নির্মাণ ব্যয় বেড়ে ১ লাখ ৫২ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা, জাইকার ঋণে সুদ ৩.৫০ শতাংশ—নতুন হারে অতিরিক্ত গুনতে হবে ৬৮৭ কোটি টাকা।
রাজধানীর যানজট নিরসন ও আধুনিক গণপরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার স্বপ্ন নিয়ে নেওয়া মেট্রোরেল লাইন-১ ও লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্প এখন বড় আর্থিক চ্যালেঞ্জের মুখে। নির্মাণ ব্যয়ের ব্যাপক বৃদ্ধি, জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া এবং ক্রমবর্ধমান সুদের হার—সব মিলিয়ে প্রকল্প দুটির আর্থিক বোঝা ক্রমেই ভারী হচ্ছে।
প্রকল্প দুটির সংশোধিত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫২ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা। ২০১৯ সালে অনুমোদনের সময় যে ব্যয় ধরা হয়েছিল, তার তুলনায় বেড়েছে প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে জাইকার ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ১২২ শতাংশ। নতুন করে সুদের হার বাড়ায় শুধু ঋণের সুদ বাবদই অতিরিক্ত ৬৮৭ কোটি টাকা গুনতে হবে।
রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল লাইন-১ এবং সাভারের হেমায়েতপুর থেকে ঢাকার ভাটারা পর্যন্ত লাইন-৫ (উত্তর) নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে প্রকল্প দুটি বাস্তবায়নে ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি ঋণ পরিশোধের শর্তও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সুদের হার বাড়ল ৩.৫০ শতাংশে
জাইকার ঋণের সুদের হার গত ১ অক্টোবর থেকে বেড়ে হয়েছে ৩ দশমিক ৫০ শতাংশ। এর আগে হারটি ছিল ৩ দশমিক ০৫ শতাংশ। ২০১৯ সালে প্রকল্প দুটি অনুমোদনের সময় লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্পের ঋণে সুদের হার ছিল শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ এবং লাইন-১ প্রকল্পের ক্ষেত্রে শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ।
প্রাথমিক ঋণচুক্তিতে নির্ধারিত সুদের হার পরবর্তী সময়ে বাড়তে থাকায় প্রকল্প দুটির আর্থিক হিসাবও বদলে যাচ্ছে। জাইকার ঋণের সুদের হার সাধারণত ছয় মাস পরপর পুনর্নির্ধারণ করা হয়। ফলে পাঁচ বছরের নির্মাণকালে সুদের হার আরও বাড়লে প্রকল্পের ব্যয় ও ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গত ১ সেপ্টেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে অনুমোদিত সংশোধিত ব্যয় অনুযায়ী, দুই প্রকল্পের মোট ব্যয় ৯৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫২ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা হয়েছে।
সুদ না বাড়ানোর অনুরোধ, সাড়া দেয়নি জাইকা
ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি ঠেকাতে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) জাইকার কাছে লিখিত অনুরোধ জানিয়েছিল। গত ১ জুলাই জাইকা প্রেসিডেন্ট ড. তানাকা আকিহিকোর ঢাকা সফরের সময়ও সরকারের শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে বিষয়টি তুলে ধরা হয়। তবে জাইকার পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি।
এশিয়া উইংয়ের শীর্ষ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, ‘আমরা জাপানকে সুদের হার না বাড়ানোর অনুরোধ করেছিলাম। জাপানের রিকন্ডিশন্ড বা ব্যবহৃত গাড়ির সবচেয়ে বড় বাজার হিসেবে বাংলাদেশের দাবিটি আলাদা করে বিবেচনার কথাও বলা হয়। কিন্তু ঋণদাতা সংস্থাটি আমাদের অনুরোধ রাখেনি। নতুনভাবে আরোপিত সুদের হারেই ঋণ নেওয়া ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই।
