নেপথ্যে কারা? ‘ম্যানেজ’ করে চলছে অবৈধ বাণিজ্য, গোপন ভিডিও দিয়ে ব্ল্যাকমেইলেরও অভিযোগ। ফাইল ফটো
রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান ও বনানীতে স্পা সেন্টার ও শীষা বারের আড়ালে মাদক সেবন, কেনাবেচা এবং যৌন ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের দাবি, দিনের বেলা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়মিতভাবে অনৈতিক কর্মকাণ্ড চলে। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, দালালচক্র ও বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে এসব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
অনুসন্ধানে গুলশান ও বনানী এলাকায় একাধিক স্পা সেন্টারের সন্ধান পাওয়া গেছে, যেগুলোর কয়েকটির বিরুদ্ধে মাদক ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সবকটির পক্ষে স্বাধীন ও নথিভিত্তিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে কোন প্রতিষ্ঠান বৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং কোনটির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বাস্তব ভিত্তি রয়েছে—তা নির্ধারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই প্রয়োজন।
তালাবদ্ধ দরজা, ফোনে প্রবেশ
বনানীর একটি স্পা সেন্টারকে ঘিরে অভিযোগ, বাইরে থেকে প্রতিষ্ঠানটি প্রায়ই বন্ধ দেখানো হয়। মূল ফটকে তালা ঝুলিয়ে রাখা হলেও নির্দিষ্ট ব্যক্তিরা ফোনে যোগাযোগ করলে ভেতরে প্রবেশের সুযোগ পান বলে স্থানীয়দের দাবি।
অভিযোগ রয়েছে, ভেতরে মাদক সেবনের পাশাপাশি অনৈতিক কর্মকাণ্ড চলে। তবে এসব দাবির সত্যতা যাচাই করতে প্রতিষ্ঠানটির সিসিটিভি ফুটেজ, কর্মচারীদের বক্তব্য, গ্রাহকদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের তথ্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
গুলশান-২-এর স্পা নিয়ে অভিযোগ
গুলশান-২-এর একটি ভবনের ফ্লোর ভাড়া নিয়ে পরিচালিত একটি কথিত স্পা সেন্টারের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয় কয়েকটি সূত্রের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটির আড়ালে মাদক সেবন ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড চলছে।
অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্টদের ‘ম্যানেজ’ করেই প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হচ্ছে। তবে এই দাবির স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা হয়নি।
একাধিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ
গুলশান ও বনানী এলাকায় মোট অন্তত ১২টি স্পা সেন্টারকে ঘিরে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কয়েকটির বিরুদ্ধে মাদক সেবন, মাদক কেনাবেচা এবং যৌন ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব প্রতিষ্ঠানের কিছু অংশ বাইরে থেকে সাধারণ স্পা বা পার্লার হিসেবে পরিচালিত হলেও নির্দিষ্ট সময়ে সেখানে ভিন্ন ধরনের কর্মকাণ্ড চলে।
তবে কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কেবল স্থানীয় অভিযোগ বা সূত্রের বক্তব্যের ভিত্তিতে অপরাধ সংঘটনের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন প্রত্যক্ষ প্রমাণ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নথি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য।
বনানীতে রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাবের অভিযোগ
বনানী কবরস্থানের আশপাশের একটি স্পা সেন্টারের বিরুদ্ধেও অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অতীতে একটি রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার পরিচয় ব্যবহার করতেন এবং বর্তমানে অন্য রাজনৈতিক পক্ষের নাম ভাঙিয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, স্পা সেন্টারটিতে ডিজিটাল লক ও একাধিক ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়। এসব নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রকৃত উদ্দেশ্য কী এবং সেগুলো আইনসঙ্গতভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না—তা যাচাই করা প্রয়োজন।
গোপন ক্যামেরা দিয়ে ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ
গুলশান-বনানীর কিছু স্পা সেন্টারকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো—গ্রাহকদের ব্যক্তিগত মুহূর্ত গোপনে ভিডিও ধারণ করে পরে তা ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল করা হয়।
অভিযোগকারীদের দাবি, স্পা সেন্টারে কর্মরত কিছু কর্মী কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা গ্রাহকদের ব্যক্তিগত মুহূর্ত ক্যামেরায় ধারণ করে রাখতে পারেন। পরে সেই ভিডিও দেখিয়ে অর্থ আদায় কিংবা অন্য কোনো সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে এই অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর হওয়ায় ভিডিও, ডিভাইস, ডিজিটাল ফরেনসিক তথ্য, ভুক্তভোগীর অভিযোগ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত ছাড়া তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
মাদক বাণিজ্যের অভিযোগ কতটা সত্য?
