মঙ্গলবার, ৬ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২১শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ছয় দশক ধরে বিনামূল্যে পাঠশালা, প্রধানমন্ত্রীর সম্মাননা পেলেন রমণী কান্ত

আগৈলঝাড়া ( বরিশাল) প্রতিনিধি
অক্টোবর ৫, ২০২৬ ১০:৪১ অপরাহ্ণ
Link Copied!

টিনের একচালা ঘরে তিন প্রজন্মের হাতেখড়ি, বিনিময়ে নেননি কোনো বেতন। ছবি: সংগৃহীত

মন্দির প্রাঙ্গণে টিনের একচালা একটি ঘর। নেই আধুনিক শ্রেণিকক্ষ, চেয়ার-টেবিল, বেঞ্চ কিংবা বেতনভুক্ত কোনো শিক্ষক। অথচ সেখানেই ছয় দশক ধরে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন একজন বৃদ্ধ। বয়সের ভারে শরীর ন্যুব্জ হলেও শিক্ষাদানের নেশায় এখনও ক্লান্ত হননি তিনি। দীর্ঘ ছয় দশক ধরে গ্রামের শিশুদের বিনামূল্যে পড়িয়ে আসছেন বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার রাজিহার ইউনিয়নের রাংতা গ্রামের রমণী কান্ত বেপারী। অবশেষে শিক্ষা ক্ষেত্রে তাঁর এই মহতী অবদানের স্বীকৃতি দিয়েছে সরকার।

বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে গতকাল রোববার দুপুরে ঢাকার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এক বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিক্ষক রমণী কান্ত বেপারীর গলায় পদক পরিয়ে দেন এবং নগদ দুই লাখ টাকার চেকসহ সম্মাননা সনদ তুলে দেন।

স্থানীয় মানুষের কাছে রমণী কান্ত বেপারী কেবল একজন শিক্ষক নন, তিনি সবার প্রিয় ‘রমণী স্যার’। প্রত্যন্ত রাংতা গ্রামের তিন প্রজন্মের হাতেখড়ি হয়েছে এই শিক্ষকের কাছে। শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষের কাছে তিনি অতি পরিচিত ‘রমণী স্যার’ নামে।

রমণী কান্ত নিজে যখন স্কুলের ছাত্র, তখনই এলাকার গরিব শিশুদের পড়ানো শুরু করেন। নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি শিশুদের পড়ানোর সেই যে সূচনা, বয়স ৭০ পেরিয়ে গেলেও তা আর থামেনি। সময়ের সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থা ও গ্রামের জীবনযাত্রার মান বদলালেও রাংতা গ্রামের এই ছোট্ট পাঠশালায় এখনও প্রতিদিন শোনা যায় কোমলমতি শিশুদের কলকাকলি।

১৯৭৩ সালে চাঁদশী ঈশ্বর চন্দ্র মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে মেট্রিক (এসএসসি) পাস করার পর সরকারি গৌরনদী কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন রমণী কান্ত। তবে পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোনো সম্ভব হয়নি তাঁর। মেধাবী হওয়ায় সে সময় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরির সুযোগ পেলেও তা গ্রহণ করেননি। গ্রামের শিশুদের প্রতি মায়া ও ভালোবাসার কারণে চাকরিতে না গিয়ে পাঠশালাতেই মনোনিবেশ করার সিদ্ধান্ত নেন।

রাজিহার-চাঁদশী সড়কের পাশে রাংতা সার্বজনীন দুর্গা মন্দিরের আঙিনাই হয়ে উঠেছে তাঁর পাঠশালা। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘রমণী কান্তের পাঠশালা’ নামে পরিচিত। গত শুক্রবার ব্যতীত সপ্তাহে প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত চলে শিশুদের পাঠদান।

রমণী কান্তের পাঠশালায় কোনো নির্দিষ্ট মাসিক বেতন নেই। গ্রামের দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা যাতে অর্থের অভাবে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়, এটাই রমণী কান্তের লক্ষ্য।

সাদামাটা জীবন, শিক্ষাদানেই পরম তৃপ্তি

রমণী কান্তের নিজের ব্যক্তিগত জীবনও খুবই সাদামাটা। স্ত্রী রুম্পা বেপারীকে নিয়ে বাড়িতে একটি দোচালা টিনের ঘরে বসবাস করেন। একমাত্র ছেলে তাপস বেপারী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। সামান্য কিছু কৃষিজমি রয়েছে তাঁর।

অভাব-অনটনের মাঝেও শিশুদের পড়ানোর আনন্দকেই তিনি জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি মনে করেন। দীর্ঘ ছয় দশক ধরে বিনিময়হীন এই শিক্ষাসেবা যেন তাঁর কাছে শুধু দায়িত্ব নয়, জীবনের ব্রত।

সম্মাননা প্রাপ্তি প্রসঙ্গে রমণী কান্ত বলেন, স্বাধীনতার আগে থেকেই এখানে বসে এলাকার শিশুদের পাঠদান করে আসছি। যতদিন বেঁচে আছি, এভাবেই শিশুদের মাঝে শিক্ষা বিলিয়ে যেতে চাই। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আমাকে যে সম্মাননা দিয়েছেন, তাতে আমার শিক্ষক জীবন সার্থক। বাকি জীবন মন্দির প্রাঙ্গণেই শিশুদের শিক্ষা দিয়ে কাটিয়ে দিতে চাই।

আগৈলঝাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিরুপম মজুমদার বলেন, রমণী কান্তের পাঠশালায় শিশু শিক্ষার্থীদের পাঠদান পদ্ধতি দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি। তাঁর মতো ভালো মানুষ সমাজে আছেন বলেই আমাদের দেশটা এত সুন্দর।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।