শুক্রবার, ১১ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৭শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

তিতাসের এমডি শাহনেওয়াজ পারভেজের বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার
সেপ্টেম্বর ১১, ২০২৬ ১:৩৯ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

গ্যাস সংকটে জনজীবন ও শিল্পে অচলাবস্থা—নতুন সংযোগ ও লোড বৃদ্ধিতে ৭৫০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ, ১,৫০০ অবৈধ সংযোগে মাসে ৩০ কোটি টাকার বাণিজ্য। ফাইল ছবি

রান্নার চুলার দুর্ভোগ থেকে শুরু করে ভারী শিল্পকারখানার চাকা বন্ধ হওয়ার উপক্রম—দেশজুড়ে তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে গ্যাস সংকট। দৈনিক প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ নেমে এসেছে ২ হাজার ১১৪ থেকে ২ হাজার ১৫১ মিলিয়ন ঘনফুটে। ভয়াবহ এই ঘাটতির কারণে শিল্পকারখানার উৎপাদন সক্ষমতা নেমে এসেছে ২০ থেকে ৫০ শতাংশে। একই সঙ্গে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে দেখা দিয়েছে বিদ্যুৎ ও সার সংকট।

আকস্মিক এই গ্যাস সংকটের পেছনে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি, এলএনজি আমদানিতে প্রতিবন্ধকতা এবং আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতিকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও, এর পাশাপাশি তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির অভ্যন্তরীণ অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করে উঠেছে গুরুতর অভিযোগ।

তিতাসের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, প্রতিষ্ঠানটির আওতাভুক্ত এলাকায় দৈনিক প্রায় ২০০ কোটি (২ বিলিয়ন) ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হলেও সরবরাহ মিলছে ১৫০ কোটি (১.৫ বিলিয়ন) ঘনফুটেরও কম। বিতরণ নেটওয়ার্কের একেবারে শেষ প্রান্তে অবস্থানের কারণে ঢাকার মোহাম্মদপুর, মিরপুর, ধানমন্ডিসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা দিনের বড় একটি সময় চুলায় গ্যাস পাচ্ছেন না। এর সঙ্গে পাইপলাইনের ছিদ্র ও ফাটল দিয়ে পানি ঢুকে সংকটকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।

এমন এক সংকটময় পরিস্থিতির মধ্যেই তিতাস গ্যাসের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শাহনেওয়াজ পারভেজের বিরুদ্ধে উঠেছে হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য ও অবৈধ নিয়োগের নথিভিত্তিক অভিযোগ। অভিযোগগুলো ঘিরে প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে-বাইরে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।

নিয়োগ নিয়েও গুরুতর অভিযোগ

অভিযোগে বলা হয়েছে, কোনো লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই ১৯৯৯ সালে আওয়ামী লীগের প্রভাব খাটিয়ে পেট্রোবাংলায় প্রথম শ্রেণির চাকরিতে নিয়োগ পান শাহনেওয়াজ পারভেজ। বিদেশি তিন বছরের বিটেক ডিগ্রি নিয়ে চাকরিতে যোগ দিলেও সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কোনো ইকুইভ্যালেন্সি সার্টিফিকেট জমা দেননি তিনি—যা পেট্রোবাংলার চাকরিবিধির পরিপন্থী বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরবর্তীতে দীর্ঘ ২৩ বছর একই বিভাগে, অর্থাৎ কন্ট্রাক্ট বিভাগে নিয়মবহির্ভূতভাবে কর্মরত থেকে তিনি একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তিতাসে দায়িত্ব নিয়েই ৭৫০ কোটি টাকার অভিযোগ!

চলতি বছরের ৯ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় জিটিসিএল-এর এমডি শাহনেওয়াজ পারভেজকে তিতাস গ্যাসের এমডি হিসেবে নিয়োগের নির্দেশ দেয়। তিতাসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যাপক বাধার মধ্যেও তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্ব গ্রহণের পর সাভার, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন শিল্পকারখানায় প্রায় ১৫০টি নতুন সংযোগ ও লোড বৃদ্ধি করা হয়েছে। এসব সংযোগ ও লোড বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অনিয়ম ও ঘুষের মাধ্যমে প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

শুধু নতুন সংযোগ ও লোড বৃদ্ধিই নয়, তিতাসের আওতায় থাকা প্রায় ১ হাজার ৫০০ অবৈধ সংযোগ থেকেও প্রতি মাসে অন্তত ৩০ কোটি টাকা আদায় করা হতো বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

পেট্রোবাংলাতেও বিতর্কিত ভূমিকার অভিযোগ

তিতাসের আগেও পেট্রোবাংলার কন্ট্রাক্ট বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে শাহনেওয়াজ পারভেজের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, সাগরে অফশোর বিডিং রাউন্ডের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নীতি লঙ্ঘন করে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে নিরুৎসাহিত করা হয়। একই সঙ্গে ভারতের একটি কোম্পানিকে একক সুবিধা পাইয়ে দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

এ ছাড়া সাবেক চেয়ারম্যান জনেন্দ্রনাথ সরকারের সঙ্গে যোগসাজশ, ক্ষমতার অপব্যবহার, সিনিয়রিটি লঙ্ঘন করে পদোন্নতি গ্রহণ এবং সহকর্মীদের হয়রানির অভিযোগসংবলিত নানা তথ্যও সামনে এসেছে।

তদন্ত হয়েছে, ব্যবস্থা কোথায়?

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, শাহনেওয়াজ পারভেজের বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে একাধিক তদন্ত পরিচালিত হয়েছে। তবে রহস্যজনক কারণে এসব তদন্তের ফলাফল প্রকাশ কিংবা দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল) ও তিতাসের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ জানান, একটি মহল মন্ত্রণালয়ে তাঁর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ দিয়েছে এবং সেগুলোর তদন্তও হয়েছে। তবে মন্ত্রণালয় কী ব্যবস্থা নিয়েছে, তা তাঁর জানা নেই।

গ্যাস সংকটের আড়ালে দুর্নীতির ‘গ্যাস চক্র’?

একদিকে চাহিদার তুলনায় ভয়াবহ গ্যাস ঘাটতি, অন্যদিকে বিতরণ ব্যবস্থায় অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ—দুইয়ে মিলে দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি শিল্পখাত এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা এখন চরম চাপে।

অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে গ্যাস সংকটের সঙ্গে যুক্ত অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ অবস্থায় ভুক্তভোগী সাধারণ গ্রাহক এবং বৈষম্যবিরোধী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা শাহনেওয়াজ পারভেজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মিললে তিতাসের এমডির অপসারণসহ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিও জানিয়েছেন তারা।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।