সৌদি আরবের রিয়াদে বিমানবন্দরে হামলার পর নিখোঁজ বগুড়ার শাহেদ আহমেদ আশিক; দূতাবাসের তথ্যে মৃত্যুর খবর, এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি পরিবার।শাহেদ আহমেদ আশিক। ফাইল ছবি
জেদ্দায় পৌঁছে ফোন দেব। সৌদি আরবের রিয়াদে পৌঁছে স্ত্রীকে শেষবারের মতো এই কথাটিই বলেছিলেন বগুড়ার শাহেদ আহমেদ আশিক। স্বামীর সেই ফোনের অপেক্ষায় ছিলেন স্ত্রী। সময় গড়িয়েছে, কেটে গেছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা—কিন্তু আর বেজে ওঠেনি তাঁর ফোন। একসময় অপেক্ষার প্রহর ভেঙে পরিবারের কাছে পৌঁছেছে স্বামীর মৃত্যুর খবর। তবু সেই খবরের সত্যতা নিশ্চিত হতে না পেরে এখনো অনিশ্চয়তা আর উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে স্বজনদের।
সৌদি আরবের রিয়াদে বিমানবন্দরে হামলার ঘটনায় শাহেদ নিহত হয়েছেন বলে বাংলাদেশ দূতাবাস পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে। তবে তাঁর পরিবারের সদস্যরা বলছেন, এখনো তাঁরা মৃত্যুর বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাননি। প্রিয়জনের এমন খবরে একদিকে শোকের আশঙ্কা, অন্যদিকে সামান্য আশার আলো আঁকড়ে ধরে অপেক্ষা—সব মিলিয়ে পরিবারটিতে নেমে এসেছে গভীর উদ্বেগ।
শাহেদ আহমেদ আশিক বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার মাদলা এলাকার শফিকুল ইসলামের ছেলে। রোববার সন্ধ্যায় তাঁর পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রায় এক মাসের ছুটি কাটিয়ে গত শুক্রবার সৌদি আরবের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন তিনি। রিয়াদ হয়ে তাঁর জেদ্দায় যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই যাত্রা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থেমেছে, তা জানতে এখনো অপেক্ষা করতে হচ্ছে পরিবারকে।
শেষ ফোনে ছিল আশ্বাস, এরপর শুধুই অপেক্ষা
শাহেদের ভাই মাসুম রানা জানান, গত শুক্রবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে সৌদি আরবের উদ্দেশে রওনা হন তাঁর ভাই। রাত দুইটার দিকে তাঁর ফ্লাইট ছিল। রিয়াদে পৌঁছানোর পর স্ত্রীর সঙ্গে কথা হয় শাহেদের। তিনি জানিয়েছিলেন, জেদ্দায় পৌঁছাতে আরও প্রায় দেড় ঘণ্টা লাগবে। সেখানে পৌঁছেই আবার ফোন করবেন বলেও আশ্বাস দিয়েছিলেন।
কিন্তু সেই ফোন আর আসেনি। এরপর থেকে শাহেদের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ বাড়তে থাকে স্বজনদের মধ্যে। পরে রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার খবর ছড়িয়ে পড়লে তাঁদের উৎকণ্ঠা আরও বেড়ে যায়।
মাসুম রানা বলেন, ‘আমরা খুব দুশ্চিন্তার মধ্যে আছি। সরকারের কাছে আমাদের বিনীত অনুরোধ, আমার ভাইয়ের বিষয়ে সঠিক তথ্য জানার ব্যবস্থা করা হোক। কোনো দুর্ঘটনা ঘটে থাকলে নিরাপদ অবস্থায় আমাদের কাছে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানাচ্ছি।’
একটি ফোনকলের প্রতীক্ষা থেকে শুরু হওয়া এই উৎকণ্ঠা এখন পরিবারের জন্য অসহনীয় অনিশ্চয়তায় রূপ নিয়েছে। তাঁরা চান, শাহেদের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে দ্রুত নির্ভরযোগ্য তথ্য জানানো হোক।
১৮ বছর ধরে সৌদি আরবে, স্ত্রী ও দুই সন্তান অপেক্ষায়
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, শাহেদ প্রায় ১৮ বছর ধরে সৌদি আরবে বসবাস করছেন। তাঁর বাবা শফিকুল ইসলামও ২৫ বছর ধরে দেশটিতে থাকেন। কয়েক দিন আগে শাহেদের মা শাহেরা আক্তার ওমরাহ পালনের জন্য সৌদি আরবে গেছেন।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, শাহেদ নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর বাবা-মায়ের সঙ্গেও যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছিল না। ফলে দেশের বাড়িতে থাকা স্বজনদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
শাহেদের স্ত্রী ও দুই ছেলে রয়েছে। পরিবারের উপার্জন ও ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষটির এমন পরিণতির খবর তাঁদের জন্য গভীর বেদনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে মৃত্যুর খবর নিশ্চিত না হওয়ায় এখনো তাঁরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারছেন না। স্বজনদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত তাঁর অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য জানাবে।
দূতাবাসের তথ্যে মৃত্যুর খবর, নিশ্চিত হতে পারেনি পরিবার
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব না হলেও রোববার দুপুরে রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাস পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে, বিমানবন্দরে হামলায় নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে বগুড়ার শাহেদ রয়েছেন।
তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও পুলিশের বক্তব্যেও এখনো মৃত্যুর বিষয়ে নিশ্চিত তথ্যের অভাব উঠে এসেছে।
মাদলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আতিকুর রহমান বলেন, বিভিন্ন মাধ্যমে তাঁরা জানতে পেরেছেন, শাহেদ হামলায় মারা গেছেন। তবে তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি সরকারিভাবে নিশ্চিত হতে পারেননি।
শাজাহানপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশিক ইকবাল জানান, বিষয়টি তিনি মানুষের মুখে শুনেছেন। তবে শাহেদের নিহত হওয়ার বিষয়ে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত কোনো তথ্য পাননি। সরকারি পর্যায় থেকেও এ বিষয়ে কোনো বার্তা পাওয়া যায়নি। সঠিক তথ্য জানতে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।
হামলায় বাংলাদেশিসহ ১২ জন নিহতের খবর
প্রসঙ্গত, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে সৌদি আরবের রিয়াদে বিমানবন্দরে হামলার ঘটনায় বাংলাদেশিসহ ১২ জন নিহত হওয়ার তথ্য জানানো হয়।
এ ঘটনায় শাহেদের মৃত্যুর খবর সামনে আসার পর তাঁর পরিবারের সদস্যরা দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। দূতাবাসের দেওয়া তথ্য, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের অবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের মধ্যে সমন্বয় করে তাঁর প্রকৃত অবস্থা নিশ্চিত করা এখন জরুরি।
যে মানুষটি স্ত্রীকে বলেছিলেন, জেদ্দায় পৌঁছে ফোন দেব, তাঁর সেই প্রতিশ্রুতির অপেক্ষায় এখন একটি পরিবার। ফোনের ওপাশে পরিচিত কণ্ঠটি আর শোনা যাবে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা। তাই শোকের আশঙ্কার মধ্যেও স্বজনদের একটাই আকুতি—গুজব নয়, তাঁরা চান শাহেদের বিষয়ে নিশ্চিত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য।