জানা গেছে, জাইকার ঋণে বাড়তি সুদের হার এড়ানোর উদ্দেশ্যে তড়িঘড়ি করে একনেক বৈঠকে মেট্রোরেল লাইন-১ ও লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্পের সংশোধন অনুমোদন করা হয়। ওই দিনের একনেক বৈঠকের কার্যতালিকায় প্রকল্প দুটি ছিল না।
প্রকল্প দুটি যাচাই-বাছাই করে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ। বিভাগের শীর্ষ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, একনেক বৈঠকের আগের দিন অফিস শেষ হওয়া পর্যন্ত প্রকল্প দুটি নিয়ে কোনো আলোচনা ছিল না। বাড়ি ফেরার পর ওই রাতেই একনেক বৈঠকে অনুমোদনের জন্য প্রস্তাব তৈরি করে দিতে বলা হয়।
একনেক বৈঠক-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি স্বীকার করেন, কম সুদের হারে চুক্তিটি চূড়ান্ত করতে সরকার তড়িঘড়ি করে প্রকল্প সংশোধন করেছে।
জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন জাপান সফরেও মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় ও ঋণের সুদের বিষয়টি আলোচনায় থাকতে পারে।
পুরোনো ঋণচুক্তি, নতুন ঋণে বাজারদর
২০১৯ সালে মেট্রোরেল লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্পের জন্য শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ সুদে ১৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং লাইন-১ প্রকল্পের জন্য শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ সুদে ১৩ হাজার ৬২৬ কোটি টাকার প্রাথমিক ঋণচুক্তি সই হয়।
তবে প্রকল্প দুটির অবশিষ্ট ঋণের সুদের হার ও শর্ত আগে থেকে নির্দিষ্ট করা হয়নি। ফলে বাড়তি ঋণ বর্তমান বাজারদরের সুদে নিতে হচ্ছে। এতে প্রাথমিকভাবে কম সুদের ঋণ পাওয়ার সুবিধা থাকলেও প্রকল্পের পরবর্তী পর্যায়ে ব্যয়বহুল ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
লাইন-১: ঋণ বেড়েছে ৪৪ হাজার ৩৯৩ কোটি টাকা
একনেকে সাম্প্রতিক সংশোধনের পর মেট্রোরেল লাইন-১ প্রকল্পে জাইকার ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ১১৩ শতাংশ। অতিরিক্ত ঋণের পরিমাণ ৪৪ হাজার ৩৯৩ কোটি টাকা।
প্রথম অনুমোদনের সময় প্রকল্পটিতে জাইকার ঋণ ছিল ৩৯ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। সংশোধনের পর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩ হাজার ৮৪৩ কোটি টাকা। প্রকল্পটির মোট বাস্তবায়ন ব্যয়ও বেড়েছে ১১৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ। মূল ব্যয় ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা।
এমআরটি লাইন-১-এর দুটি রুট নির্ধারণ করা হয়েছে। একটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত, অন্যটি নতুন বাজার থেকে পূর্বাচল টার্মিনাল ও পিতলগঞ্জ ডিপো পর্যন্ত।
বিমানবন্দর-কমলাপুর রুটটি হবে ভূগর্ভস্থ বা পাতাল। প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পথে থাকবে ১২টি স্টেশন। স্টেশনগুলো হলো—বিমানবন্দর, বিমানবন্দর টার্মিনাল-৩, খিলক্ষেত, নর্দ্দা, নতুন বাজার, উত্তর বাড্ডা, বাড্ডা, আফতাবনগর, রামপুরা, মালিবাগ, রাজারবাগ ও কমলাপুর।
লাইন-৫ (উত্তর): ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ১৩২ শতাংশ
মেট্রোরেল লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্পেও ঋণের বোঝা বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। সংশোধনের পর জাইকার ঋণ বেড়েছে ১৩২ শতাংশ। অতিরিক্ত ঋণের পরিমাণ ৩৯ হাজার ৮১৪ কোটি টাকা।
২০১৯ সালে প্রকল্পটির মূল অনুমোদনের সময় জাইকার ঋণ ছিল ২৯ হাজার ১১৭ কোটি টাকা। সংশোধনের পর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৮ হাজার ৯৩১ কোটি টাকা।
প্রকল্পটির মোট ব্যয়ও বেড়েছে ১১৮ শতাংশ। মূল ব্যয় ৪১ হাজার ২৩৯ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৮৯ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা।
হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথ নির্মাণের উদ্দেশ্য ঢাকার পশ্চিম ও পূর্ব অংশের মধ্যে গণপরিবহন যোগাযোগ সহজ করা। প্রকল্পটিতে মোট ১৪টি স্টেশন থাকবে। এর মধ্যে ৯টি পাতাল এবং পাঁচটি উড়াল স্টেশন।
পাতাল স্টেশনগুলো হলো—হেমায়েতপুর, বলিয়ারপুর, বিলমালিয়া, আমিনবাজার, গাবতলী, দারুস সালাম, মিরপুর-১, মিরপুর-১০ ও সিরামিকস। উড়াল স্টেশনগুলো হলো—কচুক্ষেত, বনানী, গুলশান-২, নতুন বাজার ও ভাটারা।
এ ছাড়া অন্য মেট্রোরেল লাইনের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
ঋণ পরিশোধের আগে আয় নিশ্চিত করা জরুরি
প্রকল্পের ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি ঋণ পরিশোধের সময়সূচি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, ঋণচুক্তির আগে ‘ম্যাচিং অ্যান্ড ম্যাচিউরিটি’ নিশ্চিত করা দরকার। কিস্তি শুরুর আগে প্রকল্প থেকে আয় আসবে কি না, সেটিও বিবেচনা করা উচিত। প্রকল্প থেকে আয় আসার আগেই মূল ঋণের কিস্তি শুরু হলে তা বিপদের কারণ হতে পারে।
তিনি মনে করেন, সময়মতো মানসম্পন্ন নির্মাণকাজ শেষ করা এবং প্রত্যাশিত সেবা নিশ্চিত করে বাণিজ্যিক মুনাফা অর্জন করা না গেলে দুই মেট্রোরেলের বড় ঋণ ও বর্ধিত সুদের হার দেশের জন্য বাড়তি ঋণের বোঝা হয়ে উঠতে পারে। তবে বাণিজ্যিক মুনাফা নিশ্চিত করা গেলে এ নিয়ে সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
উন্নয়ন ঋণে বাড়ছে বাজারভিত্তিক সুদ
বাংলাদেশ ২০১৫ সালে নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পর উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণে সুদের হার বাড়তে শুরু করে। ২০২২ সাল পর্যন্ত এ হার গড়ে শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ ছিল। এরপর করোনার অভিঘাতে আন্তর্জাতিক বাজারে ঋণের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জাইকাসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর ঋণেও সুদের হার বাড়ছে।
ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত জাইকার ঋণে সুদের হার ছিল শূন্য দশমিক ১ শতাংশ। সেই সুদও শেষ পর্যন্ত মওকুফ করে দেওয়া হতো। তবে জাপানের সার্বিক পরিস্থিতির কারণে দেশটি এখন সুদের হার বাড়াচ্ছে।
ইআরডির আমেরিকা ও জাপান অনুবিভাগের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, বাংলাদেশ সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে যে হারে ঋণ নেয়, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উন্নয়ন সহযোগীরা সুদের হার নির্ধারণ করছে। সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও তারা বিবেচনায় নেয়। জাইকাও একই পদ্ধতিতে সুদের হার নির্ধারণ করছে।
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণকে কেন্দ্র করে নমনীয় ঋণ কমছে, বাড়ছে বাজারভিত্তিক ঋণ। এ ধরনের ঋণের জন্য বাংলাদেশকে এখন গড়ে ৬ শতাংশ সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে।
মেট্রোরেলের স্বপ্ন, ঋণ পরিশোধের কঠিন হিসাব
ঢাকার যানজট কমানো, যাতায়াতের সময় বাঁচানো এবং নগরবাসীকে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন দেওয়ার লক্ষ্যেই মেট্রোরেল প্রকল্পগুলো নেওয়া হয়েছে। কিন্তু নির্মাণ ব্যয় ও ঋণের সুদ যেভাবে বাড়ছে, তাতে প্রকল্পগুলোর আর্থিক টেকসইতা নিশ্চিত করা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ শেষ করলেই প্রকল্পের সাফল্য নিশ্চিত হবে না। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা, মানসম্মত সেবা চালু করা, যাত্রীসংখ্যা ও আয় বাড়ানো এবং ঋণ পরিশোধের সময়সূচির সঙ্গে প্রকল্পের আয়ের সামঞ্জস্য রাখা জরুরি।
অন্যথায়, যানজট কমানোর স্বপ্ন বাস্তবায়নের পাশাপাশি মেট্রোরেলের বিপুল ঋণ ও সুদের দায় ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করতে পারে।
