়ালে বিপুল পরিমাণ মদ, মাদক ও নিষিদ্ধ পণ্য ‘ভিআইপি মর্যাদায়’ অবৈধভাবে খালাস করে দেওয়া হচ্ছে। এসব পণ্য তাঁর কথিত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ‘কিংফিশার বারে’ সরবরাহ করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এ দাবিরও স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।

এই কথিত সিন্ডিকেটে সহযোগী হিসেবে আরেক সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মোয়াজ্জেম হোসেনের নামও উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, সাধারণ ও বৈধ ব্যবসায়ীদের কাছে ওয়াসেক বিল্লাহ এখন আতঙ্কের নাম। বিভিন্ন ফাইলে স্বাক্ষর ও কাজ সম্পন্ন করার বিনিময়ে তিনি ১ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দাবি করেন এবং ঘুষ ছাড়া কোনো কাজ করেন না—এমন অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ব্যবসায়ী।

দুর্নীতি দমন কমিশন—দুদকে ভিউ ব্রিড বাংলাদেশ লিমিটেডের সিইও মহসিন হোসেনের দেওয়া একটি লিখিত অভিযোগের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, গত ছয় মাসে ওয়াসেক বিল্লাহ রাজস্ব ফাঁকি ও ঘুষের মাধ্যমে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, ঢাকা কাস্টমস হাউসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ওয়াসেক বিল্লাহ যথাযথ ঘোষণা ও আমদানি শর্ত প্রতিপালন ছাড়াই মিথ্যা ঘোষণায় বিভিন্ন পণ্য ‘ভিআইপি মর্যাদায়’ খালাস করে দিচ্ছেন।

এর ফলে সরকার প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে এবং এসব অবৈধ ও আমদানি নিষিদ্ধ পণ্যে বাজার সয়লাব হয়ে যাচ্ছে—এমন দাবি অভিযোগপত্রে করা হয়েছে।

মহসিন হোসেনের অভিযোগ অনুযায়ী, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কারণে বৈধ ব্যবসায়ীরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছেন এবং অনেক ব্যবসায়ী মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পথে বসার উপক্রম হয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, রাজস্ব ফাঁকির মাধ্যমে রাষ্ট্র যে বিপুল অর্থ হারাচ্ছে, তা অসাধু কাস্টমস কর্মকর্তা ও কথিত চোরাচালান সিন্ডিকেটের সদস্যদের পকেটে যাচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা কাস্টমস হাউসের এই সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা কাস্টমসের প্রচলিত নিয়মকানুন ও আইনকে উপেক্ষা করে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।

আমদানি নিষিদ্ধ, আমদানি শর্তযুক্ত এবং উচ্চ শুল্কের বিভিন্ন পণ্য কথিত চোরাচালান প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিয়মিত খালাস করে দেওয়ার ফলে রাষ্ট্রের বিপুল আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে—এমন অভিযোগও রয়েছে। একই সঙ্গে বৈধ ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির মুখে পড়ছেন বলে দাবি করা হয়েছে।

ওয়াসেক বিল্লাহর কথিত বিপুল অবৈধ সম্পদের একটি অংশের তথ্য রাজধানীর মিরপুরের বাউনিয়া মৌজায় রয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে ৩৬৪৯৭ নম্বর খতিয়ানে তাঁর নামে ৩৩ শতাংশ জমি কেনা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা কাস্টম হাউসের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, সাধারণ ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে ওয়াসেক বিল্লাহ যে কথিত প্রভাববলয় ও অনিয়মের কাঠামো গড়ে তুলেছেন, তা তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

তাঁদের মতে, কথিত চোরাচালান সিন্ডিকেটের সঙ্গে কারা জড়িত, তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি। একই সঙ্গে সাধারণ ব্যবসায়ীরা যাতে বৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন, সে জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষ থেকে পৃথক ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ওয়াসেক বিল্লাহর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

পরবর্তীতে খুদে বার্তার মাধ্যমে তাঁকে মোট ১৪টি প্রশ্ন পাঠানো হলেও তিনি কোনো প্রশ্নের উত্তর দেননি।

তবে প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে ইয়াবা চোরাচালান, কিংফিশার বারের মালিকানা, ঘুষের পরিমাণ, সম্পদের উৎস এবং রাজনৈতিক যোগাযোগসংক্রান্ত অভিযোগগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও নথিপত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। অভিযুক্ত কর্মকর্তা ওয়াসেক বিল্লাহর বক্তব্য পাওয়া গেলে এবং তদন্তের ফল প্রকাশ হলে বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।