আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমনকে গুমের ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছিলেন কিসমৎ হায়াৎ। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ঠিকাদারি কাজ নিয়ে সামনে এসেছে আরেক চাঞ্চল্যকর চিত্র। অভিযোগ উঠেছে, জুলাই অভ্যুত্থানের পরও সংস্থাটির বড় অঙ্কের ঠিকাদারি কাজ পেয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা ও তাঁদের ঘনিষ্ঠদের নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। তাঁদের মধ্যে জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলার আসামিরাও রয়েছেন।
ডিএনসিসির ই-জিপি (ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৫ অক্টোবর পর্যন্ত এক বছর তিন মাসে সংস্থাটি মোট ২ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকার ঠিকাদারি কাজ দিয়েছে। এর মধ্যে পাঁচ আওয়ামী লীগ নেতার মালিকানাধীন বা তাঁদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছয়টি প্রতিষ্ঠান পেয়েছে ৮০৫ কোটি টাকার কাজ, যা ওই সময়ে দেওয়া মোট কাজের প্রায় ২৯ শতাংশ।
অন্যদিকে, কাজ পাওয়া ১৯৩টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ২৫টি প্রতিষ্ঠান পেয়েছে ১ হাজার ৯১০ কোটি টাকার কাজ—মোট বরাদ্দের প্রায় ৭০ শতাংশ। এ চিত্র সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতার পরিবেশ, দরপত্র মূল্যায়ন এবং ঠিকাদারি কাজের বণ্টন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলার আসামি, ডিএনসিসির বড় ঠিকাদার
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নোয়াখালী-১ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন যুবলীগের শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক আবদুল হাই। জুলাই অভ্যুত্থানের পর তিনি ভারতে পালিয়ে যান এবং পরে নেপালে যান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দেশে ফিরে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের মিছিল-মিটিংয়ে সক্রিয় হওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
২০২৫ সালের ৬ এপ্রিল রাজধানীর গুলিস্তান থেকে গ্রেপ্তার হন আবদুল হাই। তাঁর বিরুদ্ধে মুগদা থানায় জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলা রয়েছে। এ ছাড়া পল্টন মডেল থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দুটি মামলা করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, দেশকে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে গুলিস্তান ও পল্টন এলাকায় মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়া এবং অর্থ জোগানোর সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন।
মুগদা থানার মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকা সত্ত্বেও তা গোপন করে পল্টন থানার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় জামিনে মুক্তি পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।
আবদুল হাইয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড ডিএনসিসির বড় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে উঠে এসেছে। একই ঠিকানায় পরিচালিত এম এস আলিফ ট্রেডার্সের মাধ্যমেও প্রতিষ্ঠানটি একক ও যৌথভাবে বিভিন্ন দরপত্রে অংশ নিয়েছে।
একই ঠিকানায় একাধিক প্রতিষ্ঠান, ৩০২ কোটি টাকার কাজ
ডিএনসিসির নথি অনুযায়ী, আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড ও এম এস আলিফ ট্রেডার্স একক এবং যৌথভাবে ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৫ অক্টোবর পর্যন্ত ৫৭টি দরপত্রে মোট ৩০২ কোটি টাকার কাজ পেয়েছে।
