কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে হাসি থেকে হাহাকার—ইজ্জতপুরে ছিন্নভিন্ন দুই মরদেহ ঘিরে চাঞ্চল্য। প্রতীকী ছবি
দুপুরেও পাশাপাশি হাঁটছিলেন তাঁরা। কখনও গল্প, কখনও খুনসুটি—দুজনকে দেখে বোঝার উপায় ছিল না, কয়েক ঘণ্টা পর সেই একই রেললাইনেই নেমে আসবে এমন মর্মান্তিক পরিণতি। সন্ধ্যা নামতেই ইজ্জতপুর রেলস্টেশনের কাছে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা দুইজনের মরদেহ ঘিরে তৈরি হয় শোক, চাঞ্চল্য ও নানা প্রশ্ন।
গাজীপুরের শ্রীপুরে চলন্ত ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে এক দম্পতির মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। শনিবার বিকেল ৫টার দিকে উপজেলার রাজাবাড়ি ইউনিয়নের ইজ্জতপুর রেলওয়ে স্টেশনের উত্তর আউটার সিগন্যাল এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথে এ ঘটনা ঘটে।
নিহতরা হলেন শ্রীপুর উপজেলার বরমী ইউনিয়নের পাইটালবাড়ি গ্রামের সিদ্দিকুর রহমানের মেয়ে রিনা আক্তার (২৫) ও তাঁর স্বামী আল আমিন। রিনা স্থানীয় আরবেলা ফ্যাশন কারখানায় এবং আল আমিন শ্রীপুর পৌরসভার ছালিলাপাড়া এলাকার হ্যামস গার্মেন্টসে কাজ করতেন।
ঘটনাস্থলে পাওয়া পরিচয়পত্রের মাধ্যমে প্রথমে রিনা আক্তারের পরিচয় শনাক্ত করা হয়। পরে স্বজনদের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায়, নিহত অপর ব্যক্তি তাঁর স্বামী আল আমিন।
দুপুরের হাসি, সন্ধ্যার হাহাকার
স্থানীয়দের ভাষ্য, শনিবার দুপুরের পর থেকেই রিনা ও আল আমিনকে রেললাইনের আশপাশে একসঙ্গে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। দীর্ঘ সময় তাঁরা রেললাইন ধরে হাঁটেন, কোথাও বসে গল্প করেন, আবার কখনও খুনসুটিতে মেতে ওঠেন।
তবে তাঁদের মধ্যে কথাকাটাকাটি হয়েছিল বলেও জানান স্থানীয়দের কেউ কেউ। কী নিয়ে তাঁদের মনোমালিন্য হয়েছিল, কিংবা পরবর্তীতে কী ঘটেছিল—এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা রত্না বেগম বলেন, দুজনকে রেলপথ ধরে হাঁটাহাঁটি করতে দেখেছি। তাঁরা দীর্ঘ সময় সেখানে বসে গল্প ও খুনসুটি করছিলেন। সন্ধ্যার দিকে হঠাৎ তাঁদের মৃত্যুর খবর পাই।
আরেক বাসিন্দা জসিম উদ্দিন জানান, এক পথচারীর কাছ থেকে তিনি শুনেছেন, দুপুরের দিকে ওই দুজনকে রেললাইনের কাছে ঝগড়া করতে দেখা গিয়েছিল। তবে তাঁদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত নন।
এক কিলোমিটারজুড়ে ছড়িয়ে ছিল মরদেহের অংশ
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল আলীম বলেন, ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনি দুজনের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন। ট্রেনের ধাক্কায় মরদেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে রেললাইনের প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে শরীরের বিভিন্ন অংশ ছড়িয়ে পড়ে।
এদিকে নিহত রিনা আক্তারের ভাই সুমন আহমেদ জানান, তাঁর বোন এর আগে অন্য একজনের সঙ্গে সংসার করতেন। পরে সেই সংসার ছেড়ে আল আমিনকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর থেকে পরিবারের সঙ্গে তাঁর তেমন যোগাযোগ ছিল না। কী কারণে তাঁরা এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।
স্বজনদের একজনের দাবি, আল আমিন অনলাইন জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়েছিলেন। এ নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া হতো। তবে তাঁদের মৃত্যুর সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
মৃত্যুর কারণ নিয়ে রয়ে গেছে প্রশ্ন
শ্রীপুর রেলস্টেশনের স্টেশন মাস্টার শামীমা জাহান বলেন, মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। মরদেহের অবস্থা এতটাই বীভৎস যে চেনা কঠিন। এ ঘটনায় পরবর্তী আইনগত কার্যক্রম চলছে।
দুপুরে যে রেললাইনে পাশাপাশি হাঁটছিলেন দুজন, কয়েক ঘণ্টা পর সেখানেই তাঁদের জীবন থেমে যাওয়ার ঘটনায় স্বজন, স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের মধ্যে নেমে এসেছে গভীর শোক। তবে কী কারণে এই দম্পতি এমন চরম সিদ্ধান্ত নিলেন—তার উত্তর এখনো অজানা। বিষয়টি নিয়ে চলছে আইনগত প্রক্রিয়া ও অনুসন্ধান।
