বৃহস্পতিবার, ২রা এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৯শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

দালালের হাতেই বন্দি সেবা, ময়মনসিংহ বিআরটিএ অফিসে অনিয়মের অন্ধকার সাম্রাজ্য—অভিযোগের আগুনেও থামেনি সিন্ডিকেট

মামুনুর রশীদ মামুন
এপ্রিল ১, ২০২৬ ১১:৪২ অপরাহ্ণ
Link Copied!

সরকারি সেবা নিতে গিয়ে যেন এক অদৃশ্য গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। ময়মনসিংহের বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) অফিসে পা রাখলেই শুরু হয় এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা—যেখানে নিয়ম নয়, দালালই যেন সবকিছুর নিয়ন্ত্রক।

এদিকে ড্রাইভিং লাইসেন্স, রেজিস্ট্রেশন, মালিকানা পরিবর্তন কিংবা ফিটনেস—যে সেবার জন্যই মানুষ আসুক না কেন, অভিযোগ একটাই: দালাল ছাড়া কাজ যেন এগোয় না এক পা। নির্ধারিত সরকারি ফি জমা দিয়েও নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করলে নানা অজুহাতে হয়রানির শিকার হতে হয়। অথচ দালালের হাত ধরলেই খুলে যায় সব দরজা—যেন অন্ধকারের ভেতর হঠাৎ জ্বলে ওঠে আলো।
সম্প্রতি এসব অনিয়ম ও দালাল সিন্ডিকেটের তৎপরতা নিয়ে গণমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও বাস্তবে পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। বরং অভিযোগ উঠেছে—প্রকাশের পর সিন্ডিকেটটি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। অফিসের ভেতরের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে তারা এখন আরও প্রকাশ্যে তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরেই এই অফিসে একটি শক্তিশালী দালালচক্র সক্রিয়। অভিযোগ, সংবাদ প্রকাশ এবং প্রশাসনের আশ্বাস—সবই যেন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। বাস্তবে নেই দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ। ফলে দালালদের প্রভাব যেন দিন দিন আরও গভীর হচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের কণ্ঠে শোনা যায় হতাশার দীর্ঘশ্বাস—“অভিযোগ করে কোনো লাভ নেই। বরং পরে গেলে কাজ আরও আটকে দেওয়া হয়। তাই বাধ্য হয়েই দালালের শরণাপন্ন হতে হয়।

সরেজমিনে দেখা গেছে, কেউ যদি নিয়ম মেনে সরাসরি আবেদন করতে চান, তাহলে শুরু হয় হয়রানির এক দীর্ঘ অধ্যায়। সামান্য ভুল দেখিয়ে আবেদন বাতিল, একই কাগজ বারবার সংশোধনের নির্দেশ, এমনকি পরীক্ষায় অংশ নিয়েও অযৌক্তিকভাবে ফেল দেখানো—সবই যেন এক অদৃশ্য চাপে বাধ্য করার কৌশল।
অভিযোগ রয়েছে, ড্রাইভিং লাইসেন্সের ক্ষেত্রে দালালের মাধ্যমে কাজ করাতে ৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। এক ভুক্তভোগীর কথায়—“আমি নিয়ম মেনে আবেদন করেছিলাম, কয়েকবার গিয়েও কাজ হয়নি। পরে ১০ হাজার টাকা দিয়ে দালালের মাধ্যমে খুব দ্রুত কাজ হয়ে যায়।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো—দালালদের অবাধ বিচরণ শুধু অফিস চত্বরেই নয়, ভবনের ভেতরেও। তারা আবেদনকারীদের ঘিরে ধরে প্রলোভন দেখায়, এমনকি বিভিন্ন কক্ষে ঢুকে নথিপত্র ঘাঁটাঘাঁটি ও কম্পিউটারে কাজ করতেও দেখা যায়। তাদের উপস্থিতি এতটাই স্বাভাবিক যে অনেক সময় সাধারণ মানুষ বুঝতেই পারেন না—তারা কর্মকর্তা, নাকি বহিরাগত।

এই সিন্ডিকেটের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন মোটরযান পরিদর্শক জহির উদ্দিন বাবর। যদিও তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছেন, দালালদের দৌরাত্ম্য রোধে তার কক্ষে সিসিটিভি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে স্থানীয়দের দাবি—এ ধরনের আশ্বাস আগেও দেওয়া হলেও বাস্তবে কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি।
সহকারী পরিচালক (এডি) আনিসুর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পরও দালাল সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে কয়েকজন কথিত দালালের নাম—মোফাজ্জল, হীরা, শান্ত, কামাল, খোকন, রিপন, ভুট্টো, শাহ কামাল, সেলিম ও তপনসহ আরও কয়েকজন। অভিযোগ রয়েছে, তারা “হয়রানিমুক্ত সেবা” দেওয়ার নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করছে, যার একটি অংশ ‘অফিস খরচ’ নামে সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।

এদিকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন—যখন বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্য গোপন (ওপেন সিক্রেট), তখনও কেন দৃশ্যমান কোনো অভিযান বা কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না?

সচেতন মহলের মতে, এখন সময় কেবল আশ্বাসের নয়—প্রয়োজন কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ। বিশেষ অভিযান, সিসিটিভি স্থাপন, দালালদের প্রবেশ নিষিদ্ধকরণ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা—সবকিছু দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে এই অন্ধকার চক্র ভাঙা সম্ভব নয়।

ভুক্তভোগিদের একটাই কথা— আর আশ্বাস নয়, এবার চাই দৃশ্যমান পরিবর্তন—নইলে দালালের হাতেই বন্দি থাকবে সরকারি সেবা, আর ভোগান্তির গল্প লিখতেই থাকবে সাধারণ মানুষ।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।