নয়াপল্টনের ইনার সার্কুলার রোডের ৫০/১ নম্বর রিজ আহমেদ স্কয়ারের ১১ তলায় একই ফ্লোরে চারটি প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় রয়েছে বলে সরেজমিনে দেখা গেছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড, এম এস আলিফ ট্রেডার্স, জান্নাত ট্রেডার্স এবং ওয়াই অ্যান্ড এস ট্রেডিং। এসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নেওয়া হয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন থেকে।
এম এস আলিফ ট্রেডার্সের লাইসেন্সের মালিক হিসেবে নথিতে আবু বক্কর সিদ্দিকের নাম রয়েছে। তিনি আবদুল হাইয়ের ভাতিজা এবং তাঁর প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, ‘আমি চাচার কোম্পানিতে স্টাফ হিসেবে আছি। এম এস আলিফ ট্রেডার্সের লাইসেন্স আমার নামে করা। বাকি দুটি প্রতিষ্ঠানও আমাদের নামে।
একই ভবনের একই ফ্লোরে একাধিক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নেওয়ার বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের রাজস্ব কর্মকর্তা আতাহার আলী খান বলেন, ‘একই ভবনের একই ফ্লোর ব্যবহার করে একাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নেওয়া অনৈতিক। করপোরেশন থেকে এ ধরনের লাইসেন্স দেওয়া হয় না। এটি খতিয়ে দেখতে হবে যে তারা জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে একই ঠিকানায় একাধিক লাইসেন্স নিয়েছে কি না। এমন হয়ে থাকলে লাইসেন্স বাতিল করা হবে।
পাঁচ আওয়ামী লীগ নেতা, ছয় প্রতিষ্ঠানের কাজের হিসাব
ডিএনসিসির ঠিকাদারি কাজে আলোচনায় আসা পাঁচ আওয়ামী লীগ নেতার মালিকানাধীন বা সংশ্লিষ্ট ছয়টি প্রতিষ্ঠান হলো—মাইশা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড, এইচ এম হেলাল অ্যান্ড কোং লিমিটেড, আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড, এম এস আলিফ ট্রেডার্স, ইউটোফিয়া কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড এবং জনি এন্টারপ্রাইজ।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানের মালিক বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলা রয়েছে।
মাইশা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড: প্রতিষ্ঠানটির মালিক মোহাম্মদ পারভেজ কাফরুল থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। তাঁর বিরুদ্ধে মিরপুর মডেল থানায় জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলা রয়েছে। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি ১৩টি দরপত্রে ১৫৫ কোটি ৭২ লাখ টাকার কাজ পেয়েছে।
এইচ এম হেলাল অ্যান্ড কোং লিমিটেড: প্রতিষ্ঠানটির মালিক এইচ এম হেলাল। তিনি ডিএনসিসির ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিজান ওরফে পাগলা মিজানের ছোট ভাই। প্রতিষ্ঠানটি তাঁদের পারিবারিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর উত্তরা পশ্চিম থানায় হেলালের বিরুদ্ধে জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলা হয়। এ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ২৪টি দরপত্রে ১৮৭ কোটি ২৫ লাখ টাকার কাজ পাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
পাগলা মিজান ঢাকা-১৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানকের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। জুলাই অভ্যুত্থানের সময় মোহাম্মদপুর, আদাবর, শ্যামলী ও আসাদগেট এলাকায় ছাত্র-জনতার ওপর হামলায় তাঁর বাহিনীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলে তাঁর প্রভাব খাটিয়ে ডিএনসিসি ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে একচেটিয়া টেন্ডার বাণিজ্যের অভিযোগও রয়েছে এইচ এম হেলালের বিরুদ্ধে।
আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড ও এম এস আলিফ ট্রেডার্স: আবদুল হাইয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এ দুটি প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা একই। আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড এককভাবে ১২৮ কোটি ১১ লাখ টাকার কাজ পেয়েছে। অন্যদিকে, এম এস আলিফ ট্রেডার্স এককভাবে ১৯টি দরপত্রে ৩৬ কোটি টাকার কাজ পেয়েছে। যৌথভাবে দুই প্রতিষ্ঠান ১৪টি দরপত্রে ১৩৮ কোটি ১১ লাখ টাকার কাজ করেছে।
জনি এন্টারপ্রাইজ: প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী দিলীপ কুমার ঘোষ। ভাটারা থানায় দায়ের করা জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলার এজাহারে তাঁকে আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দিলীপ জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শ্যামল দত্তের ব্যবসায়িক অংশীদার বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি চারটি দরপত্রে ৯৯ কোটি ৮৬ লাখ টাকার কাজ পেয়েছে।
ইউটোফিয়া কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড: প্রতিষ্ঠানটির ৬০ শতাংশ শেয়ারের মালিক ফরিদ আহমেদ। তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সদস্য। বাকি ৪০ শতাংশ শেয়ার তাঁর স্ত্রী রামেহা আহমেদ রোজার নামে রয়েছে; তাঁকে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান করা হয়েছে। ফরিদের বিরুদ্ধে ভাটারা থানায় জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলা রয়েছে। চলতি অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ৬০ কোটি ৫৮ লাখ টাকার তিনটি দরপত্র পেয়েছে। গত ২ জুলাই একই দিনে তিনটি দরপত্রের চুক্তি হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলে মাল্টি ইন্টারন্যাশনাল নামের প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স ব্যবহার করে ফরিদ ঠিকাদারি করতেন বলেও তথ্য পাওয়া গেছে।
২ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকার কাজ, ২৫ প্রতিষ্ঠানের দখলে ৭০ শতাংশ
ই-জিপির তথ্য বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৫ অক্টোবর পর্যন্ত ডিএনসিসিতে ৫৬৮টি কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। এসব কাজের মোট মূল্য ২ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা।
এর মধ্যে ৫২৫টি দরপত্রে উন্মুক্ত দরপদ্ধতিতে (ওটিএম) ২ হাজার ৭৫৫ কোটি টাকার কাজ দেওয়া হয়েছে। সীমিত দরপদ্ধতিতে (এলটিএম) হয়েছে ৬৪ লাখ টাকার একটি কাজ। আর সিঙ্গেল সোর্স ও আরএফকিউ পদ্ধতিতে ৪২টি কাজের মূল্য ২০ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।
এসব দরপত্রে অংশ নিয়ে কাজ পেয়েছে ১৯৩টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ১০৪টি প্রতিষ্ঠান পেয়েছে মাত্র একটি করে কাজ। বাকি ৮৯টি প্রতিষ্ঠান একাধিক কাজ পেয়েছে। তাদের মধ্যে ২৫টি প্রতিষ্ঠান ২৪০টি দরপত্রে ১ হাজার ৯১০ কোটি টাকার কাজ পেয়েছে, যা মোট কাজের প্রায় ৭০ শতাংশ। এসব প্রতিষ্ঠানের একটি বড় অংশ আওয়ামী লীগ নেতা বা তাঁদের ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে—এইচ এম হেলাল অ্যান্ড কোং লিমিটেড ১৮৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা, মাইশা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড ১৫৫ কোটি ৭২ লাখ টাকা, আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড ১২৮ কোটি ১১ লাখ টাকা, সোহেল ইঞ্জিনিয়ারিং ১০৬ কোটি টাকা, জনি এন্টারপ্রাইজ ৯৯ কোটি ৮৬ লাখ টাকা, জামান কনসোর্টিয়াম ৯৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা এবং এমআর এন্টারপ্রাইজ ৮৪ কোটি ১১ লাখ টাকা।
জামান কনসোর্টিয়ামের মালিক মো. কামরুজ্জামান ভূঁইয়া আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রশাসক বদলেছে, ঠিকাদারি বণ্টনের চিত্র কতটা বদলেছে?
