কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ঘটেছে এক হৃদয়বিদারক ও বিরল মর্মান্তিক ঘটনা। মাত্র ছয় ঘণ্টার ব্যবধানে নিজের বাবা ও মেয়ের জানাজা ও দাফনের ব্যবস্থা করতে হলো এক অসহায় পিতাকে। বাবাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ বিদায় জানিয়ে বাড়ি ফেরার পথেই আসে প্রিয় কন্যার মৃত্যুসংবাদ। একদিনে পরিবারের দুই প্রিয়জনকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছে পুরো পরিবার, আর নেমে এসেছে পুরো এলাকাজুড়ে গভীর শোকের ছায়া।
শনিবার (২৫ জুলাই) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার পূর্বপাড়া গ্রামে ঘটে এই বেদনাবিধুর ঘটনা।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, উপজেলার পূর্বপাড়া গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা ফুলবাস আলী (৭২) বার্ধক্যজনিত কারণে শুক্রবার বিকেলে ইন্তেকাল করেন। শনিবার সকাল ১০টায় নিজ এলাকার মানিকদিয়ার কবরস্থানে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রদীপ কুমার দাসের উপস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়।
কিন্তু পরিবারের সদস্যরা তখনও কবরস্থান থেকে পুরোপুরি বাড়ি ফিরতে পারেননি। ঠিক সেই সময় মোবাইল ফোনে আসে আরেকটি নির্মম দুঃসংবাদ—বীর মুক্তিযোদ্ধা ফুলবাস আলীর আদরের নাতনি মুন্নি খাতুন (২৩) আর বেঁচে নেই। যে নাতনি বিয়ের আগ পর্যন্ত দাদার সেবাযত্নে সবসময় পাশে ছিলেন, সেই তিনিই দাদার বিদায়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাড়ি জমালেন না ফেরার দেশে।
স্বজনরা জানান, শুক্রবার গভীর রাতে দাদার মরদেহের পাশে বসে বিলাপ করতে করতে মুন্নি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং একপর্যায়ে জ্ঞান হারান। পরে দ্রুত তাকে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর অবস্থার অবনতি হলে শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার প্রস্তুতির সময় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
মুন্নির স্বজন নুরুজ্জামান কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, চাচাকে শেষ বিদায় দিয়ে বাড়ি ফিরতেই ভাতিজির মৃত্যুর খবর পেলাম। এমন শোকের ভার কোনো পরিবারকে যেন কখনো বহন করতে না হয়।
পারিবারিক সূত্রে আরও জানা গেছে, শনিবার বিকেল ৪টায় একই মানিকদিয়ার কবরস্থানে দাদা বীর মুক্তিযোদ্ধা ফুলবাস আলীর কবরের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে নাতনি মুন্নি খাতুনকে। একই দিনে একই কবরস্থানে দাদা-নাতনির পাশাপাশি দাফনের এই দৃশ্য স্বজন, প্রতিবেশী ও এলাকাবাসীর হৃদয়কে আরও ভারাক্রান্ত করে তুলেছে। শোকে বারবার ভেঙে পড়ছেন পরিবারের সদস্যরা।
মুক্তিযোদ্ধার বড় ছেলে তুজাম উদ্দিন অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলেন, শুক্রবার বিকেলে আমার বাবা মারা যান। শনিবার সকালে বাবার জানাজা ও দাফন শেষ করে বাড়ি ফেরার পথেই ফোনে জানতে পারি, আমার মেয়ে মুন্নি আর নেই। একদিনে বাবা আর মেয়েকে হারিয়ে আমরা যেন দিশেহারা হয়ে পড়েছি।
তিনি আরও জানান, প্রায় এক বছর আগে দৌলতপুর থানাপাড়া গ্রামের মোস্তাকের সঙ্গে মুন্নির বিয়ে হয়। কয়েকদিন ধরে তিনি টাইফয়েডে ভুগছিলেন এবং আগে থেকেই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন।
এ ঘটনার পর পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোকের আবহ। প্রতিবেশীরা বলছেন, একই দিনে একই পরিবারের দুই সদস্যকে হারানোর এমন হৃদয়বিদারক ঘটনা তারা আগে কখনো দেখেননি।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা আবেগঘন প্রতিক্রিয়ায় বলেন, সকালে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ বিদায় জানিয়েছি। অথচ কিছুক্ষণের মধ্যেই শুনতে হলো তাঁরই প্রিয় নাতনির মৃত্যুসংবাদ। একই দিনে দাদা-নাতনি পাশাপাশি চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন—এর চেয়ে বেদনাদায়ক দৃশ্য আর কী হতে পারে। আজ শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো গ্রামই যেন শোকে কাঁদছে। আল্লাহ যেন এই শোকসন্তপ্ত পরিবারকে ধৈর্য ধারণের শক্তি দান করেন এবং এমন নির্মম পরিণতি আর কোনো পরিবারের জীবনে না আসে।