এসব প্রতিষ্ঠানে ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল ও মদ সেবন ও কেনাবেচার অভিযোগ উঠলেও প্রশ্ন হলো—এর পক্ষে প্রমাণ কোথায়?
কোনো স্পা সেন্টারে মাদক বেচাকেনা হলে সেখানে অভিযানের রেকর্ড, উদ্ধার তালিকা, মামলা, জব্দ করা মাদক, গ্রেপ্তারের তথ্য কিংবা আদালতের নথি থাকার কথা। একইভাবে যৌন ব্যবসার অভিযোগের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট থানায় কোনো মামলা, অভিযান বা অভিযোগ রয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
‘ম্যানেজ’ করে চলছে—কারা দিচ্ছে প্রশ্রয়?
অভিযোগগুলোর সঙ্গে বারবার উঠে আসছে ‘ম্যানেজ’ করার বিষয়টি। স্থানীয়দের দাবি, সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমঝোতা করেই কিছু প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে টিকে আছে।
কিন্তু এই দাবির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—কাদের ম্যানেজ করা হচ্ছে?
কোনো পুলিশ কর্মকর্তা, রাজনৈতিক ব্যক্তি, স্থানীয় প্রভাবশালী, বাড়ির মালিক কিংবা অন্য কারও সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকলে তার পক্ষে নির্দিষ্ট প্রমাণ প্রয়োজন। শুধু নাম বা পরিচয় উল্লেখ করে কাউকে অপরাধের সঙ্গে যুক্ত করা সাংবাদিকতার দৃষ্টিতে যথেষ্ট নয়।
প্রশাসনের নজরদারি কোথায়?
গুলশান ও বনানীর মতো গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক ও কূটনৈতিক এলাকার আশপাশে যদি নিয়মিত মাদক বেচাকেনা কিংবা সংঘবদ্ধ অপরাধের মতো কর্মকাণ্ড চলে, তাহলে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের নজরদারি কতটা কার্যকর—সেটিও বড় প্রশ্ন।
কোন কোন স্পা সেন্টারের বৈধ লাইসেন্স রয়েছে, তাদের ব্যবসার ধরন কী, নিয়মিত পরিদর্শন হয় কি না, গত কয়েক বছরে কোথায় অভিযান হয়েছে এবং কোনো মামলা হয়েছে কি না—এসব তথ্য যাচাই করলেই অভিযোগের বাস্তব চিত্র অনেকটা স্পষ্ট হতে পারে।
সামনে যে প্রশ্নগুলো
গুলশান-বনানীর স্পা সেন্টার ঘিরে ওঠা অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর এখন জরুরি—
১. অভিযোগ ওঠা স্পা সেন্টারগুলোর বৈধ লাইসেন্স ও ব্যবসায়িক অনুমোদন রয়েছে কি?
২. এসব প্রতিষ্ঠানে গত কয়েক বছরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো অভিযান হয়েছে কি?
৩. মাদক উদ্ধার, গ্রেপ্তার বা মামলা সংক্রান্ত কোনো সরকারি নথি রয়েছে কি?
৪. কোনো গ্রাহকের ব্যক্তিগত ভিডিও ধারণ বা ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগে মামলা হয়েছে কি?
৫. প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি বা অন্য কোনো মহলের আর্থিক বা সাংগঠনিক সম্পর্কের প্রমাণ রয়েছে কি?
৬. অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট থানা, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ কী বলছে?
অভিযোগের আড়ালে সত্য কতটা?
গুলশান ও বনানীর একাধিক স্পা সেন্টারকে ঘিরে মাদক, যৌন ব্যবসা, প্রভাব খাটানো এবং গোপন ভিডিও ধারণের মতো গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেলেও সব অভিযোগের সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
তাই কারও রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত পরিচিতি কিংবা স্থানীয়দের বক্তব্যের ভিত্তিতে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার বদলে প্রয়োজন নথি, মামলা, অভিযান, প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য, আর্থিক লেনদেন ও ডিজিটাল প্রমাণের সমন্বিত অনুসন্ধান।
প্রশ্ন এখন একটাই—অভিজাত এলাকার এসব স্পা সেন্টারের আড়ালে সত্যিই কোনো সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র সক্রিয়, নাকি অভিযোগের বড় একটি অংশই প্রমাণহীন গুঞ্জন? উত্তর মিলবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথি, মাঠপর্যায়ের তদন্ত এবং প্রমাণভিত্তিক অনুসন্ধানেই।
বিস্তারিত থাকবে পরবর্তী প্রতিবেদনে। চলবে…….