জুলাই অভ্যুত্থানের পর ডিএনসিসির প্রশাসকের দায়িত্ব পান মোহাম্মদ এজাজ। এরপর ২০২৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন বিএনপি নেতা শফিকুল ইসলাম মিল্টন। প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নতুন প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত ১ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকার ৩৩০টি দরপত্রের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
এর মধ্যে ২৮৯টি দরপত্রে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে ১ হাজার ৬৪৭ কোটি টাকার কাজ দেওয়া হয়। সিঙ্গেল সোর্স ও আরএফকিউ পদ্ধতিতে ২০ কোটি ৩৮ লাখ টাকার ৪১টি কাজ দেওয়া হয়েছে। এই সময়ে ২৫টি প্রতিষ্ঠান ১১৭টি দরপত্রে ১ হাজার ১৪৬ কোটি টাকার কাজ পেয়েছে, যা মোট কাজের প্রায় ৭০ শতাংশ।
এ সময় মাইশা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড ১২টি দরপত্রে ১৪৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকার কাজ পেয়েছে। এইচ এম হেলাল অ্যান্ড কোং লিমিটেড ১৪টি দরপত্রে ১২৬ কোটি টাকার এবং আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড ১৮টি দরপত্রে ৮৮ কোটি ৮৯ লাখ টাকার কাজ পেয়েছে।
আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড ও এম এস আলিফ ট্রেডার্স যৌথভাবে সাতটি দরপত্রে ৮০ কোটি ৬১ লাখ টাকার কাজ করেছে। এম এস আলিফ ট্রেডার্স এককভাবে ১৪টি দরপত্রে পেয়েছে ৩১ কোটি টাকার কাজ। মেসার্স শহীদ ব্রাদার্স আটটি দরপত্রে ৫৫ কোটি ৪৭ লাখ টাকার কাজ পেয়েছে।
এ ছাড়া নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেড পাঁচটি দরপত্রে ৫২ কোটি ৮৬ লাখ টাকার কাজ পেয়েছে। এমআর এন্টারপ্রাইজ তিনটি দরপত্রে ৫২ কোটি ১২ লাখ টাকার, সোহেল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেড পাঁচটিতে ৪৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকার, জামান কনসোর্টিয়াম লিমিটেড পাঁচটিতে ৪৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকার এবং ইয়াসিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার প্রাইভেট লিমিটেড পাঁচটিতে ৪৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকার কাজ পেয়েছে।
অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মেসার্স লরিন এন্টারপ্রাইজ ছয়টি দরপত্রে ৩৪ কোটি ১৯ লাখ টাকা, হৃদয় কনস্ট্রাকশন লিমিটেড পাঁচটিতে ২৬ কোটি ১৩ লাখ টাকা, এসএবি-ওয়াইআইপিএল যৌথ উদ্যোগ একটি দরপত্রে ২৫ কোটি ২৪ লাখ টাকা, এস এম রহমান ইন্টারন্যাশনাল চারটি দরপত্রে ২৫ কোটি টাকা, আরএনএল-এইচটিবিএল যৌথ উদ্যোগ একটি দরপত্রে ২৪ কোটি ৭৯ লাখ টাকা এবং জনি এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড একটি দরপত্রে ২৪ কোটি ৪০ লাখ টাকার কাজ পেয়েছে।
এ পরিসংখ্যান বলছে, প্রশাসক পরিবর্তনের পরও অল্পসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের হাতে বড় অঙ্কের ঠিকাদারি কাজ কেন্দ্রীভূত থাকার চিত্র উঠে এসেছে। তবে শুধু কাজের পরিমাণ বা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার তথ্য দিয়ে দরপত্রে অনিয়ম প্রমাণিত হয় না; এর জন্য প্রতিটি দরপত্রের নথি, মূল্যায়ন প্রতিবেদন ও চুক্তির শর্ত যাচাই প্রয়োজন।
ই-জিপির দরপত্রে ডিজিটাল কারসাজির অভিযোগ
ডিএনসিসি সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ আমলে গড়ে ওঠা প্রকৌশলী ও ঠিকাদারদের একটি সিন্ডিকেট এখনো সক্রিয়। জুলাই অভ্যুত্থানের পর দুজন প্রশাসক দায়িত্ব পালন করলেও তাঁদের সময়ে ওই চক্রের প্রভাব পুরোপুরি দূর হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিএনসিসির সাতজন ঠিকাদার ও প্রকৌশলী দাবি করেছেন, ই-জিপি ব্যবস্থায় দরপত্র মূল্যায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে কারসাজির সুযোগ নেওয়া হয়। তাঁদের অভিযোগ, দরপত্র খোলার পর টেন্ডার ডেটা শিট (টিডিএস) অনুযায়ী যোগ্যতা যাচাইয়ের সময় অনানুষ্ঠানিকভাবে এক্সেল শিটে এসএলটি পরিমাপ করা হয়। পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে কোনো কোনো যোগ্য প্রতিযোগীকে টিডিএসের ছোটখাটো শর্ত পূরণ না করার অজুহাতে বাদ দেওয়া হয়।
তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, এরপর প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা ঠিকাদারদের এসএলটি পরিমাপ করে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে রাখা হয়। এ ছাড়া প্রাক্কলিত দর আগাম জেনে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দরপত্রে অংশ নেওয়ার অভিযোগও করেছেন তাঁরা। এতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দর এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়, যাতে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানটির কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায় বলে তাঁদের দাবি।
ঠিকাদার ও প্রকৌশলীদের অভিযোগ, দরপত্রে চাওয়া শর্ত, নিরীক্ষা প্রতিবেদন, সরাসরি যাচাইয়ের কোড এবং যন্ত্রপাতির তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রেও অনিয়ম হতে পারে। দরপত্র জমার দিনে ন্যাশনাল পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির (এনপিপিএ) তথ্যের ভিত্তিতে ঠিকাদার ও ক্রয়কারী সংস্থার প্রতিনিধিরা সম্ভাব্য দর সম্পর্কে ধারণা নিয়ে কাছাকাছি দর নির্ধারণ করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
যোগ্যতা যাচাইয়েও অনিয়মের অভিযোগ
প্রতিষ্ঠানের টেন্ডার ক্যাপাসিটি বা কাজ করার আর্থিক ও কারিগরি সক্ষমতা যাচাই নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ঠিকাদার ও প্রকৌশলীরা। তাঁদের দাবি, কিছু ক্ষেত্রে অনুরূপ কাজের সক্ষমতা (সিমিলার ক্যাপাসিটি) পূরণ না হলেও সাধারণ সক্ষমতা বিবেচনায় নেওয়া হয়। আবার কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত সক্ষমতা বেশি থাকা সত্ত্বেও দরপত্রে তার অর্ধেক বা তার চেয়েও কম দেখানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এসব পদ্ধতি ব্যবহার করে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে তাঁদের বক্তব্য। তবে অভিযোগগুলোর স্বাধীন যাচাই, নির্দিষ্ট দরপত্রের নথি পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ছাড়া এগুলোকে প্রমাণিত অনিয়ম হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
অভিযোগ অস্বীকার ডিএনসিসি প্রশাসকের
দরপত্রে কারসাজির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টন বলেন, ‘সিটি করপোরেশনে দরপত্রের কার্যক্রম ইজিপিতে হয়। এখানে যারা এসএলটিতে ও টিডিএসে এগিয়ে থাকে তারা কাজ পায়। কোনো ধরনের ম্যানিপুলেশনের সুযোগ থাকে না। অনেক সময় যেসব ঠিকাদার যোগ্যতার অভাবে কাজ পায় না তারা ম্যানিপুলেশনের অভিযোগ তোলেন।’
ডিএনসিসি প্রশাসকের বক্তব্য অনুযায়ী, দরপত্রের কার্যক্রম ই-জিপি ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয় এবং যোগ্যতার ভিত্তিতেই কাজ দেওয়া হয়। অন্যদিকে, ঠিকাদার ও প্রকৌশলীদের অভিযোগ এবং অল্পসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের হাতে বিপুল অঙ্কের কাজ কেন্দ্রীভূত হওয়ার তথ্য দরপত্র মূল্যায়ন ও বরাদ্দপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।
সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকানা, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, মামলার বর্তমান অবস্থা এবং প্রতিটি দরপত্রের মূল্যায়নপ্রক্রিয়া স্বাধীনভাবে যাচাই করা হলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হতে পারে।
